শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে আমাদের কিছুদিনের জন্য বেড়িয়ে আসতে বড় মন চায়। বেড়িয়ে পড়লেন আর গিয়ে পৌঁছলেন এক অসাধারণ সুন্দর দ্বীপে। কিন্তু পৌঁছনোর পরই বুঝলেন যে সুন্দর এই দ্বীপটি আসলে এক ভয়ঙ্কর এই দ্বীপ, তাহলে কেমন হবে বলুন তো? বাইরে থেকে দেখে যে দ্বীপের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছিলেন, দ্বীপে ঢুকে দেখলেন সারা জায়গা জুড়ে এখানে গিজগিজ করছে ভয়ঙ্কর প্রজাতির সাপ। আজ্ঞে হ্যাঁ! ব্রাজিলের সাও পাওলোর উপকূলে রয়েছে এমনই এক দ্বীপ। এত সাপ থাকার কারণে একে সাপের দ্বীপ বলা হয়, যদিও এই দ্বীপের আসল নাম ইলহা ডা কুইমাডা গ্র্যান্ডি (Ilha da Queimada Grande)। এখানে বাস এমন সব ভয়ঙ্কর সাপের যে ব্রাজিল সরকার বাধ্য হয়ে দ্বীপটিতে সাধারণ মানুষের ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাই আপনি চাইলেও এখানে ঘুরতে যেতে পারবেন না। এত ভয়ঙ্কর দ্বীপ, অথচ বাইরে থেকে কিন্তু বোঝার উপায় নেই।
দ্বীপটিতে যে শুধু পৃথিবীর বিষধর সাপগুলোর প্রায় হাজার চারেকের মতো বাস তাই নয়, এখানেই পৃথিবীর সবচাইতে বিষধর সাপ গোল্ডেন ল্যান্সহেডেরও বাস। গোল্ডেন ল্যান্সহেডকে এ দ্বীপটি ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। গোল্ডেন ল্যান্সহেডের বিষ এতটাই শক্তিশালী যে এই বিষ মানুষের শরীরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তা শরীরের মাংস পর্যন্ত গলিয়ে দিতে পারে। সাও পাওলো থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে এই নির্জন দ্বীপে কেউ যদি গোল্ডেন ল্যান্সহেডের দংশনের শিকার হয় তবে তার মৃত্যু প্রায় অনিবার্য। তবে ঠিক কীভাবে এই সাপগুলো এতটা বিষধর হয়ে উঠেছে তা একরকমের রহস্যই রয়ে গেছে।
এ তো গেল গোল্ডেন ল্যান্সহেডের কথা। এ দ্বীপের বাকি সাপগুলোও কিন্তু কম নয়। উড়ন্ত পাখি ধরে এরা দিব্যি খেয়ে ফেলতে পারে। ইলহা ডা কুইমাডা গ্র্যান্ডির আয়তন ৪ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গমিটার। দ্বীপটিতে ভ্রমণে ব্রাজিল সরকারের নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই, তবে মানুষও এমনিতেই এই সাপের দ্বীপ মুখী হয় না। কেই বা যেচে সাপের কামড় খেতে যাবে বলুন না! তবে ওই দ্বীপের ভয়ঙ্কর সাপগুলো নিয়ে গবেষণা করেন এমন কিছু বিজ্ঞানীর দ্বীপটিতে ভ্রমণের অনুমতি রয়েছে। এছাড়াও ব্রাজিলীয় নৌবাহিনীর সদস্যদেরও দ্বীপটিতে যেতে হয় প্রায়ই।
ভয়ঙ্কর এ দ্বীপে যাওয়া যেন সাক্ষাত মৃত্যুদূতের মুখোমুখীই হওয়া। তারপরও গোল্ডেন ল্যান্সহেড শিকারের আশায় এ দ্বীপটিতে চোরাকারবারীরা প্রায় ঢুঁ মারেন বলেও ধারণা করা হয়। আর কালোবাজারে একটি গোল্ডেন ল্যান্সহেড এরা ২০ লাখ টাকারও বেশি দামে বিক্রি করেন।
গোল্ডেন ল্যান্সহেডের এতটা বিষধর হয়ে ওঠা নিয়ে অনেক গুলো তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তত্ত্বটির মতে- বর্তমান সময় থেকে প্রায় ১১ হাজার বছর আগে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ব্রাজিলের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক হয়ে যায় ইলহা ডা কুইমাডা গ্র্যান্ডি দ্বীপটি। এতে এই দ্বীপের সাপগুলো একরকমের খাদ্য সঙ্কটে পড়ে। খাবার হিসেবে তাদের হাতের কাছে থেকে যায় সামান্য কিছু পাখি। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা ছিল পাখিগুলোকে দংশন করার পর এই বিষ কাজ করতে কখনো কখনো কয়েক দিনও লেগে যেত। ফলে দেখা যেত শিকারের উদ্দেশ্যে এই দ্বীপের সাপগুলো যেসব পাখিকে দংশন করত সেগুলো মারা যেত অনেক দূরে গিয়ে, কখনো কখনো কয়েকদিন পরও। এই সমস্যার কারণেই দ্বীপের সাপগুলোর কালের বিবর্তনে নিজেদের এমন বিষধরে সাপে বিকশিত করে ফেলে যা দংশনের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শিকারের প্রাণনাশে সক্ষম হয়। বর্তমানে গোল্ডেন ল্যান্সহেডের বিষ অন্য বিষধর সাপগুলোর চেয়ে পাঁচগুণ বেশি শক্তিশালী। এই দ্বীপে যেসব পাখি বিশ্রামের জন্য আসে, বিষধর সাপগুলোর শিকার হয় সেই পাখিগুলোই।
তবে চোরাশিকারিদের কারণেই হোক বা প্রাকৃতিক কারণেই হোক, সাপের দ্বীপে বর্তমানে সাপের সংখ্যা কমে আসছে। তাই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ কনজারভেশন ফর নেচার এই গোল্ডেন লাঞ্চহেডকে বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় স্থান দিয়েছে। এবং বিশ্বাস করা হয় সাধারণের জন্য দ্বীপটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান