কলকাতার মতো প্রাচীন এই শহরের বুকে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র প্রাচীন সব মন্দির। কলকাতার ইতিহাসের আলোচনায় তাদের প্রসঙ্গও উঠে আসে। কলকাতার জনপ্রিয় ও ব্যস্ত একটি রাস্তা বিধান সরণী বা কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ওপর অবস্থিত ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি (Thanthania Kalibari) তেমনই একটি শতাব্দী প্রাচীন মন্দির। এই মন্দির এবং এখানে অধিষ্ঠিত বিগ্রহকে আজও এতটাই জাগ্রত বলে মনে করা হয় যে, বিশেষ বিশেষ দিনে ভক্ত মানুষের ঢল উপচে পড়ে এখানে। এই মন্দিরের মা কালী “দেবী সিদ্ধেশ্বরী” নামে পরিচিত। এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের নামও জড়িত। ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্যই কলকাতায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে এই কালীমন্দির অবশ্য দর্শনীয় স্থানের তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
এই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি বা ঠনঠনে কালীবাড়িটিকে ঘিরে কিন্তু আবার বেশ কিছু কিংবদন্তিও প্রচলিত রয়েছে। কেন এই মন্দিরের নাম ঠনঠনিয়া হল প্রচলিত কিংবদন্তিটির মধ্যেই সেই উত্তর নিহিত রয়েছে। কথিত আছে, একসময় এই এলাকাটি ঘন জঙ্গলে আবৃত ছিল এবং ডাকাতদের উপদ্রব লেগেই থাকত এখানে। আশপাশের বসতিগুলিকে ডাকাতদের আগমন বার্তা দিয়ে সতর্ক করবার জন্যই এখানে একটি ঘন্টা প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। ডাকাতদের আক্রমনের সময় যখন এই ঘন্টা বাজানো হত তখন ঘন্টার ‘ঠন ঠন’ শব্দটি ছড়িয়ে যেত গোটা এলাকায়। সেই ঘন্টাধ্বনি থেকেই পরবর্তীকালে এই জায়গার নাম ঠনঠনিয়া বা ঠনঠনে হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এছাড়াও উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিক মারাঠা ডিচ বা পরিখাটি মন্দির থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। এই মারাঠা খালের উদ্দেশ্যই ছিল বর্গি এবং ডাকাতদের হামলাকে আটকানো।
এই মন্দির নিয়ে আরও যে কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে, তা হল, এখানে এক তান্ত্রিক ব্রহ্মচারী একটি মাটির ঢিবির ওপর বসবাস করতেন এবং তিনি পঞ্চমুন্ডি আসনের ওপর একটি কালীর মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এখানে মন্দিরটি নির্মিত হয়।
এবারে মন্দিরের ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। মন্দিরের সামনে উপরদিকে, এমনকি ভিতরের একটি ফলকে ১১১০ বঙ্গাব্দ লেখা রয়েছে, অর্থাৎ আনুমানিক ১৭০৩ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে হয়। মন্দিরের ভিতরের ফলকে তারিখটির সঙ্গে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শঙ্কর ঘোষের নাম উল্লিখিত রয়েছে। অথচ অন্যদিকে, এইচইএ কটন’স ক্যালকাটা ওল্ড অ্যান্ড নিউ অনুযায়ী, ঠনঠনিয়াতে সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি স্থাপন করেন ব্রহ্মচারী উদয়নারায়ণ এবং তাঁর মৃত্যুর পর পৌরিহিত্যের দায়িত্ব তুলে নেন একজন হালদার ব্রাহ্মণ। সেই ব্রাহ্মণের জীবদ্দশায় ঠনঠনিয়ার বাবু শঙ্করচন্দ্র ঘোষ ১২১০ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮০৩ সাল নাগাদ বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এই দুটি সালের মধ্যে কোনটি ঠিক তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবে মন্দিরগাত্রে খোদিত প্রথম সালটিকেই গুরুত্ব দেন অনেকে।
এই শঙ্করচন্দ্র ঘোষের নাতি সুবোধচন্দ্র ঘোষ, পরবর্তীকালে যিনি স্বামী সুবোধানন্দজী নামে পরিচিত হন, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রত্যক্ষ শিষ্য ছিলেন। ১৮৫৩ সালের কাছাকাছি সময়ে ঝামাপুকুর লেনের কাছে শ্রী রাধাপ্রসাদ মিত্রের বাড়িতে থাকার সময় রামকৃষ্ণদেব প্রায়শই এই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি যেতেন বলে জানা যায়।
রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার বংশের এমন একটা যোগাযোগ থাকায় এই অঞ্চলের জঙ্গল এবং সেখানে তান্ত্রিক এক ব্রহ্মচারী দ্বারা কালীমূর্তি স্থাপনের কাহিনী রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্রকাশিত বইগুলিতে বৈধতা লাভ করেছে। সাধক কবি রামপ্রসাদ সেনও প্রায়শই আসতেন ঠনঠনিয়ার মা সিদ্ধেশ্বরীকে প্রণাম করতে।
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি-র স্থাপত্য যে খুবই আকর্ষণীয় তা নয়। এই মন্দিরে ভারতবর্ষের বহু প্রাচীন মন্দিরের মতো সূক্ষ্ম ভাস্কর্যের কারুকাজ, দেয়ালগাত্রে খোদিত মূর্তি বা পৌরাণিক কাহিনি ইত্যাদি চোখে পড়বে না। খুবই সাধারণ দেখতে একটি মন্দির। রাস্তার একেবারে পাশেই অবস্থিত প্রাচীন এই মন্দিরের বাইরের কাঠামোটি বাদামি রঙের টাইলস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সাদা একটি গম্বুজ দেখা যায় মন্দিরের ওপরে। ২০১৮ সালে ধাতুর অক্ষর দিয়ে মন্দিরের নাম এবং প্রতিষ্ঠার সালটি খোদাই করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের ভিতরটা শ্বেত পাথরে বাঁধানো। প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী মন্দিরের ছাদটি কাঠের কড়িবর্গা এবং চারটি স্তম্ভের সাহায্যে মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে মন্দিরের ডানদিকের দেওয়ালে শ্বেতপাথের দুটি ফলকের দিকে চোখ চলে যায়। একটিতে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা শঙ্কর ঘোষের নামসহ প্রতিষ্ঠাকালটি খোদাই করা রয়েছে। অন্য ফলকটিতে লেখা রয়েছে একটি লাইন– ‘শঙ্করের হৃদয় মাঝে কালী বিরাজে’। এখানে শঙ্কর বলতে যেমন মহাদেবকেও বোঝানো হয়েছে, তেমনই একই সঙ্গে ভক্ত ও মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা শঙ্কর ঘোষের দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে। গর্ভগৃহের সামনের চাতালে লোহার খাঁচায় আবদ্ধ একটি হাড়িকাঠ দেখতে পাওয়া যায়। তান্ত্রিক মতে পুজো হয় বলে এখানে আজও অমাবস্যায় এবং কালীপূজার রাতে পশুবলি দেওয়া হয়।
মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি তাকালেই মা সিদ্ধেশ্বরীর বিগ্রহ চোখে পড়ে। গর্ভগৃহের অংশে দেখা যায় তিনটি দ্বার। একেবারে মাঝের দ্বার দিয়ে ভিতরে তাকালে প্রধান কালীমূর্তিটি দেখা যাবে। কালীমূর্তির পাশেই রামকৃষ্ণদেবের একটি মূর্তিও চোখে পড়ে। প্রধান এই মন্দিরের বামদিকে রয়েছে শিবের মন্দির। মন্দিরের ভিতরেরই একটি মার্বেল পাথরে খোদিত লেখা থেকে জানা যায় সেই শিবমন্দিরটি ১১১৩ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৭০৬ সাল নাগাদ মূল মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় দুবছর পর নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের দরজায় রূপালি পাতের ওপর খোদিত দেখা যায় বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি।
এই মন্দিরের মা সিদ্ধেশ্বরীর প্রধান বিগ্রহটি মাটির তৈরি। এই মূর্তি কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদলানো হয় না। কেবল প্রয়োজনমতো মাটি দিয়ে সংস্কার করে নিয়ে একটি মূর্তিকেই বছরের পর বছর পুজো করে আসা হচ্ছে। দেবীর গায়ে পরানো থাকে আসল সোনার অলঙ্কার। প্রয়োজনমাফিক সংস্কারের পর সেইসব সোনার গহনায় পুনরায় দেবীকে সজ্জিত করা হয়।
বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষত কালীপুজোর সময়ে এই ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরে জাঁকজমক হয় দেখবার মতো। অক্টোবর-নভেম্বর মাস নাগাদ অনুষ্ঠিত দীপাবলি বা কালীপূজার সময় খুব ধুমধাম হয় এখানে। অজস্র ভক্ত সেইসময় জড়ো হন মাকে পূজা প্রদান করবার জন্য। কালীপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গনে প্রতিস্থাপিত হাড়িকাঠে পশুবলি দেওয়া হয়।
এছাড়াও নিত্যদিন সকাল ও সন্ধ্যা উভয় সময়েই আরতি হয়। মঙ্গল এবং শনিবার প্রচুর মানুষ ভিড় করেন মন্দিরের দরজায়। সেই দুটি দিন ও বিভিন্ন কালীপূজায় বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রতিদিন আরতির পর ভোগ বা প্রসাদও পাওয়া যায় এখানে। অবশ্য এই ভোগের জন্য আগে থেকে একটি টোকেন কাটতে হয়। সকাল ছটা থেকে বেলা এগারোটা পর্যন্ত এবং বিকেল তিনটে থেকে আটটা পর্যন্ত মন্দিরের দ্বার সকলের জন্য খোলা থাকে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান