সববাংলায়

তাজমহল ভ্রমণ

পৃথিবীর নতুন সপ্তম আশ্চর্যের প্রথম আশ্চর্য তাজমহল। যতই এর বর্ণনা শুনে থাকুন বা ছবিতে দেখে থাকুন না কেন, এটির প্রকৃত সৌন্দর্য নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। সাদা মার্বেলের এত সুন্দর কাজ এবং এত বৃহৎ সেটা, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না।

তাজমহল কোথায়

তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের আগ্রা শহরে অবস্থিত। এটি শহরের দক্ষিণাংশে, যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থান করছে। আগ্রা শহর ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে প্রায় ২৩৫ কিমি দূরে অবস্থিত।

তাজমহলের ইতিহাস

মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে তাজমহল সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৬৩১ সালে ১৪তম সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় মমতাজ মারা যান। তাঁর মৃত্যুশোকে সম্রাট শাহজাহান পাগলের মত হয়ে ওঠেন। তিনি স্থির করেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর নামে একটি সৌধ গড়ে তুলবেন। সেই অনুযায়ী ১৬৩২ সালে তাজমহলের নির্মাণ শুরু হয় এবং তা শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ২২ বছর। প্রায় ২০,০০০ শিল্পী, কারিগর ও শ্রমিক কাজ করেছিল। সারা ভারত ও মধ্য এশিয়া থেকে আনা হয়েছিল মার্বেল, পাথর, মণিমুক্তা, লাল পাথর, সোনা ও রত্ন।

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে শাহজাহান নির্মাণ শেষে প্রধান স্থপতির হাত কেটে দিয়েছিলেন — যাতে আর কখনো এমন সৌন্দর্য সৃষ্টি না হয়। যদিও এই তথ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাজমহল কীভাবে যাবেন

ট্রেনে যেতে চাইলে আগরা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছে সেখান থেকে তাজমহল যাওয়া যায়। এই স্টেশন ভারতের প্রায় সব বড় শহরের সঙ্গে যুক্ত। বিমানে যেতে চাইলে নিকটতম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো দিল্লি বিমানবন্দর (প্রায় ২২০ কিমি দূরে)। সেখান থেকে ট্যাক্সি, প্রাইভেট গাড়ি করে যাওয়া যায়। তবে সবথেকে জনপ্রিয় মাধ্যম হল দিল্লী সফরে গিয়ে একদিনের বা দুদিনের ট্যুরে আগ্রা যাওয়া। বাস, প্রাইভেট গাড়ি বা ট্যাক্সিতে ৩-৪ ঘণ্টায় দিল্লী থেকে আগ্রা যাওয়া যায়। দিল্লী সফরে গেলে প্রচুর গাড়ি পাবেন যারা আগ্রা ট্যুর করায়।

তাজমহলে কোথায় থাকবেন

তাজগঞ্জ এলাকা তাজমহলের সবচেয়ে কাছাকাছি এলাকা। এখানে থাকলে হেঁটেই মূল ফটক পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। আগরা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের আশপাশে যাত্রীদের জন্য অনেক বাজেট হোটেল ও রেস্ট হাউস আছে। তবে সিকান্দ্রা বা আগরা ফোর্ট সংলগ্ন অঞ্চলে থাকলে তুলনামূলক নিরিবিলি এবং শান্ত পরিবেশে থাকা যায়। তাছাড়া এখানে পরিবার নিয়ে থাকার জন্যও ভাল।

তাজমহলে কী দেখবেন

মূল সমাধি সৌধ
তাজমহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মমতাজ ও শাহজাহানের সমাধি। তবে পর্যটকদের জন্য খোলা অংশে মূল সমাধির উপরে একটি প্রতিরূপ রয়েছে, কারণ আসল সমাধি নিচতলায় সুরক্ষিত রাখা আছে। সমাধির ওপরে গম্বুজ রয়েছে — যেটা প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু। তার চারপাশে মার্বেল খোদাই, ফুলেল মোটিফ ও কালিগ্রাফি চোখে পড়বে। ভিতরে প্রবেশ করলে প্রতিধ্বনি হয়, তাই আওয়াজ করবেন না।

চারবাগ বাগান
তাজমহলের সামনে যে বিশাল সবুজ এলাকা রয়েছে, তাকে বলে চারবাগ। এটি একটি পারস্য ঘরানার গার্ডেন প্ল্যান। চারটি জলস্রোত ও ছোট ছোট ব্রিজ দিয়ে বিভক্ত। এখানে ফুল, ফোয়ারা ও গাছপালা খুব ছিমছাম ভাবে সাজানো রয়েছে। এই বাগানে বসে তাজমহলের সামনের দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কেটে যায় হালকা হাওয়ার মতো।

মসজিদ ও জওয়াব
মূল সৌধের দুই পাশে রয়েছে মসজিদ ও জওয়াব।
মসজিদ (পশ্চিমে): এটি এখনো নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। লাল বালি পাথরের তৈরি এই স্থাপনাটির ছাদে রয়েছে বহু গম্বুজ ও মিনার।
জওয়াব (পূর্বে): দেখতে একেবারে মসজিদের মতো, তবে এটি আসলে ছিল নান্দনিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য। কোনো ধর্মীয় কাজ হয় না।
এই দুটি ভবনের সৌন্দর্যও মূল সৌধের সঙ্গে একাত্ম, এবং এখানে খুব সুন্দর ছবি তোলা যায়।

কালিগ্রাফি ও মার্বেল ইনলে কাজ
তাজমহলের চারপাশের মার্বেলে যেসব আয়াত লেখা রয়েছে, তা মূলত কালো পাথরের ইনলে করে বসানো। Quranic inscriptions মূল ফটক থেকে শুরু করে মূল সৌধ পর্যন্ত চলেছে। মার্বেলের মধ্যে সেমিপ্রেশিয়াস স্টোন বসিয়ে ফুলের ডিজাইন করা হয়েছে – একে বলে Pietra Dura। এই সূক্ষ্ম খোদাই ও ইনলে কাজ দেখতে হলে আপনাকে ধীরে ধীরে হেঁটে দেখতে হবে।

তাজ মিউজিয়াম (Taj Museum)
মূল বাগানের পশ্চিম পাশে একটি ছোট্ট মিউজিয়াম রয়েছে, যেখানে তাজমহল সংক্রান্ত বহু ঐতিহাসিক দলিল ও বস্তু রয়েছে, যেমন শাহজাহান ও মমতাজের হাতে লেখা চিঠি, সেই সময়ের অস্ত্র, নির্মাণে ব্যবহৃত নকশা, ছাঁচ ও যন্ত্রাংশ , প্রাচীন মুদ্রা ও ফলক ইত্যাদি।

তাজমহলে কখন যাবেন

তাজমহল শুক্রবার বন্ধ (শুধু নামাজের জন্য খোলা থাকে)। বাকিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা অবধি খোলা থাকে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • সমাধির কোনও স্থানে নিজের নাম, ফোন নাম্বার ইত্যাদি লিখে জায়গাটি কলুষিত করবেন না।
  • বাগানের মধ্যে ঘাসের ওপর চলাফেরা করবেন না, বসবেন না বা শোবেন না। বসবার জন্য বাগানের ধারে গাছের ছায়ায় সুন্দর বেঞ্চি বানানো আছে। সপরিবারে সেখানে বসতে পারেন।
  • গাইড নিতে চাইলে হোটেলে আগে থেকেই কথা বলে নেবেন। না হলে পার্কিং এও অনেক গাইড পাওয়া যায়। তাদের সাথেও দাম নিয়ে কথা বলে নেবেন।
  • পার্কিং থেকে মূল গেট অবধি তাজমহলের জন্য নির্ধারিত টোটো গাড়িতে যাবেন। কোনও রিক্সা করে যাবেন না। রিক্সা কিন্তু মাঝপথে আপনাকে নামিয়ে দেবে এবং বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।
  • ভেতরে গিয়ে টিকিট হারিয়ে গেলে বেরনোর সময় ১০০ টাকা জরিমানা। তাই টিকিট সাবধানে রাখবেন।
  • আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার সময় ভিজিট টাইম ভালো করে দেখবেন। আপনি যে সময়ে যেতে চাইছেন সেই সময়ের টিকিট নিচ্ছেন কিনা দেখে নেবেন।
  • প্রবেশের পর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টা টিকিটের বৈধতা।
  • একটি সরকারী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন।
  • খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন না।

ট্রিপ টিপস

  • এই জায়গায় যেদিন ঘোরার প্ল্যান করছেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে আগেভাগেই সেইদিনের টিকিট কেটে রাখুন। এর ফলে আপনাকে এখানে পৌঁছে ভিড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং আপনার টিকিট হারানোর ভয়ও থাকবে না। লিঙ্ক আমাদের তথ্যসূত্রে পেয়ে যাবেন।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://tajmahal.gov.in/
  3. https://en.wikipedia.org/7-wonders
  4. https://world.new7wonders.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading