ইতিহাস

গণতন্ত্রের গোড়ার কথা

গণতন্ত্র কথাটার সঙ্গে কম বেশি আমরা সকলেই পরিচিত – যাঁরা প্রায় কিছুই বোঝেন না তাঁরাও জানেন ‘ভোট’ এর কথা।খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে কোন জনগোষ্ঠীর বা দলের সব থেকে বেশি জনের যে মত সেই মত অনুযায়ী তাদের কাজকর্ম বা নীতি নির্ধারিত হলে তাকে বলা হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, আর এই মত দানকে আমরা ভোট দেওয়া বলি। বর্তমানে গণতন্ত্র কথাটা দেশের শাসন ব্যবস্থার সাথে জড়িত হলেও গণতন্ত্র যেকোন ছোট দল বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও হতে পারে। আধুনিককালে গণতন্ত্রকে যেকোন প্রতিষ্ঠান (দেশও এক প্রতিষ্ঠান ধরে নিয়েই) পরিচালনার সর্বোত্তম ব্যবস্থা বলে মনে করা হয়। তবে এখানে বর্তমান নয় বরং এখানে গণতন্ত্রের গোড়ার কথা নিয়ে আলোচনা করব।

‘গণতন্ত্র’ শব্দটির ইংরেজি ডেমোক্রেসি (Democracy)। ডেমোক্রেসি কথাটি এসেছে গ্রিক শব্দ  দেমোক্রাতিয়া (Demokratia) থেকে, যার অর্থ ‘জনগণের শাসন’ (Rule by people); দেমোক্রাতিয়া  শব্দটি আবার এসেছে দেমোস (Demos) বা ‘জনগণ’ ও ক্রাতোস (Kratos) বা ‘ক্ষমতা’ থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০৮-৫০৭ অব্দে ক্লিস্থেনিস ( Cleisthenes)  গ্রিসের এথেন্স শহরে বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারণে ক্লিস্থেনিসকে এথেনিয়ান ডেমোক্রেসির জনক বলা হয়।

অবশ্য মজার কথা হল – গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির  সূচনা এথেন্সে বলা হলেও প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করত। একেবারে প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে শিকার করত তখন যেকোন সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক রীতি মেনে নিত। এর লিখিত প্রমাণ না থাকলেও, ইদানিং কালে অশিক্ষিত বা নিরক্ষর উপজাতিদের উপর করা গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে। এমনকি হাজার হাজার বছরের পুরনো এই সব গোষ্ঠীগুলির কাছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গোষ্ঠী পরিচালনা করা সব থেকে স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই প্রতিপন্ন হত। বহু বছর এই পদ্ধতিতে চলার পর যখন শিকার ছেড়ে মানবগোষ্ঠীগুলো চাষ আবাদ এর জন্য বিভিন্ন জায়গায় থিতু হল, শুরু হল লেন-দেন প্রথা বা ব্যবসা ।গোষ্ঠীগুলো আকার, আয়তনে বাড়তে থাকল। এক জায়গায় বসতি স্থাপনের ফলে বিভিন্ন ধরণের পেশা বা শ্রমের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ল। শ্রমের শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পরিবারের হাতে সম্পত্তি, সামরিক শক্তি ইত্যাদির অসম বন্টনও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। ফলত, গোষ্ঠী পরিচালনার জন্য আগেকার যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল – এখন সে জায়গায় কোনও কোনও বিশেষ পরিবার বা শ্রেণির মানুষের হাতে গোষ্ঠী পরিচালনার ভার তুলে দেওয়াই স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠল। ফলত, বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ধীরে ধীরে গোষ্ঠীপতি, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি বিভিন্ন প্রথার শুরু হল যে প্রথাগুলি গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতি।

পরবর্তীকালে, একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের শাসকগণ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলে খ্রিষ্টপুর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মানুষেরা পুনরায় উপলব্ধি করল সকলের দ্বারা পরিচালিত গোষ্ঠী শাসন বা রাজ্য শাসন এর প্রয়োজনীয়তা। এথেন্সে যে সময়ে ক্লিস্থেনিস ‘ডেমোক্রেসি’র সূচনা করেন তার সমসময়ে বা কিছু আগে আরও অন্যান্য ছোট ছোট রাজ্য বা গোষ্ঠীতে গণতন্ত্র-এর পুনরাবির্ভাব হয়। প্রাচীনযুগের সেই গণতন্ত্র আধুনিকযুগ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গৃহীত হয়েছে এবং গণতন্ত্র পরিচালনা পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যা গণতন্ত্রের গোড়ার কথা শীর্ষক লেখার বিষয় বহির্ভূত।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!