ইতিহাস

ভি.ভি.গিরি

বরাহগিরি ভেঙ্কট গিরি ছিলেন ভারতের ৪র্থ রাষ্ট্রপতি। তিনি ভি.ভি. গিরি (V. V. Giri) নামেই বেশি খ্যাত ছিলেন। দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে তিনি রাজ্যপাল হিসেবে উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক ও কেরল রাজ্যের দায়িত্বাধীন ছিলেন৷

১৮৯৪ সালের ১০ আগস্ট বর্তমান উড়িষ্যার বেরহামপুরে ভি.ভি. গিরির জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার ভি. ভি. জোগায়া পান্টুলু ছিলেন একজন আইনজীবী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর মায়ের নাম সুবহরাম্মা। তিনি অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের সময় বেরহামপুরে জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ে ধর্মঘটের নেতৃত্বের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

ভি.ভি. গিরি খাল্লিকোটে কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেরহামপুরের উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন৷ ১৯১৩ সালে তিনি আয়ারল্যান্ড যান এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন৷ ভি.ভি. গিরি ভারতীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম সারির একজন ছিলেন যাঁরা ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন-এ ব্যাচেলর অফ আর্টস কোর্সে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করতে ভর্তি হয়েছিলেন৷ যদিও এখানে তিনি তাঁর বি.এ কোর্সের পড়া শেষ করতে পারেননি৷

ভি.ভি. গিরির কর্মজীবন শুরু হয় ১৯১৬ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্টে। রাজনৈতিকভাবে তিনি কংগ্রেস দলের সদস্য ছিলেন। কংগ্রেসের হয়ে তিনি লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন এবং অ্যানি বেসান্তের হোমরুল আন্দোলনে অংশ গ্রহণও করেছিলেন৷ ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর উজ্জ্বল আইনী কর্মজীবন ত্যাগ করেন । ১৯২২ সালে মাদক দ্রব্য বিক্রির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার জন্য তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়। ভি.ভি.গিরি তাঁর পুরো কর্মজীবন জুড়ে ভারতের শ্রম ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯২৬ সালে তিনি সর্বপ্রথম অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯২৮ সালে বেঙ্গল নাগপুর রেলপথের কর্মীদের অধিকারের জন্য অহিংস ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার রেলওয়ে সংস্থার শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই আন্দোলন ভারতের শ্রম আন্দোলনের একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হয়৷

১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের শ্রমিক প্রতিনিধি ছিলেন তিনি।
১৯৩৩ সালে ভি.ভি.গিরি অল ইন্ডিয়া রেলওয়েম্যান ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে এর সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৪ সালে ভি.ভি.গিরি ইম্পেরিয়াল আইনসভার সদস্য হন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি এখানকার সদস্য ছিলেন এবং বিধানসভায় শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক মুখপাত্র হিসাবেও উপস্থিত থাকতেন৷

১৯৩৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভি.ভি. গিরি বববিলির রাজাকে পরাজিত করে মাদ্রাজ আইনসভার সদস্য হন। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সি রাজগোপালচারীর নেতৃত্বে তিনি কংগ্রেস সরকারে শ্রম ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন৷ ১৯৩৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয় পরিকল্পনা কমিটির গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতকে যুদ্ধরত দেশ হিসেবে যুদ্ধে যুক্ত করার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি পদত্যাগ করেন। শ্রমিক আন্দোলনের সময় তিনি আবার দলে ফিরে আসেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ১৫ মাস তিনি কারাগারে কাটিয়ে ১৯৪১ সালের মার্চে তিনি ছাড়া পান৷

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরু হওয়ার পরে ভি.ভি. গিরিকে আবার ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে। ১৯৪৩ সালে নাগপুরে এআইটিইউসি (AITUC) বৈঠক চলাকালীন সময়ে তিনি কারাগার থেকেই সেখানে উপস্থিত হন। এআইটিইউসির সভাপতি হিসেবেও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভি.ভি. গিরি ভেলোর এবং অমরাবতীর কারাগারে বন্দী ছিলেন । তিন বছর কারাগারে বন্দী থাকার পর ১৯৪৫ সালে তিনি মুক্তি পান৷

১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি মাদ্রাজ বিধানসভায় পুনর্নির্বাচিত হন এবং টি.প্রকাশের অধীনে শ্রম পোর্টফোলিওর দায়িত্বে মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন৷ ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রথম হাই কমিশনার হিসাবে সিলন(শ্রীলঙ্কা)এ তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৫১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি মাদ্রাজ রাজ্যের পাঠপট্টম লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রথম লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পরে ভি.ভি. গিরি ১৯৫২ সালে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন৷ ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ভি.ভি.গিরি উত্তরপ্রদেশ, ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত কেরালা এবং ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি কর্ণাটকের রাজ্যপাল হিসেবে যুক্ত ছিলেন৷

১৯৬৯ সালের ২৪ আগস্ট ভি.ভি.গিরি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ২৪ আগস্ট ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে সাক্ষর করেছিলেন তারমধ্যে একটি হল সিমলা চুক্তি যেটি ছিল ভারত পাকিস্তানের মধ্যে সাক্ষরিত একটি চুক্তি অপরটি ছিল ১৯৬৯ এর ব্যাংক জাতীয়করণ বিল।

ভি.ভি.গিরি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ছিলেন বলে তাঁকে “Prime Minister’s President ” বলে তাঁকে অভিহিত করা হত। ১৯৭৫ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্ন দিয়ে তাঁকে ভূষিত করা হয়।

১৯৮০ সালের ২৪ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভি.ভি.গিরির মৃত্যু হয়৷

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।