আলিপুর চিড়িয়াখানা (Alipore Zoological Garden) ভারতের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী চিড়িয়াখানাগুলির মধ্যে অন্যতম। এই চিড়িয়াখানা পশুপাখি প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রাণী সংরক্ষণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখে। এই চিড়িয়াখানা শহরের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রই শুধু নয়, শহরের জনপ্রিয় পিকনিক স্পটও বটে। দেখবার মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, গন্ডার, হাতি, জাগুয়ার, জিরাফ, জেব্রা, বনমানুষ, জলহস্তী, বিভিন্ন ধরনের সরীসৃপ, পাখি ইত্যাদি রয়েছে। কলকাতায় থাকলে একবার হলেও আলিপুর চিড়িয়াখানা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা করা উচিত। এটি কলকাতা চিড়িয়াখানা নামেও পরিচিত।
আলিপুর চিড়িয়াখানা কোথায়
এই চিড়িয়াখানা কলকাতা জেলার আলিপুর এলাকায় অবস্থিত। এটি বর্ধমান শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং শিলিগুড়ি থেকে ৫৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আরও পড়ুন: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভ্রমণ
আলিপুর চিড়িয়াখানার ইতিহাস

১৮৭৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আলিপুর চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা হয়। চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করতে বহু মানুষ আর্থিক সাহায্য করেছিলেন, যাদের মধ্যে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক ছিলেন প্রথম ভারতীয় সাহায্যকারী। তাঁর অর্থানুকূল্যে চিড়িয়াখানার মধ্যে প্রথম প্রাণী আবাস “মল্লিক হাউস” নির্মিত হয়। প্রথম চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সদস্যরা সকলেই ছিলেন বিদেশী, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শোয়েন্ডলার এবং বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ জর্জ কিং। চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন রাম ব্রহ্ম সান্যাল, যিনি চিড়িয়াখানার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তাঁর সময়েই ১৮৮৯ সালে চিড়িয়াখানায় সুমাত্রান গন্ডারের একটি শিশুর জন্ম এই চিড়িয়াখানার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
বিভিন্ন মানুষের অর্থানুকূল্যে এখানে প্রাণীদের থাকার জায়গা গড়ে উঠেছিল। অবশেষে ১৯৯২ সালে সেন্ট্রাল জু অথরিটি প্রতিষ্ঠার পরে বিভিন্ন প্রাণীদের জন্য উন্মুক্ত খাঁচাগুলো নির্মিত হয়। ২০০৯ সালে চিড়িয়াখানার ম্যানেজমেন্ট পশ্চিমবঙ্গ জু অথরিটির কাছে স্থানান্তরের পর, চিড়িয়াখানার পুরনো এবং অব্যবহৃত প্রাণী আবাসগুলি ভেঙ্গে নতুন আবাস গড়ে তোলা হয়।
আলিপুর চিড়িয়াখানা কীভাবে যাবেন
বাসে গেলে কলকাতার যেকোনো এলাকা থেকে সরাসরি আলিপুর চিড়িয়াখানা যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। মেট্রো করে গেলে রবীন্দ্র সদন বা নেতাজী ভবন মেট্রো স্টেশনে নেমে সেখান থেকে চিড়িয়াখানা যাওয়ার বাস পাওয়া যায়।
আলিপুর চিড়িয়াখানাতে কোথায় থাকবেন
চিড়িয়াখানার আশেপাশে বহু হোটেলে থাকবার বন্দোবস্ত রয়েছে। বিভিন্ন মানের এবং দামের হোটেল রয়েছে। এখানে শহরের সেরা কিছু ফাইভ স্টার হোটেলও রয়েছে। হোটেলে আগে থেকে বুক করে রাখা ভালো। তবে কলকাতা, হাওড়া, হুগলী জেলা বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে ঘুরতে এলে একদিনেই ঘোরা সম্ভব। কাছাকাছি কোথাও থেকে হোক বা একদিনের জন্যই হোক, আলিপুর চিড়িয়াখানা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আপনার একবার অবশ্যই করা উচিত।
আলিপুর চিড়িয়াখানাতে কী দেখবেন
বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি

চিড়িয়াখানাতে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি দেখতে পাবেন। এখানে চিড়িয়াখানার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পশুপাখির তালিকা দেওয়া হল –
- বিভিন্ন প্রজাতির বাঘ
- সিংহ
- বিভিন্ন ধরণের হরিণ
- ভারতীয় গন্ডার
- ভারতীয় হাতি
- জিরাফ
- ভাল্লুক
- জেব্রা
- ক্যাঙ্গারু
- শিম্পাঞ্জি
- কচ্ছপ
- জলহস্তী
- কুমীর
- ঘড়িয়াল
- বিভিন্ন প্রজাতির সাপ
- ময়ূর
- টিয়া পাখি
- রাজহাঁস
- ফ্লেমিঙ্গো
- উটপাখি
এগুলো ছাড়াও আরও বেশ কিছু পশুপাখি রয়েছে, রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ। তবে পশুপাখিদের খাওয়াবেন না বা বিরক্ত করবেন না। এছাড়াও চিড়িয়াখানার ভেতরে বড় লেক এবং সবুজ বাগান রয়েছে।
পিকনিক

পিকনিক বলতে এখানে রান্না করতে পারবেন না। তবে বাড়ি থেকে রান্না করে আনা খাবার নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। সঙ্গে শালপাতা প্লেট বা বাটি নিতে ভুলবেন না, কারণ এখানে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। পিকনিকের পর এখানে খাবার-দাবারের প্যাকেট বা আবর্জনা ফেলে আসবেন না, অন্যথায় জরিমানা হবে। পিকনিক করলেও জোরে গান চালানো যাবে না, ব্যাডমিন্টন বা অন্যান্য খেলাধুলা করা যাবে না। এগুলো খেয়াল রাখবেন।
এখানে বেশ কিছু দোকান রয়েছে। সেখান থেকেও খাবার কিনে খেতে পারেন। তবে শীতকালে প্রচণ্ড ভিড় থাকায় দোকানে খাবারের লাইনে দাঁড়ালে অযথা সময় নষ্ট হবে। তাই অন্য সময়ে দোকানে দাঁড়ালেও পিকনিকের জন্য গেলে বাড়ি থেকে খাবার নিয়েই যাওয়া ভাল।
আরও পড়ুন: কলকাতার পিকনিক স্পট
আলিপুর চিড়িয়াখানাতে কখন যাবেন
বৃহস্পতিবার বাদে সারা সপ্তাহ চিড়িয়াখানা খোলা থাকে। প্রতি বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকলেও ছুটির দিন পড়লে বৃহস্পতিবারও খোলা থাকে, বিশেষ করে শীতকালে সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকে। সকাল নটা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা অবধি চিড়িয়াখানা খোলা থাকে। তবে টিকিট কাউন্টার বিকাল সাড়ে চারটেয় বন্ধ হয়ে যায়। চিড়িয়াখানাতে টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। বড়দের জন্য টিকিটমূল্য ৫০ টাকা এবং ৫ বছর বয়স অবধি ছোটদের জন্য ২০ টাকা। অনলাইনে আগে থেকে টিকিট কেটে রাখলে লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হবে না।
সারা বছর ধরে এখানে গেলেও সাধারণত শীতে ভিড় উপচে পড়ে। শুধু পশুপাখি দেখতেই নয়, শীতকালে পিকনিক করতেও মানুষ ভিড় জমায় এখানে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- পশুপাখিদের খাওয়াবেন না বা বিরক্ত করবেন না।
- প্লাস্টিকের বোতল, খাবার-দাবারের প্যাকেট ইত্যাদি ফেলে আসবেন না, অন্যথায় জরিমানা হতে পারে।
- জোরে গান চালানো যাবে না, ব্যাডমিন্টন বা অন্যান্য খেলাধুলা করা যাবেনা।
- প্রতি বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকে।
- ৫ বছরের উপরে প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা এবং ৫ বছর বয়স অবধি প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।
- অ্যাকোয়ারিয়ামের জন্য টিকিটমূল্য হল ৫ বছরের উপরে ২০ টাকা এবং ৫ বছর বয়স অবধি ১০ টাকা।
- চিড়িয়াখানা সকাল নটা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা অবধি খোলা থাকে।
- টিকিট কাউন্টার বিকাল সাড়ে চারটেয় বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রিপ টিপস
- অনলাইনে আগে থেকে টিকিট কেটে রাখলে লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হবে না।
- শীতকালে পিকনিক করতে হলে বাড়ি থেকে খাবারদাবার, শালপাতার প্লেট বা বাটি, চাদর নিয়ে যাবেন। তাহলে খাবারের দোকানে ভিড়ে দাঁড়াতে হবে না।
- ১০ টাকা দিয়ে চিড়িয়াখানার ম্যাপ কিনতে পাওয়া যায়। ম্যাপ সঙ্গে রাখলে আপনার ঘুরতে সুবিধা হবে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: ইকো পার্ক
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান