সববাংলায়

সুধীরনাথ সান্যাল

বহু প্রতিভাবান বাঙালি নিজেদের মেধা ও কাজ দ্বারা আন্তর্জাতিক স্তরেও খ্যাতি লাভ করেছেন। বর্তমানে প্রায় বিস্মৃত হলেও তেমনই একজন বাঙালি হলেন সুধীরনাথ সান্যাল (Sudhirnath Sanyal)। তিনি ছিলেন মূলত একজন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানকে তিনি তাঁর মূল্যবান গবেষণা দ্বারা অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের অন্যতম একটি আবিষ্কার হল গর্ভনিরোধক বড়ি, যা নিয়ে বিদেশেও হইচই পড়ে গিয়েছিল। তাছাড়াও ক্যান্সারের মতো রোগ নিয়ে আজীবন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে গেছেন তিনি। চিকিৎসাকে মনে করতেন সেবা, কোনদিনই একে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চাননি তিনি। তাঁর তৈরি ঔষধের ফর্মুলার প্রতি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়েরও বিশ্বাস ছিল। এমন একজন কৃতি মানুষকে স্বর্ণপদক দিয়েও সম্মান জানানো হয়েছিল। আজ বাঙালি এমন একজন প্রতিভাকে প্রায় ভুলে গেছে।

১৯০০ সালের ২১ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত কলকাতার বোসপাড়া লেনে অত্যন্ত দরিদ্র এক পরিবারে সুধীরনাথ সান্যালের জন্ম হয়। তাঁর পিতা বৈকুন্ঠনাথ সান্যাল স্বামী বিবেকানন্দের সতীর্থ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গৃহী শিষ্য ছিলেন। জন্মের পরপরই সুধীরনাথের মায়ের মৃত্যু হলে শিশু সন্তানটিকে নিয়ে বৈকুন্ঠনাথ কী করবেন বুঝতে পারেন না। পরে ভেবেচিন্তে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ সেই সন্তানটিকে মা সারদার কাছে রেখে আসার জন্যই মনস্থির করেছিলেন। মা সারাদা সেই শিশুটিকে নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মায়ের স্নেহযত্নে বড় হতে লাগল সেই শিশু। মা সারদাই তার নাম রেখেছিলেন সুধীর। তিনি তাকে ‘সুধে’ বলে সম্বোধন করতেন।

সুধীরনাথ যখন বড় হতে থাকে, মা সারদা তাঁকে বিদ্যালয়ে পাঠান। অসাধারণ মেধাবী একজন ছাত্র ছিলেন সুধীরনাথ। মা সারদা তাঁকে বলতেন, সে যেন বড় হয়ে ডাক্তার হয়। এখানকার মানুষের চিকিৎসার অভাবের কথা মা সারদা তাঁকে বলেছিলেন। সুধীরকে বিবাহ না করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে বলেছিলেন তিনি। মা সারদার কথামতোই সুধীরনাথ সান্যাল ডাক্তার হয়েছিলেন এবং আজীবন বিবাহ করেননি।

ডাক্তারি পড়বার সময় ২৯টাকা ১ আনা দামের কেবলমাত্র একটি ডাক্তারির বই কিনেছিলেন সুধীরনাথ, সেটি হল ‘গ্রে’জ অ্যানাটমি’। এছাড়াও ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রিতে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। আমৃত্যু প্রায় বিনা পারিশ্রমিকেই রুগী দেখেছেন তিনি। বাঁকুড়া, বর্ধমান, বারাসাত ইত্যাদি দূরদূরান্ত থেকে রুগীরা আসত তাঁর কাছে। সকাল সাতটা থেকেই রুগীদের ভিড় জমে যেত। চিকিৎসাকর্মকে পয়সা রোজগারের একটা ব্যবসায়িক মাধ্যম হিসেবে কোনদিনই দেখেননি তিনি। মা সারদার স্নেহ এবং অমৃতকথা বুকে ধারণ করে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি। তাই অর্থের বিনিময়ে মানবসেবার পথে তিনি হাঁটেননি।

ডাক্তারিতে কৃতকার্য হওয়ার পরে ১৯২৮ সালে সুধীরনাথ সান্যাল তাঁর তিন  প্রতিভাবান বন্ধু ডা: দেবপ্রসাদ মিত্র, ডা: নলিনীবিহারী গুপ্ত এবং ডা: নারায়ণ রায়ের সঙ্গে মিলিতভাবে উত্তর কলকাতার বিবেকানন্দ রোডে ‘ক্যালকাটা ব্যাক্ট্রোলজিক্যাল ইন্সটিটিউট’ গঠন করেছিলেন। সেটিরই একটি ছোট্ট একফালি ঘরে সুধীরনাথ তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যেতেন। কেবল তাই নয়, এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে, যন্ত্রপাতিও সব তিনি নিজে হাতে তৈরি করতেন। এই গবেষণাগারে বসেই সুধীরনাথ শুরু করেন মেয়েদের গর্ভনিরোধক ঔষধ তৈরির জন্য জরুরি গবেষণা। গবেষণার সময় পর্যাপ্ত অর্থের সঙ্কুলান না হওয়ায় তিনি নিজের ক্যামেরা এবং অর্গানটি বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালে মটর ডাল থেকে মহিলাদের গর্ভনিরোধক এক বড়ি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন সুধীরনাথ। তাঁর এই আবিষ্কার পাশ্চাত্যের অনেক দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। জাপান এই বড়িকে গ্রহণ করে তাঁকে বিরাট সম্মান জানিয়েছিল। ১৯৫০ সালে ‘সান্যালস পিল’ নামের এই অত্যন্ত কমদামের গর্ভনিরোধক বড়িটিকে বাজারে ছেড়েছিলেন সুধীরনাথ। যে উদ্দেশ্যে এই বড়ি বানানো তাতে সফলতা পাওয়া গেলেও খুব একটা আর্থিক লাভ এর দ্বারা হয়নি। আমেরিকার বিখ্যাত ডুপন্ট কোম্পানি এই ‘সান্যালস পিল’কে পেটেন্ট করাতে চাইলেও সুধীরনাথ তাতে রাজী হননি, কারণ তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেকেই যেন এই ঔষধ তৈরি করতে পারে এবং এটি যেন অ্যাসপিরিনের মতো সস্তায় মানুষ কিনতে পারে। টাকার কথা, আর্থিক লাভের কথা না ভেবে মানুষের কল্যাণের কথাই ভেবেছিলেন মা সারদার আদর্শে বেড়ে ওঠা এই বাঙালি চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী।

ক্যান্সারের মতো জটিল মারণরোগের ঔষধ নির্মাণের জন্যও দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়েছিলেন সুধীরনাথ। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী জে বি এস হ্যালডেন যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তাঁর চিকিৎসা করতেন সুধীরনাথ। আসলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা করানোর পর তিনি সুধীরনাথের কাছে এসেছিলেন। সুধীরনাথের ক্যান্সার নিয়ে গবেষণার কথা পড়ে প্রথম থেকেই তিনি উৎসাহী ছিলেন। নিজের বানানো ওষুধ দিয়ে প্রতি শনিবার ভুবনেশ্বরে গিয়ে সুধীরনাথ  হ্যালডেনের চিকিৎসা করতেন। হ্যালডেন গবেষণার জন্যই ক্যান্সার-আক্রান্ত নিজের শরীরকে সুধীরনাথের হাতে একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছিলেন। হ্যালডেন সুধীরনাথকে বলেছিলেন ‘আই ওয়ান্ট টু বি ইওর গিনিপিগ’। এমনকি হ্যালডেন একথাও লিখে গিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর যেন তাঁর মৃতদেহটিকে ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য দেওয়া হয় এবং সেই পরীক্ষার ফলাফল যেন সুধীরনাথকে জানানো হয়।

পেটের রোগ এবং সর্দিকাশির জন্য সুধীরনাথের বিখ্যাত দুটি মিক্সচার ছিল। এতই অব্যর্থ ওষুধ ছিল সেদুটি, যে সুবিখ্যাত ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ও ওই মিক্সচারের জন্য রুগীদের পাঠাতেন।

সুধীরনাথের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গেও আলাপ ছিল। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো মানুষের সঙ্গে চলত তাঁর পত্রালাপ। একবার আমেরিকার বিখ্যাত ফিজিশিয়ান আব্রাহাম স্টোন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বিভিন্ন সাময়িকপত্রে তাঁর গবেষণাধর্মী লেখাও প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৩৮ সাল থেকে ‘ল্যান্সের’ জার্নালে নিয়মিতভাবে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। এছাড়াও ‘স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট’ এবং ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর মতো বিদেশের নামজাদা পত্রিকাতেও সুধীরনাথের গবেষণামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

বিধানচন্দ্র রায় সুধীরনাথের জন্য অনেক চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় সরকারের এক লক্ষ টাকার একটা গ্রান্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু নানাবিধ সরকারী নিয়মকানুন ও বাধ্যবাধকতার জন্য তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৬০ সালে ক্যালকাটা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন সুধীরনাথকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর কৃতিত্বের জন্য ‘মিন্টো গোল্ড মেডেল’ দ্বারা সম্মানিত করেছিল।

জীবনের শেষদিকে ক্যালকাটা ব্যাক্ট্রোলজিকাল ইন্সটিটিউট-এ নিজের ল্যাবরেটরিতেই একটি তক্তপোষে প্রায় সময় রাত কাটাতেন সুধীরনাথ। রবীন্দ্রনাথের গান ভীষণই ভালবাসতেন। শরীর ভাল না থাকলেও কখনও কোনও রুগীকে ফিরিয়ে দিতে চাননি তিনি।

১৯৯৩ সালের ১০ জুন ৯৩ বছর বয়সে এই মহান চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী সুধীরনাথ সান্যালের মৃত্যু হয়। এমন একজন মানবদরদী, প্রতিভাবান বাঙালিকে আমরা ভুলে গেছি।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘মনে পড়ে’, তপন সিংহ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, জানুয়ারি, ১৯৯৫।
  2. ‘অলৌকিক লীলায় শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা, স্বামীজী’ (দ্বিতীয় খন্ড), বিপুল কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, জয় তারা পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৫ এপ্রিল, ২০১১।
  3. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (দ্বিতীয় খণ্ড), সম্পাদক :- অঞ্জলি বসু, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৯

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading