ইতিহাস

কামাল রনদীভ

কামাল রনদীভ (Kamal Ranadive) বা কামাল জয়সিং রনদীভ একজন ভারতীয় মহিলা জৈবচিকিৎসা বিজ্ঞানী(biomedical scientist) যিনি মূলত ভাইরাস ও বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের মধ্যে আন্ত-সম্পর্ক বিষয়ে গবেষণার জন্য প্রসিদ্ধ। ১৯৮২ সালে ভারতবর্ষের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মভূষণ জয়ী এই গবেষকের অবদান ভারতবর্ষের চিকিৎসা বিজ্ঞানে অপরিসীম। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, পরিকাঠামো আর মানবসম্পদ তিনি নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন। বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষা পৌঁছে বিজ্ঞান চেতনা জাগিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বিশ্বাস করতেন, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বিদেশ থেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োজন ও পরিকাঠামো বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে এসে তার দেশে প্রয়োগ করা উচিত,যাতে এদেশে নতুন ও উন্নত গবেষণার ক্ষেত্র, গবেষণাগার এবং গবেষক সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। তিনি ভারতীয় মহিলা বিজ্ঞানী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। পরিশ্রমী,দেশসেবিকা ও মেধাবী এই নারীকে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিকেল রিসার্চ (ICMR)’ Emeritus Medical Scientist ‘এর সম্মাননা প্রদান করেছে।

১৯১৭ সালের ৮ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে কামাল জয়সিং রনদীভের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন দিনকর দত্তাত্রেয় সমর্থ ও মাতা শান্তাবাই দিনকর সমর্থ। দত্তাত্রেয় ছিলেন পুণের ফার্গুসন কলেজের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক। সন্তানদের সঠিক ও উচ্চ শিক্ষা দেওয়া তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল। তবে পড়াশোনাতে তাঁদের সকল সন্তানের মধ্যে কামাল ছিলেন উজ্জ্বলতম। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল কামাল চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে একজন চিকিৎসককে বিবাহ করবেন। কিন্তু বাস্তবে কামালের বিবাহ হয় জয়সিং ত্রিম্বক রনদীব নামক এক গণিতজ্ঞের সঙ্গে। তাঁদের একমাত্র পুত্রের নাম অনিল জয়সিং।

কামাল রনদীভ তাঁর বিদ্যালয় শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন এইচ.এইচ.সি.পি. উচ্চবিদ্যালয় হুজুরপাগা থেকে। তারপর ফার্গুসন কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৩৪ সালে বটানি -জুলজি বিষয়ে distinctionসহ স্নাতক পাশ করেন। এরপর তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯৩৯ সালে স্বামীর সঙ্গে বম্বেতে স্থানান্তরিত হয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। ১৯৪৩ সালে পুণের এগ্রিকালচারাল কলেজ থেকে বিশেষ বিষয় সাইটোজেনেটিকস সহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা রোগবিশেষজ্ঞ ভি.আর. খানোলকরের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়(এখনকার মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ডক্টরেট ডিগ্রীলাভ করেন। এরপর তাঁর অনুপ্রেরণায় ও পরামর্শে বৃত্তি সহ উচ্চতর গবেষণার জন্য বিদেশে আবেদন করতে থাকেন। শেষে বাল্টিমোরের জনস্ হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ সহ জর্জ গে(George Gay)-এর সঙ্গে কলাকোষ কালচার পদ্ধতি (Tissue culture techniques) নিয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা সম্পূর্ণ করেন। গবেষণা শেষে দেশে ফিরে শুরু হয় তাঁর নিরলস কর্মজীবন।

দেশে ফিরে কামাল রনদীভ সিনিয়র রিসার্চ অফিসার রূপে ইন্ডিয়ান ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে যুক্ত হন এবং সেখানে পরীক্ষামূলক জীববিজ্ঞানের (Experimental Biology) ও কলাকোষ কালচার বিষয়ের (Tissue culture) জন্য দুটি গবেষণাগার নির্মাণ করেন।১৯৬০ সালে গবেষণার জন্য কিছু বিক্রিয়ক(reagents), কলাকোষ বৃদ্ধির জন্য কালচার মাধ্যম (tissue culture media) তৈরীর প্রয়োজন হয়। তখন তিনি কয়েকজন জৈবরসায়নবিদ এবং জীববিজ্ঞানী নিয়োগ করে একটি দল গঠন করেন। গবেষণার পাশাপাশি এইভাবে দেশে নানা নিত্যনতুন গবেষণার পরিসর এবং গবেষক তৈরী করার জন্য তিনি বিদেশে বিজ্ঞান গবেষণারত ভারতীয়দের উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেই ভারতবর্ষে কার্সিনোজেনেসিস (Carcinogenesis) ,জীবকোষবিদ্যা(Cell biology), অনাক্রম্যতা(Immunology) ও কলাকোষ কালচার (Tissue culture) বিষয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্র উন্মোচন করেন।১৯৬২-১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা ছিলেন।

তিনি প্রথম টিউমার ভাইরাস ও হরমোনের আন্ত:সম্পর্কের সঙ্গে ক্যান্সার প্রবণতার যোগসূত্র শনাক্ত করেন। তিনি ও তাঁর গবেষক সঙ্গীরা নানা প্রাণীদেহকে মাধ্যম রূপে ব্যবহার করে ব্লাড ক্যান্সার (Leukaemia),স্তন ক্যান্সার(Breast cancer),খাদ্যনালীর ক্যান্সারের (Oesophageal cancer) কারণ ও প্রভাব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মডেল প্রস্তুত করেন। এর আগে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের গবেষণা করার সময় নানা প্রজাতির ইঁদুরের মধ্যে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে গবেষণা করেন।১৯৪৫ সালে ‘Comparative morphology of normal mammary glands of four strains of mice varying in their susceptibility to breast cancer’ শিরোনামযুক্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে জিন, দেহতত্ত্বের গঠন(histological structure) ও সন্তান প্রজননের (child bearing) সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করেন। নারী ও শিশুদের ক্যান্সার, আদিবাসীদের রক্তের অনাক্রম্যতা(Immunology of tribal blood) বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। বংশগত কারণে শিশুদের কোষের ম্যালিগন্যান্সি, রক্তের অস্বাভাবিকতার (Dyscrasias) বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়েছিল।

ক্যান্সারের পাশাপাশি কুষ্ঠরোগের ভাইরাসকে নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, যা পরবর্তীকালে কুষ্ঠরোগের টীকা আবিষ্কারের পাথেয় ছিল। কুষ্ঠ ও ক্যান্সার বিষয়ে তাঁর ২০০টিরও বেশী গবেষণাপত্র প্রকাশ পেয়েছিল।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গবেষণা পত্র হল- ১.Effect of Urethane on nucleic acids.২. Betel quid chewing & oral cancer: experimental studies on hamsters.৩. Influence of splenectomy on the development of leukaemia in male mice of the ICRC strain. ৪. Characterization of mammary tumor of strain ICRC mouse.

গবেষণার পাশাপাশি দেশে বিজ্ঞান চেতনা ও শিক্ষার প্রসার এবং গবেষণার পরিকাঠামো সুদৃঢ় করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কামাল নানা বিষয় ও শাখার আরো ১১ জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে মিলে ১৯৭৩ সালে ইন্ডিয়ান উওম্যান সাইন্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (IWSA) গঠন করেন। এই প্রতিষ্ঠান নারী ও শিশুদের জীবনযাত্রার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য-পুষ্টির মান নির্ণয় এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে তোলার জন্যও ব্রতী ছিল। এছাড়াও সংস্থার পক্ষ থেকে কর্মরতা নারীদের জন্য মূল ভবনসংলগ্ন হোস্টেল তৈরী করা হয়েছিল । বর্তমানে সংস্থাটির কাজও বিস্তৃত হয়েছে আর সেই সঙ্গে এর কিছু শাখাও নির্মিত হয়েছে।

এছাড়াও নিজের গবেষণার জন্য ও নারীও শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষার উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে সত্যনিকেতন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কামাল মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলা ও সংলগ্ন নানা গ্রামীণ এলাকার শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টির বন্দোবস্ত এবং নারী ও শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী ছিলেন। এছাড়া ১৯৬৬-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টাকা মেমোরিয়াল সেন্টারের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মভূষণ ছাড়াও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কার,পদক ও সম্মাননা পেয়েছিলেন কামাল রনদীভ । তার মধ্যে ১৯৫৮ সালে বাসন্তী দেবী আমিরচাঁদ পুরস্কার, অণুজীববিদ্যা বিষয়ে কুষ্ঠরোগ নিয়ে গবেষণার জন্য জি.জে. ওয়াটামাল ফাউন্ডেশন (G.J.Wutumull Foundation)থেকে প্রাপ্ত ১৯৬৪ সালে জি.জে. ওয়াটামাল মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐ একই বছরে মেডিকেল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার থেকে প্রথম ‘রজত জয়ন্তী গবেষণা পুরস্কার’ স্বরূপ স্বর্ণপদক ও নগদ পনেরো হাজার টাকা প্রাপ্তি হয়। ১৯৭৬ সালে স্যান্ডোজ ওরেশন পুরস্কারে এবং ১৯৮২ সালে স্যান্ডোজ স্বর্ণপদক ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা মহাবিদ্যালয় কর্তৃক ডিসটিঙ্গ্যুইশড্ উওম্যান অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

এছাড়া Indian National Science Academy-র ‘Deceased Fellow’ -এর সম্মানলাভ করেছিলেন কামাল রনদীভ।

২০০১ সালে ড: কামাল রনদীভের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন