খেলা

স্কিইং খেলা

স্কিইং খেলা

স্কিইং একটি একক বিনোদনমূলক খেলা। পায়ের নিচে ‘স্কি’ (Skii) আটকে বরফের উপর গড়িয়ে চলার নামই স্কিইং খেলা (Skiing Games)। তবে বিনোদনের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া হিসেবেও স্কিইং খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এবং আন্তর্জাতিক স্কিইং ফেডারেশন কর্তৃক নানা ধরনের স্কিইং প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়ে থাকে। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, জাপান প্রভৃতি দেশে এই খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়।

স্কিইং-এর ইতিহাস প্রায় পাঁচ সহস্রাব্দ প্রাচীন। তবে আধুনিক স্কিইং-এর রূপটি বিকশিত হয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার খেলার রীতি থেকে। প্রাচীন চিত্রকর্মের থেকে জানা যায় যে ১০০ শতাব্দীরও বেশি আগে এই খেলাটি চিনে অনুষ্ঠিত হত। নরওয়ে থেকেই মূলত আন্তর্জাতিক স্তরে ‘স্কি’ (Skii) কথাটি ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রাচীন নর্স শব্দ ‘স্কিও’ থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয় যার অর্থ কাঠের টুকরো বা জ্বালানি কাঠকে ভেঙে দু টুকরো করে ফেলা। উনিশ শতকের শেষ পর্ব পর্যন্ত উত্তর ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনে অপ্রতিসম (Asymetrical) স্কি ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। খেলোয়াড়েরা গড়িয়ে যাওয়ার সুবিধের জন্য একটি লম্বা সোজা নন-আর্চিং (Non-Arching) স্কি পরতেন আর অন্য পায়ে লাথি মারার জন্য একটি ছোট স্কি পরতেন। প্রাথমিক পর্বে স্কিয়াররা (Skier) একটি লম্বা খুঁটি বা বর্শা ব্যবহার করতেন। ১৭৪১ সালে প্রথম একজন স্কিয়ারকে দুটি বর্শা সহ স্কিইং করতে দেখা গিয়েছিল বলে জানা যায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত স্কিইং মূলত ব্যবহৃত হত পরিবহনের জন্য। তারপর থেকে ক্রমেই এটি একটি বিনোদনমূলক খেলায় পরিণত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নরওয়েতে অনুষ্ঠিত হয় সামরিক স্কি দৌড়। এই সময়েই ইউরোপে স্কিইং চালু হয় যার পিছনে গভীর প্রভাব ছিল ফ্রিটজফ ন্যানসেনের লেখা একটি বইয়ের। ‘দ্য ফার্স্ট ক্রসিং অফ গ্রিনল্যান্ড’ নামের সেই বইতে ন্যানসেন তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন যেখানে তিনি স্কিইং করে গ্রিনল্যান্ড অতিক্রম করার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। বিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই স্কিইং-এর রূপ আরও উন্নত হয় এবং সেই সময় থেকে দুই ধরনের স্কিইং-এর প্রচলন দেখা যায় – অ্যালপাইন স্কিইং এবং নর্ডিক স্কিইং। মূলত স্কি-এর বাঁধনের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে এই দুটি ধরন পৃথক হয়েছে। ১৯২৪ সালে সমগ্র বিশ্বে স্কিইং-এর পরিচালক কমিটি হিসেবে গড়ে ওঠে ‘ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ডি স্কি’ (Fédération Internationale de Ski)। তারপর ১৯২৫ সাল থেকে পুরুষদের স্কিইং প্রতিযোগিতা শুরু হয় সমগ্র বিশ্ব জুড়ে এবং ১৯৫৪ সাল থেকে মহিলাদের জন্যেও স্কিইং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ১৯৮০ সালে প্রথম এফআইএস (FIS) সংস্থা ফ্রি-স্টাইল স্কিইংকে মান্যতা দেয় এবং এই প্রকারের স্কিইং-এর একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে। এছাড়াও ধীরে ধীরে স্পিড স্কিইং, গ্রাস স্কিইং এবং ডাউনহিল স্কিইং নামে নতুন ধরনের স্কিইং খেলা চালু হয়। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সামরিক স্কিইং-এর রীতি চালু ছিল বলে মনে করা হয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উভয় ক্ষেত্রেই স্কি-বাহিনী (Ski-troops) ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্রন্টে থাকা বহু সেনা যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এই স্কিইং খেলার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে উদ্যোগী হন।

বর্তমান বিশ্বে তিন ধরনের স্কিইং-এর প্রথা বা রীতি রয়েছে – অ্যালপাইন, নর্ডিক এবং ফ্রি-স্টাইল। তবে টেলিমার্ক নামেও একটি বিশেষ স্কিইং-এর রীতি প্রচলিত রয়েছে।

  • অ্যালপাইন স্কিইং (Alpine Skiing) : এই রীতিরই অপর নাম ডাউনহিল স্কিইং। কোনও একটি স্কি রিসর্টে পিস্ট-এর (Piste) উপর এই স্কিইং করা হয়। পিস্ট হল পাহাড়ের বরফের গায়ে স্কিইং করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা পথ। মধ্য ইউরোপের আল্পস পর্বতমালায় এই বিশেষ স্কিইং-এর রীতিটি বিকশিত হয়। কিন্তু প্রথম দিকে নর্ডিক স্কিইংকেই আন্তর্জাতিক স্তরে স্কিইং-এর একমাত্র রীতি হিসেবে মানা হত। পরে নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলিতে অ্যালপাইন স্কিইং প্রচলিত হয়। প্রতিযোগিতামূলক অ্যালপাইন স্কিইং মূলত চার ধরনের দৌড় আয়োজিত হয় – স্লালোম (Slalom), জায়ান্ট স্লালোম (Giant Slalom), সুপার জায়েন্ট স্লালোম (Super Giant Slalom) এবং ডাউনহিল (Downhill)। শেষ দুই ধরনের দৌড়কে মূলত স্পিড ইভেন্ট বলা হয় আর প্রথম দুটি প্রকারকে বলা হয় টেকনিক্যাল ইভেন্ট। ১৯৩৬ সালে জার্মানিতে প্রথম অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অ্যালপাইন স্কিইং আয়োজিত হয়। ১৯৫২ সালে অসলোতে শীতকালীন অলিম্পিকে প্রথম জায়েন্ট স্লালোম প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়।
  • নর্ডিক স্কিইং (Nordic Skiing) : মূলত নরওয়ে এবং স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের পার্বত্য উৎরাই-তে এই প্রকৃতির স্কিইং-এর রীতি চালু হয়েছিল। আধুনিককালে ক্রস-কান্ট্রি দৌড় এবং স্কি-জাম্পিং ইভেন্ট ইত্যাদি এই নর্ডিক স্কিইং-এর অন্তর্গত। দৌড় শুরু করার পদ্ধতি, সময় এবং দূরত্ব ইত্যাদির ভিত্তিতে ক্রস-কান্ট্রি দৌড় এবং স্কি-জাম্পিং দুটি পৃথক হয়ে থাকে।
  • ফ্রি-স্টাইল স্কিইং (Free-style Skiing) :  এই ধরনের স্কিইং-এর ক্ষেত্রে অ্যাক্রোবেটিক্সের অংশই প্রাধান্য পায় বেশি। ফ্রি-স্টাইল স্কিইং-এর তিনটি ইভেন্ট রয়েছে – অ্যাক্রো (Acro), এরিয়ালস (Aerials) এবং মগুলস (Moguls)। ১৯৩০ সাল নাগাদ ইউরোপে এই অ্যাক্রো রীতিটি উদ্ভূত হয়েছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাক্রো স্কিয়াররা ৯০ সেকেণ্ডের একটি সময়পর্বের মধ্যে জাম্প, ফ্লিপ এবং স্পিন এই তিন কৌশল প্রদর্শন করেন শিল্পিতভাবে আর তাই বিচারকদের কাছে বিচার্য হয়ে ওঠে। অ্যালপাইন স্কিইং-এর থেকে ফ্রি-স্টাইল অ্যাক্রো স্কিইং-এর জন্য প্রয়োজনীয় বর্শাটি অনেকটা লম্বা হয়ে থাকে। অনেক উঁচুতে ওঠা, শূন্যে ঘুরপাক খাওয়া ইত্যাদি দক্ষতার বিচার হয় এই রীতির স্কিইং-এ।

স্কিইং খেলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে স্কি, বুট বা বাইন্ডিং, বর্শা (Poles), হেলমেট, স্কি জুতো, স্কি চশমা ও স্কি গ্লাভস ইত্যাদি।

১৯৬৬ সালে ন্যাশনাল স্কি এরিয়াস অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক ‘স্কিয়ার রেসপন্সিবিলিটি কোড’ (Skier Responsibility Code) নির্মিত হয়। এই কোডগুলি হল –

  • উৎরাই অঞ্চলে নিরাপদভাবে স্কিইং করা উচিত। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্কিইং করা দরকার। স্কিইং-এর সময় পথের সামনে কোনও বস্তু বা ব্যক্তি উপস্থিত হলে কীভাবে থামতে হবে নিজেকে ও সেই ব্যক্তিকে অক্ষত রেখে তা জানাটাও স্কিয়ারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
  • একটি স্কিইং ট্রেইল (Skiing Trail)-এ চলার সময় মাঝপথে কখনই থেমে যাওয়া উচিত নয়।
  • স্কিইং-এর পথের মধ্যে লাগানো সমস্ত নির্দেশ ও সতর্কতার দিকে নজর রাখতে হবে।
  • শূন্যে লাফানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক কৌশল জানতে হবে।

সমগ্র বিশ্ব জুড়ে স্কিইং খেলা সংক্রান্ত বহুবিধ প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। এর মধ্যে ক্রস-কান্ট্রি (Cross-country) এবং স্কি জাম্পিং হল সবার থেকে বেশি জনপ্রিয়। এফআইএস ক্রস কান্ট্রি বিশ্বকাপ এবং এফআইএস নর্ডিক বিশ্ব স্কি চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি বিশ্বের মধ্যে সবথেকে পরিচিত স্কিইং প্রতিযোগিতা। ১৯২৪ সাল থেকে শীতকালীন অলিম্পিকের মধ্যে স্কিইং খেলা অন্তর্ভুক্ত হয়। এমনকি ক্রস-কান্ট্রি স্কি ম্যারাথন ইভেন্টও যুক্ত হয় এর সঙ্গে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিযোগিতাগুলির মধ্যে রয়েছে এফআইএস স্কি জাম্পিং বিশ্বকাপ, এফআইএস স্কি জাম্পিং গ্র্যান্ড প্রিক্স, এফআইএস নর্ডিক কম্বাইন্ড বিশ্বকাপ, এফআইএস অ্যালপাইন স্কি বিশ্বকাপ, বিশ্ব প্যারা অ্যালপাইন স্কিইং চ্যাম্পিয়নশিপ, এফআইএস ফ্রি-স্টাইল বিশ্ব স্কি চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি। ১৯৯২ সালে অ্যালবার্টভিলে আয়োজিত শীতকালীন অলিম্পিকে প্রথম স্পিড স্কিইং প্রতিযোগিতা অন্তর্ভুক্ত হয়।

ভারতে জম্মু ও কাশ্মীরের গুলমার্গ, হিমাচল প্রদেশের সোলাং, উত্তরাখন্ডের আউলিতে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে স্কিইং হয়ে থাকে। স্কিইং-এ ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক স্তরে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন আঁচল ঠাকুর এফআইএস আয়োজিত ‘অ্যালপাইন এজের ৩২০০ কাপ’ (Alpine Edjer 3200 Cup) প্রতিযোগিতায়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়