ইতিহাস

পৃথিবীর প্রথম কিছু ছবি

ইতিহাসের তথ্যের ভিত্তিতে ১৮০০ সাল নাগাদ ছবি তোলা প্রথম শুরু হয় পৃথিবীতে। আর তার পর থেকে শত সহস্র ছবি তোলা হয়ে গেছে বিশ্বে। বিভিন্ন কায়দায় ছবি তোলার নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ক্যামেরা উদ্ভাবন, ছবি ডেভেলপ করার পদ্ধতির কত না বিবর্তন হয়েছে। ঐতিহাসিক কিছু মুহূর্তকে চিরস্থায়ী করার সুযোগ করে দিয়েছে ক্যামেরা আর তা দিয়েই ছবি নিজেই হয়ে উঠেছে ক্রমশ এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নথি। এই সবের মধ্য থেকে ঐতিহাসিকভাবে বেশ কিছু ছবির উল্লেখ করা যায় যা পৃথিবীতে প্রথম। হ্যাঁ প্রথম, বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রথম তোলা ছবি (some of the first photographs of the earth)। সর্বপ্রথম তোলা ছবি, প্রথম রঙিন ছবি, প্রথম ডিজিটাল ছবি, প্রথম আন্ডারওয়াটার ছবি আরো কত শ্রেণিতে প্রথম সেইসব ছবির সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক।

প্রথম তোলা ছবি – ১৮২৬ সাল। জোসেফ নিসফোর নিপ্স-এর ক্যামেরায় তোলা হল পৃথিবীর প্রথম তোলা ছবি। ক্যামেরায় ছবি তোলা এখনকার মতো অত সহজসাধ্য ছিল না তখন। বিশেষ প্রকারের হেলিওগ্রাফি পদ্ধতিতে ফ্রান্সের বার্গান্ডি প্রদেশে নিজের বাড়ির দোতলার সিঁড়ি থেকে বাইরের বাগানের ছবি তোলেন জোসেফ নিপ্স।

এই হেলিওগ্রাফি পদ্ধতিতে আসলে কাচ বা ধাতব পাতের উপর জুডার বিটুমিনের প্রলেপ দেওয়া থাকে যা আলোকে সংবদ্ধ করতে সাহায্য করে। এই বিটুমিন একপ্রকার অ্যাসফল্ট যা তিনি ক্যামেরার পিউটার পাতের উপর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। অস্পষ্ট, দানাদার এই ছবিই ছিল পৃথিবীর ছবি তোলার ইতিহাসে প্রথম ক্যামেরায় তোলা ছবি। ছবিটির নাম – “ভিউ ফ্রম দ্য উইন্ডো অ্যাট লে গ্রাস ( “View from the Window at Le Gras)


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


প্রথম রঙিন ছবি – ছবি তোলা নিয়ে এরপর বিভিন্ন মহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে লাগলো। আগে ছবি ছিল সাদা-কালো। কিন্তু এরপর ১৮৬১ সালে স্কটিশ পদার্থবিদ্‌ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল প্রথম রঙিন ছবি তুলে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলেন। ছবির বিষয় ছিল খুবই সামান্য, একটা টারাটান ফিতে যাকে ‘বো’ বলা হয়।

কীভাবে তোলা হল সেই রঙিন ছবি? তিন বার লাল, হলুদ ও নীল এই তিনটি ভিন্ন রঙের ফিল্টার ব্যবহার করে আলাদা আলাদা ছবি তুলে সেটাকেই একটা একটা যৌগিক রঙে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এই ছবিটি তুলেছিলেন জেমস। এর জন্য তাঁকে সংযুক্ত বর্ণ তত্ত্বের জনক বলা হয়ে থাকে।

প্রথম আণ্ডারওয়াটার ছবি – জলের উপরে আর নয়, এবারে সোজা জলের নিচে ছবি তোলার প্রয়াসে সফল হলেন লুইস মেরি অগাস্ত বুটান। ১৮৯৯ সালে সমুদ্রের প্রায় ১৬৪ ফুট নীচে নিজের বানানো আণ্ডারওয়াটার ক্যামেরা দিয়ে প্রথম নিজেরই ছবি তোলেন বুটান।

প্রায় তিরিশ মিনিট ধরে ছবি তোলার জন্য নাইট্রোজেন নার্কোসিসে আক্রান্ত হন তিনি। জলের নীচে এমনিতেই আলো কম, তাই যথাযথ আলো পাবার জন্য তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করতেই হতো। কী পদ্ধতিতে তোলা হল সেই জলের নীচের ছবি? একটা অক্সিজেন-পূর্ণ ব্যারেলের উপর একটা অ্যালকোহল ল্যাম্প থাকে, একটা রবারের বেলুনের মতো অংশের সাহায্যে ম্যাগনেশিয়াম গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয় সেই শিখায় যাতে আলো তৈরি হয়। পদ্ধতিটি খুব একটা যে অনায়াসে করে ফেলা যায় তা নয়। তবু বুটানের তোলা এই ছবিটি এক অর্থে জলের নীচে তোলা প্রথম নিজস্বীরও আখ্যা পেতে পারে।

প্রথম ডিজিটাল ছবি – একেবারে শুরু থেকে সাদা-কালোই হোক আর রঙিনই হোক অ্যানালগ ক্যামেরাতেই আলো বিশেষ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করে ছবি তোলা হতো। ১৯৭৫ সালে কোডাক কোম্পানির প্রকৌশলীরা প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা তৈরি করলেও তার কুড়ি বছর আগেই তোলা হয়েছিল প্রথম ডিজিটাল ছবিটি। কম্পিউটারের সাহায্যে রাসেল কির্শ্চ ১৭৬ × ১৭৬ পিক্সেলের একটা ডিজিটাল ছবি তৈরি করে ফেলেন ১৯৫৭ সালে। তাঁর তিন মাসের সন্তানের সদ্য তোলা ছবিকে কম্পিউটারে স্ক্যান করে এই ডিজিটাল ছবিটি বানানো হয়েছিল।

সেকালের কম্পিউটারও অত উন্নত ছিল না, বেশি তথ্য সংরক্ষণ করতে পারতো না বলে ছবিটার রিজোলিউশনও অনেক কম ছিল। আজ আমরা স্মার্টফোনই হোক বা এসএলআর ক্যামেরাতেই হোক এই ডিজিটাল পদ্ধতিতেই ছবি তুলি, আর ভাবলে অবাক লাগে ঠিক একই চিন্তা আজ থেকে ৬৪ বছর আগেই ভেবেছিলেন রাসেল।

আকাশ থেকে তোলা প্রথম ছবি – আমরা যাকে সহজ করে বলি ‘এরিয়াল ভিউ’ বা চিত্রনাট্যের ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘বার্ডস আই ভিউ’, সেইরকম ভাবে প্রথম আকাশ থেকে ছবি তোলা হয় ১৮৬০ সালে। এখনকার মতো উন্নত ড্রোন ছিল না তখন, ছিল বেলুন। গরম হাওয়া ভরা বিশালাকায় বেলুন। মানুষ তখন সদ্য সদ্য ওড়ার কথা ভাবছে, বিমান তৈরিরও আগের ইতিহাস এটা। আর ঠিক এইসময়েই জেমস ওয়ালেস ব্ল্যাক বেলুনে চড়ে বস্টন শহরের একটা ছবি তুলে ফেলেন মাটি থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উপরে উঠে। সেই ইতিহাস-বিখ্যাত ছবিটির নাম দেন তিনি ‘বস্টন, অ্যাজ দ্য ঈগল অ্যাণ্ড দ্য ওয়াইল্ড গুজ্‌ সি ইট’।

কিন্তু এখানেও বিতর্ক আছে। জেমস ওয়ালেসেরও আগে ১৯৫৮ সালে প্রথম বেলুনে চড়ে ফ্রান্সের একটি ছবি তুলেছিলেন চিত্রগ্রাহক গ্যাসপার ফেলিক্স টুর্নাকন। সে ছবির পেটেন্টও সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ফ্রান্সের মাটি থেকে ১৬০০ ফুট উঁচু থেকে তোলা সেই ছবিটি এখন আর পাওয়া যায় না। সেই হিসেবে জেমস ওয়ালেসের তোলা ছবিকেই পৃথিবীর প্রথম আকাশ থেকে তোলা ছবির মর্যাদা দেওয়া হয়।

সূর্যের প্রথম ছবি – ফরাসি পদার্থবিদ লুইস ফিজোউ এবং লিও ফুকো সূর্যের একখানা ছবি তুলে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন সমগ্র পৃথিবীতে। সময়টা ১৮৪৫ সালের ২ এপ্রিল।

ডগারোটাইপ পদ্ধতিতে তোলা সেই সূর্যের ছবিই ছিল পৃথিবী থেকে তোলা সূর্যের প্রথম ছবি। এক সেকেণ্ডের ১/৬০ ভাগ সময়ে তোলা ছবিটিতে সূর্যের কলঙ্কগুলিও লক্ষ করা যায়।

চাঁদের প্রথম ছবি – সূর্যের ছবি তোলা যখন সফল, চাঁদই বা বাকি থাকে কেন। এই দুই দোসর নিয়েই তো পৃথিবীর রাত্রিদিন কাটে। চাঁদ দেখে মুগ্ধ কবির কবিতা পড়া যায়, তাহলে ছবিই বা তোলা যাবে না কেন! ১৮৪০ সালের ২৬ মার্চ জন. ডব্লু. ড্রেপার সেই ডগারোটাইপ পদ্ধতিতেই নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদের অবজারভেটরি থেকে চাঁদের প্রথম ছবিটি তোলেন।

ছবি তোলার সময় যান্ত্রিক কিছু গোলযোগের কারণে ছবিটি পরিস্কার আসেনি। বহু দাগ-ছোপে ভরা সেটাই আমাদের পৃথিবীর প্রথম তোলা চাঁদের ছবি।

চাঁদ থেকে তোলা পৃথিবীর প্রথম ছবি – ১৯৬৬ সালের ২৩ আগস্ট লুনার অর্বাইটার ১ নামের একটি চন্দ্রযান প্রথম চাঁদের কক্ষপথের ষোলো বার ঘোরার পর হঠাৎ অপরিকল্পিতভাবে চাঁদের কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর একটি ছবি তুলে নেয়। স্পেনের মাদ্রিদের কাছে নাসার নিরীক্ষণাগারে প্রথম সেই ছবিটি আবিষ্কার করেন রোবেলডো ডি শ্যাভেলা।

তখনও চাঁদে মানুষের পা পড়েনি। কিন্তু নাসা থেমে ছিল না, চন্দ্রভিযানের বহুল প্রচেষ্টার মধ্যে এটাই ছিল প্রথম চাঁদ থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি। এরপরেও অনেক রঙিন ছবি বিখ্যাত হয়েছে এই পৃথিবীর, কিন্তু এই ছবিটি রঙিন ছিল না – ছিল সাদা-কালো।

এই তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু শেষে যদি প্রথম সংবাদপত্রে মুদ্রিত ছবি কিংবা আকাশে বিদ্যুৎ-রেখার প্রথম ছবির কথা উল্লেখ না করা হয় তাহলে স্বাদটাই অপূর্ণ রয়ে যায়।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রথম ছবি – ১৮৪৭ সালে ডগারোটাইপ পদ্ধতিতে তোলা একটি ছবি প্রথম কোনো সংবাদপত্রে ছাপা হয়। ছবিটিতে দেখা যায় ফ্রান্সের এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। ছবিটি বিখ্যাত হয়ে গেলেও এর চিত্রগ্রাহকের নাম আজও অজ্ঞাত।

রইলো বাকি বিদ্যুতের ছবি। বৃষ্টি হলেই বজ্র-বিদ্যুৎ এখন তো প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আর হাতে ফোন বা ক্যামেরা থাকলেই আকাশের দিকে তাক করে কাঁটাতারের মতো আমাদের শিরা উপশিরার মতো বিদ্যুতের শিহরণ তোলা ছবি তুলতে আমরা কে না ভালোবাসি! কিন্তু জানেন কি প্রথম এই বিদ্যুতের ছবি কে তোলেন? উইলিয়াম জেনিংস।

প্রথম তোলা বজ্রপাতের ছবি – ১৮৮২ সালে ঠিক কীভাবে বজ্রপাত ঘটে, বিদ্যুতের ঝলকানির তীব্রতম মুহূর্তে ঠিক কেমনভাবে ধরা পড়ে সেই আলোকছটা তা চিরস্থায়ী ফ্রেমে ধরে রাখতে উইলিয়াম জেনিংস এর একটি ছবি তুলে নেন নিজের বাড়ির ছাদ থেকে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও