স্টেম সেল থেরাপি

স্টেম সেল থেরাপি

কোনো জটিল দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের (Bone Marrow Transplantation) কথা অনেকেই শুনে থাকবেন। খুবই পরিচিত একটি চিকিৎসাপদ্ধতি এটি। বাংলায় একে বলে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। এই চিকিৎসার মূলেই লুকিয়ে আছে স্টেম সেল থেরাপি (Stem Cell Therapy)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে আজ চিকিৎসকেরা এই স্টেম সেল থেরাপির সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পুনরায় সুস্থ, সচল ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারেন। ফলে বর্তমান সময়ে স্টেম সেল থেরাপির চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হল স্টেম সেল থেরাপি কী? আসুন জেনে নেওয়া যাক।

আমাদের শরীরের একপ্রকার অবিভাজিত কোষ হল এই স্টেম সেল (Stem Cell)। এই কোষগুলি বহুবার বিভাজিত হয়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে এবং নানা প্রকার কোষ-কলা গঠন করার গুণ রয়েছে এই কোষগুলির। ফলে এই কোষগুলির সাহায্যে অনায়াসেই শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মেরামত করা যায়। এই কোষগুলিকে বলা যায় আদি কোষ যা পরে বিভাজিত হয়ে যে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোষ তৈরি করতে সক্ষম। খুব সহজ উদাহরণের সাহায্যে স্টেম কোষ বুঝতে গেলে নিষিক্ত ডিম্বাণুর কথা বলতে হয় যাকে ‘জাইগোট’ (Zygote) বলা হয়। এই জাইগোট বিভাজনে সক্ষম। শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর মিলনের ফলে এই একক কোষ ‘জাইগোট’ তৈরি হয় যা বিভাজনের সময় দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে। একটি কোষ থেকে দুটি হয়, সেখান থেকে চারটি, তারপর আটটি এইভাবে বিভাজিত হতে হতে একক কোষ জাইগোট থেকেই কোটি কোটি কোষ তৈরি হয়ে আমাদের সম্পূর্ণ মানবদেহ গড়ে ওঠে। ফলে আমাদের যকৃতের কোষ, চোখের কোষ, স্নায়ুকোষ, রক্তের কোষ সবই কিন্তু ঐ জাইগোট থেকেই তৈরি। ঠিক এরকম ভাবেই বিভাজন আর পৃথকীকরণের মাধ্যমে স্টেম কোষ যে কোনো বিশেষ কোষ তৈরি করতে পারে।

Stem Cell Therapy for Alzheimer's
স্টেম সেল

এখন এই স্টেম কোষ অনেক ধরনের হয়ে থাকে – এমব্রায়োনিক স্টেম কোষ (Embryonic Stem Cell), ফিটাল স্টেম কোষ (Foetal Stem Cell), অ্যাডাল্ট স্টেম কোষ (Adult Stem Cell), পেরিফেরাল ব্লাড স্টেম কোষ (Periferal Blood Stem Cell), পেরিন্যাটাল স্টেম কোষ (Perinatal Stem Cell) ইত্যাদি। এমব্রায়োনিক স্টেম সেল থাকে ভ্রূণের মধ্যে যা অন্য একজন মানুষের গর্ভস্থ ভ্রূণ থেকে নিতে হয়। এই এমব্রায়োনিক স্টেম সেল থেকে রক্তকোষ, পেশিকোষ, স্নায়ুকোষ কিংবা যকৃত কোষ তৈরি হতে পারে। কোষ বিভাজনের আগে পর্যন্ত এমব্রায়োনিক স্টেম সেল হয় টোটিপোটেন্ট (Totipotent) অর্থাৎ অসদৃশ বহু কোষ সৃষ্টি করতে সক্ষম। দেখা গেছে জাইগোট সৃষ্টি হওয়ার সাতদিন পরে তৈরি হয় ব্লাস্টোসিস্ট (Blastocyst)। যদি ব্লাস্টোসিস্ট থেকে স্টেম সেল নেওয়া হয় তবে তাকে বলে প্লুরিপোটেন্ট (Pluripotent) অর্থাৎ তা মানবদেহে বিভিন্ন প্রকারের কোষ সৃষ্টিতে সক্ষম। আবার ফিটাল স্টেম সেল আসলে এমব্রায়োনিক স্টেম সেলেরই একটি প্রকার। এমব্রায়োকেই ভ্রূণসঞ্চারের আট সপ্তাহ পরে ফিটাস (Foetus) বলা হয়। অন্যদিকে বিশেষত অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সময় চিকিৎসকেরা অ্যাডাল্ট স্টেম সেল ব্যবহার করেন। এই অ্যাডাল্ট স্টেম সেল প্রত্যেক মানুষের দেহেই স্বল্প পরিমাণে উপস্থিত থাকে। এই স্টেম সেলগুলি শুধু কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গের কোষ তৈরি করতে পারে বলে একে মাল্টিপোটেন্ট স্টেম কোষ (Multipotent Stem Cell) বলা হয়। অ্যাডাল্ট স্টেম সেলের অপর নাম সোমাটিক স্টেম সেল (Somatic Stem Cell)। এটি অন্য মানুষের দেহ থেকে নিতে হয় না। যেমন হাড়ের অস্থিমজ্জার স্টেম কোষ যা রোগীর নিজের শরীরেই পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ব্লাড স্টেম সেল অস্থিমজ্জায় থাকলেও তার কিছু অংশ সরাসরি রক্তবাহের মধ্যেই পাওয়া যায়। আসলে রক্তের কণিকাগুলিই হল পেরিফেরাল ব্লাড স্টেম সেল যার মধ্যে লোহিতকণিকা, শ্বেতকণিকা, অণুচক্রিকা যা বহুমাত্রায় বিভাজিত হয়ে রক্ত এবং অনাক্রম্যতা তৈরি করে মানবদেহে। নাভিকুণ্ডলী (Umbilical Chord) এবং অ্যামনিওটিক তরলের (Amniotic Fluid) মধ্যে কিছু প্রকারের স্টেম সেল পাওয়া যায় যেগুলি নবজাতকের দেহকোষের সদৃশ। একেই পেরিন্যাটাল স্টেম কোষ বলে। তবে স্টেম সেলের ব্যবহার বা অবস্থান অনুযায়ী একে আরো দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে – অ্যালোজেনিক স্টেম কোষ (Allogenic Stem Cell) আর অটোলোগাস স্টেম কোষ (Autologus Stem Cell)। অ্যালোজেনিক স্টেম কোষ অন্য মানুষের শরীর থেকে নিতে হয় যেমন ভ্রূণ কোষ আর অটোলোগাস স্টেম কোষ রোগীর নিজের শরীর থেকেই পাওয়া যায়।

১৯০৯ সালে রাশিয়ার কলা-কোষ বিশেষজ্ঞ আলেকজাণ্ডার এম. ম্যাক্সিমো (Alexandar M. Maximo) এই স্টেম সেলের ধারণা দেন প্রথম। তিনি দীর্ঘ গবেষণা করে জানান যে রক্তকোষগুলি একটি নির্দিষ্ট একক পিতৃকোষ থেকেই জন্ম নিয়েছে যাকে তিনি পলিব্লাস্ট (Polyblast) বলে চিহ্নিত করেছেন। এই পলিব্লাস্টই আসলে আদি পর্বের স্টেম সেল। এরপর থেকেই বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে স্টেম সেলের প্রয়োগ কীভাবে সম্ভব তাই নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে প্রথম এডওয়ার্ড ডোনাল থমাস (Edward Donall Thomas) অন্য মানুষের থেকে স্টেম কোষ সংগ্রহ করে অস্থিমজ্জার প্রতিস্থাপন করেন রোগীর দেহে। সেটাই প্রথম স্টেম সেল থেরাপি বলে ধরা হয়। এই জন্য বিজ্ঞানী থমাস ১৯৯০ সালে নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। এর পরে যদিও স্টেম সেল থেরাপি নিয়ে বহু বিজ্ঞানী নানাবিধ গবেষণা করে গিয়েছেন নিরন্তর।

এই স্টেম কোষগুলি ব্যবহার করে শরীরের কোনো ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সারিয়ে তোলা যায়। যেমন গুরুতর আঘাতের কারণে যদি রোগীর মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে যায়, সেক্ষেত্রে স্নায়ুকোষ স্টেম সেল হিসেবে প্রতিস্থাপন করে স্পাইনাল কর্ড জুড়ে দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রথমে যে রোগী অক্ষম হয়ে পড়েছিল সে আবার হাঁটাচলা করতে পারে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো। একইরকমভাবে হৃদপিণ্ডের কোনো মৃত কোষ পুনরুদ্ধার করা যায় হৃদ্‌কোষের স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করে, আবার যকৃত কোষের স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে লিভার সিরোসিস রোগও সারানো সম্ভব। বর্তমানকালে স্টেম সেল থেরাপির সর্বজনগ্রাহ্য জনপ্রিয় উদাহরণ হল অস্থিমজ্জার প্রতিস্থাপন। ব্লাড-ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ করে পুনরায় রক্তকোষগুলি তৈরি করে নেওয়া যায়। হাড়ের ফাঁপা অংশে স্থিত অস্থিমজ্জা থেকেই রক্ত তৈরি হয়। এক্ষেত্রে তিনটি বিশেষ ধাপে স্টেম সেল থেরাপি করা হয়। এই পদ্ধতির আরেক নাম হল হেমাটোপোয়েটিক স্টেম সেল প্রতিস্থাপন। এই পদ্ধতির তিনটি ধাপ হল –

  • প্রথমে রোগীর কোমরের হাড় থেকে একটি অ্যাস্পিরেশন সূঁচের সাহায্যে রোগীর ওজনের উপর নির্ভর করে ৮০ মি.লি. থেকে ১২০ মি.লি. অস্থিমজ্জা বের করে নেওয়া হয়। এই পর্বে রোগীকে চেতনানাশকের সাহায্যে অচেতন করা হয়।
  • এর পরে পরীক্ষাগারে একইদিনে ৩-৫ঘণ্টার মধ্যে গ্র্যাডিয়েন্ট সেন্ট্রিফিউগেশন (Gradient Centrifugation) পদ্ধতিতে স্টেম সেলগুলিকে শুদ্ধ করে নেওয়া হয়। এই পর্ব চলাকালীন রোগীকে বিশ্রাম নিতে বলা হয়।
  • সব শেষে এপিডিউরাল সূঁচের মাধ্যমে পৃথকীকৃত এবং বিশুদ্ধ স্টেম কোষগুলিকে প্রবেশ করানো হয় যে অঙ্গের মেরামতি প্রয়োজন সেই অঙ্গে। কখনো তা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের পার্শ্বস্থ তরলের মধ্যে হতে পারে, কখনো বা পেশিকোষে, কখনো বা রক্তের মধ্যে।

এই স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে বহু জটিল রোগের নিরাময় সম্ভব। যেমন – রক্তের ক্যান্সার, অটিজম, ক্ষতিগ্রস্ত মেরুদণ্ড, প্যারাপ্লেজিয়া (Paraplegia), কোয়াড্রিপ্লেজিয়া (Quadriplegia), ব্রেন হ্যামারেজ, ডিমেনশিয়া (Dimensia), মাস্কুলার ডিসট্রফি (Muscular Distrophy), স্ট্রোক, নিউরো-ডিজেনারেটিভ রোগ ইত্যাদি। দেখা গেছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি দেওয়ার ফলে বহু শ্বেতকণিকা আর অস্থিমজ্জা বিনষ্ট হয়, তখন সুস্থ মানুষের অস্থিমজ্জা থেকে স্টেম কোষ নিয়ে নতুন করে রক্তকোষ তৈরি করানো হয় রোগীর দেহে। স্টেম সেল থেরাপির গবেষণা এগিয়ে চলেছে আরও জটিল দুরারোগ্য রোগ থেকে মানুষকে বাঁচানোর লক্ষ্যে।

আপনার মতামত জানান