গণেশ চতুর্থী (Ganesh Chaturthi) বা ‘গণেশোৎসব’ হিন্দুদের একটি অন্যতম উৎসব। হিন্দু দেবতা গণেশের বাৎসরিক পূজা উপলক্ষে এই উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। হিন্দু দেব-দেবীদের মধ্যে অন্যতম শিব ও পার্বতীর পুত্র গজানন বা গণেশ। গণেশ বুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের সর্বোচ্চ দেবতা। তিনি বিঘ্ন নাশক এবং সিদ্ধিদাতা। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, এই দিন গণেশ তাঁর ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। তাই এই বিশেষ তিথিতে গণেশ আরাধনা প্রচলন রয়েছে।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশের পুজো হওয়া বিধেয়। সাধারণত এই দিনটি ইংরেজি বর্ষপঞ্জির আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনও এক দিন পড়ে। দশ দিন ব্যাপী গণেশোৎসবের সমাপ্তি হয় অনন্ত চতুর্দশীর দিন। ‘ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষ চতুর্থী মধ্যাহ্নব্যাপিনী পূর্বাবিদ্ধ’ – শাস্ত্রমতে এটাই পুজোর প্রশস্ত সময়। তাই কখনো চতুর্থী দু’দিন পড়লে আগের দিন পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি দ্বিতীয় দিন মধ্যাহ্নের পুরোটাই যদি চতুর্থী থাকে তবুও আগের দিন মধ্যাহ্নে চব্বিশ মিনিট (এক ঘটিকা) চতুর্থী থাকলে সে দিনই গণেশ পুজো হয়ে থাকে।
২০২৬ সালের গণেশ চতুর্থী কবে?
- বাংলা তারিখ: ২৭ ভাদ্র, ১৪৩৩
- ইংরাজি তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গণেশ চতুর্থীর দিন সিদ্ধিদাতা গণেশ কৈলাস পর্বত থেকে মর্ত্যে নেমে আসেন তাঁর ভক্তদের প্রার্থনা পূরণ করার উদ্দেশ্যে। গণেশ হর-পার্বতীর পুত্র। তাঁর রূপ বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে বিভিন্ন প্রকার। তবে সর্বত্রই তিনি গজমুণ্ডধারী মনুষ্যাকার দেবতা এবং তাঁর বাহন মূষিক বা ইঁদুর; অথবা কোনও কোনও স্থলে সিংহকেও তাঁর বাহন রূপে দেখা গেছে। গণেশকে সর্ববিঘ্নহন্তা মনে করা হয় বলে তাঁর আরেক নাম বিঘ্নেশ বা বিঘ্নেশ্বর। তিনি শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং মহাবল, মেধা ও বুদ্ধির দেবতা। পুজো ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের সময় গণেশের পুজো সর্বাগ্রে করা কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। এর পিছনেও শিব-পার্বতীকে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড কল্পনা করে গণেশের প্রদক্ষিণ করার বিশেষ কাহিনী বিদ্যমান। লেখার সময় তাঁকে অক্ষরের পৃষ্ঠপোষকরূপে আবাহন করার রীতি আছে।

হিন্দু দেবপতি গণেশ একাধারে গণপতি, বিনায়ক, মহাগণপতি, বিরিগণপতি, শক্তিগণপতি, বিদ্যাগণপতি, হরিদ্রাগণপতি, উচ্ছিষ্টগণপতি, লক্ষ্মীবিনায়ক, হেরম্ব, বক্রতুণ্ড, একদন্ত, মহোদর, গজানন, লম্বোদর, প্রভৃতি নামে পরিচিত। দুর্গা (অম্বিকা) এবং চামুণ্ডা এই দুই নারী গণেশকে পালন করেছিলেন বলে তিনি ‘দ্বৈমাতুর’ নামেও অভিহিত হন। মারাঠি ভাষায় তাঁকে বলা হয় ‘বিনায়ক’, ‘বিঘ্নেষ’ কিংবা ‘বিঘ্নেশ্বর’। এছাড়াও তামিল ভাষায় ‘পিল্লাই’ ও ‘পিল্লাইয়ার’, বর্মি ভাষায় ‘মহা পেইন্নে’, থাইল্যান্ডে ‘ফ্রা ফিকানেত’ এবং শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ অঞ্চলগুলিতে গণেশ ‘গণ দেবিয়ো’ নামে পরিচিত।
