ইতিহাস

ভূপেন হাজারিকা

ভূপেন হাজারিকা (Bhupen Hazarika) একজন স্বনামধন্য অসমীয়া কন্ঠ শিল্পী, গীতিকার কবি ও চলচ্চিত্রকার। তিনি অসমীয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে গানের জগতে প্রবেশ করলেও পরবর্তীকালে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গান রচনা করেছেন এবং কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর গানগুলি নানান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মানবতা, সার্ব্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, সাম্প্রদায়িক সখ্যতা, সার্ব্বজনীন ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি প্রভৃতি বিষয়গুলির ওপর ভিত্তি করে তাঁর গানগুলি রচিত হয়েছে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তাঁর সংগীত  বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তাঁর হাত ধরেই আসাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি এবং লোক সংগীতের জাতীয় পর্যায়ে হিন্দি সিনেমায় প্রবেশ ঘটেছে।

১৯২৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ায় ভূপেন হাজারিকার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নীলকান্ত হাজারিকা এবং মায়ের নাম শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। তাঁদের দশ সন্তানের মধ্যে ভূপেন হাজারিকা ছিলেন সকলের বড়। তাঁর মায়ের কাছেই তাঁর সঙ্গীত চর্চার হাতেখড়ি হয়। আসামের ঐতিহ্যবাহী সংগীত এবং ঘুমপাড়ানি গানের শিক্ষা মায়ের কাছ থেকেই পান তিনি। ১৯২৯ সালে তাঁর পরিবার গুয়াহাটির ভারালুমুখ অঞ্চলে চলে আসে এবং এখানেই ভূপেন হাজারিকার শৈশব অতিবাহিত হয়।

ভূপেন হাজারিকার শিক্ষাজীবনের শুরু গুয়াহাটির সোনারাম উচ্চ বিদ্যালয়, ধুবড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তেজপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর তিনি ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ‘ইন্টারমিডিয়েট আর্টস’-এ উত্তীর্ণ হন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ. পাস করেন। এরপর কিছুদিন তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে কাজ করেন। পরবর্তীকালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে বৃত্তি পেয়ে তিনি নিউ ইয়র্কে যান। নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ-দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব” (Proposals for Preparing India’s Basic Education to use Audio-Visual Techniques in Adult Education)।

১৯৩২ সালে ভূপেন হাজারিকার বাবা  ধূবরিতে চলে যান এবং ১৯৩৫ সালে তেজপুরে বসবাস করতে শুরু করেন। তেজপুরে থাকার সময়েই দশ বছর বয়সী ভূপেন হাজারিকা খ্যাতনামা অসমীয়া গীতিকার, নাট্যকার ও প্রথম অসমীয়া চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যোতিপ্রসাদ আগারওয়ালা এবং বিশিষ্ট অসমীয়া শিল্পী ও বিপ্লবী কবি বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার সংস্পর্শে আসেন। সেই অনুষ্ঠানে  তিনি তাঁর মায়ের শেখানো ‘বরগেট’ (শ্রীমন্ত শঙ্করদেব এবং শ্রী শ্রী মাধবদেব রচিত ঐতিহ্যবাহী ভক্তিমূলক ধ্রুপদী অসমিয়া  সংগীত) গেয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালে, ভূপেন হাজারিকা কলকাতায় আসেন। কলকাতায় আসার পর তিনি সেলোনা কোম্পানির জন্য অরোরা স্টুডিওতে প্রথম গানটি রেকর্ড করেন। পরবর্তীকালে ১৯৩৯ সালে ভূপেন হাজারিকা আগারওয়ালার ছবি ইন্দ্রমালতীতে দুটি গান গেয়েছিলেন। এই সময় তাঁর বয়স ছিল ১২ বছর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ‌প্রথম গান লিখেছিলেন। জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি অসমীয়া চলচ্চিত্রের একজন নামজাদা পরিচালক হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ, আসাম ও তার প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন এবং অনেক গান গেয়েছেন। অবশ্য এসব গানের অনেকগুলোই মূল অসমীয়া থেকে বাংলায় অনূদিত।

নিউইয়র্কে থাকাকালীন ভূপেন হাজারিকা বিশিষ্ট গায়ক ও সামাজিক অধিকার রক্ষার্থে সক্রিয় কর্মী পল রবসনের( Paul Robeson) সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। রবসনের দ্বারা তিনি যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবসনের Ol’ Man River গানের চিত্রকল্প ও থিম অবলম্বনে নির্মিত ভূপেন হাজারিকা বিখ্যাত ‘বিস্তীর্ণ দু’ পাড়ে’  গানটি। এই জনপ্রিয় গানটি বাংলা এবং হিন্দি সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে এবং শিল্পী নিজেই গেয়েছেন। আরো কিছু বিদেশি গানের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি, ভারতীয় ভাষায় বহু গান রচনা করেন। তিনি ‘We are in the Same Boat Brother ‘ গানের আধ্যাত্মিক ও বহুভাষায় সমৃদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ছিলেন এবং পরবর্তীকালে বহু স্টেজ পারফরম্যান্সেই এটির ব্যবহার করেছেন।

ভূপেন হাজারিকা ১৯৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার পর বামপন্থী ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (Indian People’s Theatre Association) সাথে যুক্ত হন।  ১৯৫৫ সালে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত আইপিটিএ-র (IPTA) তৃতীয় সমগ্র আসাম সম্মেলনের (Third All Assam Conference) রিসেপশন কমিটির সেক্রেটারি হন।

১৯৬৭ সালে তিনি নওবাইচা আসন থেকে আসাম বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গুয়াহাটি আসন থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী কৃপ চালিহার কাছে হেরে যান।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে প্রিয়ংবদা প্যাটেল-এর সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়, এবং ১৯৫০ সালে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। ১৯৫২ সালে তাঁদের একমাত্র সন্তান তেজ হাজারিকার জন্ম  হয়।

সারাজীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। ১৯৭৫ সালে ২৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ‘চামেলী মেমসাহেব’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে ‘পদ্মশ্ৰী’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭৯ সালে শ্রেষ্ঠ লোকশিল্প হিসেবে ‘অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন আওয়ার্ড’ (All India Critic Association Award ) পান।
১৯৭৯ সালে অরুণাচল প্রদেশ সরকারের কাছ থেকে সংগীত ও  চলচ্চিত্রে লোকসংগীত ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবিস্মরনীয় অবদানের জন্য ‘স্বর্ণপদক পুরস্কার’ পান। ১৯৭৯ এবং ১৯৮০‌ সালে ‘মহুয়া সুন্দরী’ এবং ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ নামক দুটি নাটকের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ‘ঋত্বিক ঘটক পুরস্কার’ লাভ করেন।
১৯৮৭ সালে ‘সংগীত নাটক অ্যাকাডেমী পুরস্কার’ অর্জন করেন। এই একই বছরে ‘বেঙ্গল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনে’-র তরফ থেকে ‘ইন্দিরা গান্ধী স্মৃতি’ পুরস্কার পান।
১৯৯২ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে জাপানে আয়োজিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে’ ‘রুদালী’ ছবির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান। ২০০১ সালে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত হন। ২০০৯ সালে ‘অসম রত্ন’ পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৯ সালে ‘সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘Friends of Liberation War Honour’-এ সম্মানিত করে। ২০১২ সালে মরণোত্তর ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধি পান। ২০১৯ সালে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মান অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে ড. ভুপেন হাজারিকা ‘অসম সাহিত্য সভা’-র সভাপতি হন। ২০০১ তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিগ্রি প্রদান করে।

ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী লোহিত নদীর ওপর ভারতের সর্বাপেক্ষা দীর্ঘতম সেতু ‘ঢোলা সাদিয়া সেতু’ তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ‘Moi Eti Zazabor’।

২০১১ সালের ৩০ জুন ভূপেন হাজারিকাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানী হাসপাতাল ও চিকিৎসা গবেষণা ইন্সটিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। এখানেই ২০১১ সালে ৫ নভেম্বর ভূপেন হাজারিকার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।