জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী! মহালয়ার পুণ্যভোরে বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেজে উঠতেই আমাদের ঘুম ভাঙে। গানের কথাতেই তো আমরা চিনেছি দেবী দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী। প্রহরণ শব্দের অর্থ অভিধান মতে, যার দ্বারা প্রহার বা সংহার করা হয়, অর্থাৎ অস্ত্র। দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে আমাদের সকলের আরাধ্যা দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন বলেই পুরাণের কাহিনীতে আমরা জেনে এসেছি। কিন্তু এই দশ অস্ত্র কী কী তা যেমন আমাদের অনেকেরই মনে থাকে না, তেমনি আমরা অনেকেই জানি না এই দশটি অস্ত্রের তাৎপর্য ঠিক কী? আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক।
মহিষাসুরকে বধের জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের সঙ্গে একযোগে সকল দেবতার শক্তি মিলিত হলে মহামায়া আবির্ভূতা হন যিনিই পরে দুর্গার রূপ ধারণ করেন। প্রত্যেক দেবতার তেজে সেই নারী মূর্তির শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গড়ে ওঠে এবং দেবীর দশটি হাত আবির্ভূত হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, পৃথিবীর দশটি দিকের প্রতিভূ এই দশ হাত। কুবের, যম, ইন্দ্র, বরুণ, ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈঋত, ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এই দশ দিক থেকে মহিষাসুরকে বধ করার উদ্দেশ্যে দেবী দুর্গার দশটি হাত সৃষ্টি হয় বলে পুরাণে বলা হযয়েছে। দেবীর এই দশ হাতে দশটি অস্ত্র দান করেন দেবতারা। দেবী মূর্তির দিকে তাকালে দেখা যাবে মূলত আটটি হাতে অস্ত্র পৃথক পৃথক অস্ত্র থাকলেও দুটি হাতে একটিই ত্রিশূল ধারণ করে দেবী অসুরনিধন করেন। দেবীর শরীর গড়ে ওঠার পরে দেবতারা তাঁকে বস্ত্র, অলঙ্কার এবং অস্ত্র দান করেন। মহাদেবের থেকে ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, বরুণদেবের শঙ্খ, অগ্নিদেবের থেকে অগ্নিভল্ল, পবনদেবের ধনু ও তূণ, ইন্দ্রের থেকে বজ্র, যমরাজের থেকে গদা বা কালদণ্ড, ব্রহ্মার থেকে পদ্ম-অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, নাগরাজের থেকে সর্প তথা নাগপাশ, ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতের থেকে দেবীকে দেন ঘন্টা এবং সবশেষে সিদ্ধিদাতা গণেশ দেবীকে দেন খড়্গ। এছাড়াও বিশ্বকর্মা দেবীকে দিয়েছিলেন কুঠার ও ঢাল। এই প্রতিটি অস্ত্রের বিশেষ বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। হিন্দু পুরাণগুলি এই অস্ত্রগুলির বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছে। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার দেবী দুর্গার উৎপত্তির সম্পূর্ণ কাহিনী বলা হয়েছে প্রথম মার্কণ্ডেয়পুরাণে। এখন দেখে নেওয়া যাক কোন অস্ত্রের কী তাৎপর্য।
১) শঙ্খ: পুরাণ মতে, শঙ্খের থেকে যে শব্দের উৎপত্তি হয় তার থেকেই জীবজগতের সমস্ত প্রাণের সৃষ্টি। সৃষ্টির প্রতীক এই শঙ্খ দেবী দুর্গার বাম হাতে থাকে। শঙ্খ একইসঙ্গে জাগরণের প্রতীক। যুদ্ধের সময় শঙ্খ বাজিয়ে যুদ্ধের সূচনা হতো। পুরাণে বলা আছে, পৃথিবী সৃষ্টির সময় জলমগ্ন ছিল আর তখন শ্রীবিষ্ণু একটি শঙ্খের রূপে অবস্থান করছিলেন সমুদ্রের গভীর তলদেশে। এই শঙ্খের মধ্য দিয়েই মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন দেবী।
২) চক্র: মা দুর্গার ডান হাতে থাকে সুদর্শন চক্র। এর অর্থ হল সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছেন দেবী দুর্গা এবং তাঁকে কেন্দ্র করে সমস্ত বিশ্ব আবর্তিত হচ্ছে। আবার একইসঙ্গে ‘সু’ কথার অর্থ সুন্দর-অপরূপ আর ‘দর্শন’ মানে দেখা। সুদর্শন চক্র এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপার সৌন্দর্য্যের প্রতীক। বিশ্বকর্মা এই সুদর্শন চক্র নির্মাণ করেছিলেন শ্রীবিষ্ণুর জন্য। জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য এই সুদর্শন চক্রের সৃষ্টি।
৩) কালদণ্ড বা গদা: কালদণ্ড আনুগত্য, ভালোবাসা এবং ভক্তির প্রতীক। মহাকালের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক এই গদা বা কালদণ্ড। দেবীর বাম হাতে এই কালদণ্ড বা গদা বিশ্বের সম্মোহনী শক্তিরূপে কাজ করে।
৪) পদ্ম: দেবীর হাতের পদ্ম সমাজকে অসাধারণ একটি বার্তা দেয়। পাঁকের মধ্যে জন্মায় পদ্ম, কিন্তু তবু সে কত সুন্দর। তেমনই মায়ের আশীর্বাদে অসুররাও তাঁর ভিতরের অন্ধকার থেকে যেন মুক্ত হয়, এই বার্তাই দেয় পদ্মফুল। এই পদ্ম একাধারে সর্বশক্তির আধার। এছাড়া দেবী দুর্গার ডান হাতে থাকা কমণ্ডলু ও অক্ষমালা পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক।
৫) খড়্গ: শ্রীশ্রীচণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী দেবীর আরেক রূপ চামুণ্ডা এই খড়্গের সাহায্যে অসুরদের মুণ্ডচ্ছেদ করে সেই মুণ্ডমালা গলায় পরেছিলেন। আবার এই খড়্গ দিয়ে বলি দেওয়া হয়। বলিপ্রথার কিন্তু আরেকটি পৌরাণিক তাৎপর্য আছে। হিংসা, ক্রোধ, মোহ, মদ, অহং ইত্যাদি ষড়রিপু থেকে মুক্তি পাওয়ার, আত্মাকে শুদ্ধ করে তোলার প্রক্রিয়া হল বলি। দেবীর হাতে উদ্যত খড়্গ বরাভয় দিয়ে আমাদের মোক্ষলাভের প্রতীক হয়ে ওঠে।
৬) তীর-ধনুক: লক্ষ্যভেদের প্রতীক এই তীর-ধনুক। জীবনের সমস্ত প্রতিকুল পরিস্থিতিতে লক্ষ্য স্থির রেখে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাদায়ী এই তীর-ধনুক যা কেবল সামনের লক্ষ্যভেদেই নিবিষ্ট থাকে।
৭) ঘন্টা: ঘণ্টার ধ্বনিতে যুদ্ধের সূচনা হয়, শাঁখ-ঘন্টার মিলিত নিনাদে অশুভ শক্তির বিনাশের কাল ঘোষিত হয়ে থাকে। দেবীর ঘন্টার বাদ্য অসুরকে দূর্বল করেছিল।
৮) বজ্র: দেবীর হাতের বজ্র দৃঢ়তা এবং সংহতির প্রতীক। এই দু’টি গুণেই মানুষ জীবনে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন। দেবীর বাম হাতে থাকা এই বজ্র তৈরি হয়েছিল দধীচী মুনির হাড় দিয়ে।
৯) সর্প বা নাগপাশ: মহিষাসুর প্রতি মুহূর্তে রূপ বদলে ফেলায় দেবী দুর্গা যখন তাঁকে পরাস্ত করতে পারছিলেন না সেই সময় নাগরাজ অনন্তনাগের দেওয়া এই নাগপাশ ব্যবহার করে অসুরকে তিনি বন্দি করেন। এই নাগপাশ বা সর্প আসলে বিশুদ্ধ চেতনার প্রতীক।
১০) ত্রিশূল: ত্রিশূলের তিনটি তীক্ষ্ণ ফলার তিনটি আলাদা আলাদা অর্থ রয়েছে। মানুষ তিনটি গুণ বা ত্রিগুণার সমন্বয়ে তৈরি – সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। ত্রিশূলের ফলায় দেখা যাবে মাঝের ফলাটি অন্য দুটির থেকে বেশি উঁচু। ঐটি হল সত্ত্ব গুণের প্রতীক। ত্রিশূলের তিনটি ফলা এই তিনটি গুণকেই নির্দেশ করলেও পরোক্ষে আমাদের সত্ত্ব গুণের অধিকারী হওয়ার বার্তা দেয়। সত্ত্ব গুণই মোক্ষ আনতে পারে।
দশঅস্ত্রে সজ্জিত দেবীকে কুবের অলঙ্কারে ভূষিত করেন, সূর্যদেব দেবীকে কাঞ্চনবর্ণের সৌন্দর্যময় দ্যুতি প্রদান করেন এবং অপার রূপের প্রতীক হয়ে ওঠেন দেবী দুর্গা। দূর্ভেদ্য কবচ-কুণ্ডল এবং অক্ষয়বস্ত্র দিয়ে দেবীকে সুরক্ষিত করেন বিশ্বকর্মা আর হিমালয় তাঁকে দেন বাহনদেব সিংহ। দেবতাদের মিলিত তেজে আর শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুর্গা অসুরনিধন করে মহিষাসুরমর্দিনী রূপ লাভ করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- পুরান ও পৌরানিক, সচ্চিদানন্দ দাস, পুস্তক বিপণি (২০১৫)।
- আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ই অক্টোবর ২০০৬।
- বর্তমান পত্রিকা, ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০০৮।
- https://rplus.in/
- https://pujoparba.thewall.in/
- https://banglaxp.com/
- https://archive1.ittefaq.com.bd/


আপনার মতামত জানান