হিন্দু পুরাণ মতে, গণেশ পাঁচ রাক্ষসকে নিধন করেন- অহন্তাসুর (অহমের প্রতীক), মায়াসুর (মায়ার প্রতীক), লোবাসুর (লোভের প্রতীক), কামাসুর (কামের প্রতীক) এবং ক্রোধাসুর (ক্রোধের প্রতীক)।
এ তো গেল গণেশের গল্প। কিন্তু বিশেষত গণেশ চতুর্থীকে নিয়েও জনশ্রুতির শেষ নেই। এই দিন চাঁদের দিকে তাকাতে বারণ করা হয়। কথিত আছে, চন্দ্রদেব নাকি গণেশের গজমুখ দেখে হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে গণেশ ঠাকুর চাঁদকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তাই কেউ যদি গণেশ চতুর্থী থেকে অনন্ত চতুর্দশী পর্যন্ত চাঁদের দিকে তাকায়, তাহলে ওই ব্যক্তির জীবনে ঘোরতর সমস্যা দেখা দেবে।
পৃথক দেবতা রূপে গণেশের উদ্ভব খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্তযুগে। এছাড়াও একাধিক বৈদিক ও প্রাক-বৈদিক উৎস থেকেও গণেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। নবম শতাব্দীতে পাঁচ প্রধান দেবতার মধ্যে অন্যতম দেবতারূপে গণ্য হন গণেশ। এই সময় গণেশকে সর্বোচ্চ দেবতা স্বীকার করে ‘গাণপত্য সম্প্রদায়’-এর উদ্ভব ঘটে। তবে গণেশ চতুর্থীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যকেও অস্বীকার করা যায় না। ১৬৩০ সাল থেকে ১৬৮০ সালের মধ্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রজাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটানোর জন্য মারাঠি শাসক ছত্রপতি শিবাজী ‘গণপতি উৎসব’-এর সূচনা করেন। পেশোয়াদের কুলদেবতা হিসেবে গণেশের প্রাধান্যই সেকালে বেশি ছিল। এর অনেক পরে ১৮৯৩ সালে লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক প্রথম সার্বজনীনভাবে ‘গণেশ চতুর্থী’ শুরু করেন। ১৮৯২ সালে ব্রিটিশরা ভারতে সমস্ত রকম হিন্দু জমায়েত নিষিদ্ধ করেছিল আর এই জনবিরোধী সমাবেশ আইনের প্রতিবাদে তিলক ‘গণেশ চতুর্থী’কে জনপ্রিয় করে তোলেন। তবে জানা যায় যে তিলকই এর উদ্গাতা ছিলেন এমনটা নয়। তাঁর আগে পুনের বাসুদেব লক্ষণ জাভালে নামে এক ব্যক্তি গণেশ চতুর্থী পালন করেন এবং সেই সংবাদ লোকমান্য তিলক তাঁর সংবাদপত্র ‘কেশরী’তে প্রকাশও করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে তিলকের সংবাদপত্রের দপ্তরেও নাকি একটি গণেশ মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল।
গণেশ উৎসব’ বা ‘গণেশ চতুর্থী’ ছাড়াও এই উৎসব বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। সংস্কৃত, কন্নড়, তামিল ও তেলুগু ভাষায় এই উৎসব ‘বিনায়ক চতুর্থী’ বা ‘বিনায়ক চবিথি’ নামেও পরিচিত। কোঙ্কণি ভাষায় এই উৎসবের নাম ‘চবথ’ আর নেপালি ভাষায় এই উৎসবকে বলা হয় ‘চথা’। গণেশ পুজো সমগ্র ভারতে অনুষ্ঠিত হলেও মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাত, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করা হয়। ভারতের বাইরে নেপালেও এই উৎসব মহাসমারোহে পালিত হয়। শ্রীলঙ্কায় তামিল হিন্দুরাও এই উৎসব পালন করে থাকেন। এছাড়া ভারতের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, ত্রিনিদাদ এবং টোবাগো, গুয়েনা, ফিজি, মরিশাস, সাউথ আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ প্রভৃতি বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রবাসী হিন্দুরা ‘গণেশ চতুর্থী’ পালন করে থাকেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান