ইতিহাস

দারা সিং

দারা সিং (Dara Singh) একজন ভারতীয় পেশাদার কুস্তিগির যিনি বিখ্যাত মূলত তাঁর কুস্তির জন্য। কুস্তি ছাড়া অভিনয় ও রাজনীতিতেও ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। বিভিন্ন হিন্দি ও পাঞ্জাবী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্য লেখকের ভূমিকাও পালন করেছিলেন তিনি। রামানন্দ সাগর পরিচালিত অত্যন্ত জনপ্রিয় পৌরাণিক ধারাবাহিক “রামায়ণ’’-এ হনুমানের চরিত্রে তাঁর কালজয়ী অভিনয় বোধহয় কোনো ভারতবাসীর পক্ষেই ভোলা সম্ভব নয়। এছাড়া তিনিই প্রথম ভারতীয় ক্রীড়াবিদ যিনি রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন। ডব্ল্যু ডব্ল্যু ই (WWE) হল ফেম ক্লাস অব ২০১৮-র কিংবদন্তি বিভাগে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন।

১৯২৮ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ অধিকৃত পাঞ্জাবের অমৃতসরের ধর্মচাক নামে এক গ্রামে দারা সিংয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সুরত সিং রান্ধওয়া, যিনি ছিলেন এক সাধারণ কৃষক। মায়ের নাম বলবন্ত কৌর রান্ধওয়া, তিনি ছিলেন গৃহবধূ। দারা সিংয়ের ভাই সর্দার সিং রান্ধওয়া পরবর্তীকালে দাদার মতো অভিনয় ও কুস্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। দারা সিংয়ের প্রকৃত নাম ছিল দিদার সিং রান্ধওয়া। কুস্তির রিংয়ে নামার সময় থেকেই তিনি তাঁর ডাকনাম “দারা’’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। ১৯৩৭ সালে উনিশ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় বচনো কৌর-এর সাথে। কিছুদিন পরে জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান পরদুমন রান্ধওয়া, যিনি পরবর্তীকালে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু এই বৈবাহিক সম্পর্ক চিরস্থায়ী হয়নি। বচনো কৌর-এর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬১ সালে দারা পুনরায় সুরজিৎ কৌর নামে এক মহিলাকে বিবাহ করেন। তাঁদের মোট পাঁচটি সন্তান ছিল। বীরেন্দর সিং ও অমৃক সিং নামে দুই পুত্র এবং দীপা সিং, কমল সিং ও লাভলীন সিং নামে তিনটি কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন সুরজিৎ। বড় হওয়ার পর বীরেন্দর ও অমৃকও বেছে নিয়েছিলেন অভিনয় জীবন।

দারিদ্র্যের কারণে বেশ ছোট অবস্থাতেই পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন দারা। ফলে প্রথাগত শিক্ষা বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাঁর কাছে অধরাই থেকে গিয়েছিল। পরিবার প্রতিপালনের জন্য সেই ছোট্ট বয়সেই বাবার সাথে চাষের কাজে নেমেছিলেন তিনি। সেই সময় থেকেই কুস্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে থাকে তাঁর মনে। কোনো তালিম ছাড়াই স্থানীয় বিভিন্ন কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন তিনি।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৪১ সালে দারার বয়স যখন মাত্র ১৩, বাড়ি ছেড়ে রোজগারের আশায় পাড়ি দিলেন সিঙ্গাপুর। একটি ড্রাম তৈরির কারখানায় কাজও জুটে গেল তাঁর। এই সময়েই তিনি গুরুত্ব সহকারে কুস্তির প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তাঁর গুরু ছিলেন হরমন সিং। সিঙ্গাপুরের গ্রেট ওয়ার্ল্ড স্টেডিয়ামে শুরু হয় তাঁর কুস্তিগির হয়ে ওঠার যাত্রা। এই সিঙ্গাপুরেই তিনি ১৯৪৭ সালে টার্লক সিংকে হারিয়ে ‘চ্যাম্পিয়ান অফ মায়লয়েশিয়া’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দারার উচ্চতা ৬ ফুট অতিক্রম করে। ওজন দাঁড়ায় ১৩০ কেজি ও বুকের ছাতির মাপ পৌঁছায় ১৩০ সেন্টিমিটারে। এই শারীরিক গঠন তাঁকে ভারতীয় মল্লযুদ্ধের একটি বিশেষ ধারা ‘প্যাহেলওয়ানি’ বা ‘পালোয়ানী’কে বেছে নিতে উৎসাহিত করে। অনেক দিন ধরে তিনি এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে গ্রেকো রোমান স্টাইলে একটি কুস্তি প্রতিযোগিতায় তিনি গোরক্ষপুরের ব্রহ্মদেব মিশ্রার কাছে পরাজিত হন। খেলাটি হয়েছিল কলকাতার ধর্মতলা ময়দানে।

১৯৫২ সালে দারা চিত্রজগতে প্রবেশ করেন। ওই বছরেই মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি ‘সাংদিল’। তাঁর প্রথম জীবনের ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সিকন্দর-এ-আজম’, ‘ওয়াতন সে দূর’, ‘শের দিল’ ইত্যাদি। ১৯৫৬ সালে দারার সঙ্গে কুস্তির মঞ্চে মুখোমুখি হন ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত কুস্তিগির এমিল চাজে, যিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ‘কিং-কং’ নামেই। ২০০কেজি ওজনের সেই বিশালাকার মানুষটিকে দারার নিজের মাথার উপরে তুলে ঘোরানোর দৃশ্য আজও অনেক ভারতবাসী মনে রেখেছে। বিখ্যাত কুস্তিগির লু থিসের মতে দারা ছিলেন “অত্যন্ত খাঁটি একজন কুস্তিগির”।

এই ‘কিং-কং’ নামটি দারার জীবনে আরো একবার ফিরে আসে। ১৯৬২ সালে ‘কিং-কং’ নামের একটি ছবিতে তিনি সর্বপ্রথম নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটির পরিচালক ছিলেন বাবুভাই মিস্ত্রি। ১৯৬৩ সাল থেকে দারা সিং জুটি বাঁধতে শুরু করেন বিখ্যাত নায়িকা মুমতাজের সাথে। তাঁরা একসাথে ১৬টি ছবি করেছিলেন। দারা ও মুমতাজ অভিনীত কিছু বিখ্যাত ছবি হল ‘জওয়ান মর্দ’, ‘রাকা’, ‘আঁধি অউর তুফান’, ‘ডাকু মঙ্গল সিং’, ‘বক্সার’, ‘বীর ভীমসেন’ ইত্যাদি। সেই সময় এই জুটিই ছিল সর্বাধিক বেতনের বি-গ্রেড অভিনেতা। দারা সিং প্রতি ছবিতে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা বেতন পেতেন। দারা সিং অভিনীত শেষ হিন্দি ছবি ছিল ‘জব উই মেট’ ও শেষ পাঞ্জাবী ছবি ‘দিল আপনা পাঞ্জাবী’।

১৯৭০ সালে সালে দারা সিং একটি প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করেন যার নাম ছিল ‘দারা ফিল্ম’। ১৯৭৮ সালে একই নাম দিয়ে পাঞ্জাবের মোহালিতে স্থাপন করেন রাজ্যের প্রথম ফিল্ম স্টুডিও। ১৯৭৯- সালে মধ্যমেয়াদী লোকসভা নির্বাচনের আগে জৈল সিং ও সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে দারা কংগ্রেসের হয়ে প্রচারে নেমেছিলেন তিনি। সেই সময় প্রবল গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল তিনি এবার কংগ্রেসে যোগ দিতে চলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
১৯৮০ সাল থেকে তিনি ছোটপর্দায় বিভিন্ন ধারাবাহিকে অভিনয় করতে শুরু করেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ছিল রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’ ধারাবাহিকে হনুমানের চরিত্রটি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন পৌরাণিক ধারাবাহিকে ভীম, বলরাম ও মহাদেবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর টেলিভিশন জীবনের কয়েকটি বিখ্যাত ধারাবাহিক হল ‘লব কুশ’, ‘বিক্রম আউর বেতাল’, ‘হাদ কর দি’, ‘পাপা বন গ্যায়ে হিরো’, ‘ক্যায়া হোগা নিম্মো কা’, ‘যুগ’ ইত্যাদি। অভিনয়ের সাথে সাথে তিনি বেশ কিছু ছবি পরিচালনাও করেছিলেন। ১৯৮২ সালে মুক্তি পায় ‘রুস্তম’, যেটি ছিল একইসাথে দারা সিং পরিচালিত ও প্রযোজিত প্রথম ছবি। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলির মধ্যে ‘ভক্তি মে শক্তি’ ও তাঁর প্রযোজিত ছবির মধ্যে ‘করণ’ উল্লেখযোগ্য।

১৯৮৩ সালে দিল্লিতে তিনি শেষবারের মতো কুস্তির মঞ্চে লড়তে নামেন। এটি ছিল তাঁর ৫০০তম ম্যাচ। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন রাজীব গান্ধী করেছিলেন এবং বিজয়ীর উপাধি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জৈল সিং উপস্থাপন করেছিলেন। এই মঞ্চ থেকেই দারা তাঁর খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
১৯৮৬ সাল থেকে শুরু হয় রামানন্দ সাগর পরিচালিত বিপুল জনপ্রিয় পৌরাণিক ধারাবাহিক ‘রামায়ণ’। এই ধারাবাহিকে আপামর ভারতবাসী দারাকে দেখতে পায় ‘হনুমান’ চরিত্রে। এই চরিত্রটিই তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় দারা সিংয়ের আত্মজীবনী ‘মেরি আত্মকথা’। এই রচনাটির মূল ভাষা ছিল পাঞ্জাবী।

১৯৯৮ সালে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করেন দারা সিং। যোগদান করেন ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ বা সংক্ষেপে বিজেপিতে। ২০০৩ সালে এই দলের হয়েই তিনি রাজ্যসভার সদস্যপদ লাভের জন্য বিবেচিত হন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছর তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। তিনি এই সময় ‘জাঠ মহাসভা’ নামে একটি ধর্ম সংগঠনের সভাপতিও হয়েছিলেন।

কুস্তিগির থাকাকালীন তিনি বহু প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছিলেন। ‘রুস্তম-ই-হিন্দ’ বা ‘চ্যাম্পিয়ানশিপ অফ ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় টাইগার যোগিন্দর সিংকে হারিয়ে তিনি মহারাজ হরি সিং প্রদত্ত রুপোর কাপ জিতে নেন। কলকাতায় আয়োজিত কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়ানশিপে জর্জ গর্ডিয়েনকো-কে হারিয়ে দারা সিং বিজয়ী হন ও সেই সাথে জিতে নেন ‘রুস্তম-ই-পাঞ্জাব’ খেতাবও। মুম্বইয়ে লু থিসকে হারিয়ে জিতে নেন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ।

চলচ্চিত্র জীবনেও তিনি লাভ করেছিলেন বহু উপাধি। যেমন — ‘আয়রনম্যান অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা’, ‘দ্য অরিজিনাল মাসল ম্যান অফ বলিউড’, ‘অ্যাকশন কিং অফ বলিউড’ ইত্যাদি। ‘যজ্ঞ’ ছবিটির জন্য দারা সিং সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান। এই পুরস্কার ছিল তৎকালীন ভারত সরকারের তরফ থেকে ইন্দিরা গান্ধীর দেওয়া। বলবন্ত সিং দুলাট পরিচালিত ও দারা সিং অভিনীত ‘ম্যায় মা পাঞ্জাব দি’ ছবিটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল।

২০১২ সালের ১২ জুলাই ৮৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুম্বইয়ের নিজস্ব বাসভবনে দারা সিংয়ের মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও