ইতিহাস

ইরাবতী কার্ভে

ইরাবতী কার্ভে (Irawati Karve)  একজন প্রখ্যাত ভারতীয় মহিলা নৃতত্ত্ববিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ। তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা নৃতত্ত্ববিদ ছিলেন। তিনি ভারতের সংস্কৃতি, ধর্ম, পরিবার, লোককাহিনী এবং পৌরাণিক কাহিনী, এবং সংস্কৃতি সহ একাধিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং লিখেছেন।

১৯০৫ সালে ১৫ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্রে একটি ধনী পরিবারে ইরাবতী কার্ভের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম গণেশ হরি কর্মকার। তাঁর বাবা বর্মায় ‘বর্মা কটন কোম্পানি’ তে কাজ করতেন। তিনি বর্মার ইরাবতী নদীর নামে তাঁর মেয়ের নাম রাখেন।

ইরাবতীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় সাত বছর বয়সে পুণের হুজুরপাগা গার্লস বোর্ডিং স্কুলে। স্কুল শিক্ষার পাট চুকিয়ে ইরাবতী দর্শন নিয়ে ফার্গুসন কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে পাস করেন। এরপর ‘দক্ষিণা’ নামক একটি বৃত্তি পেয়ে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে ১৯২৮ সালে পাশ করেন তিনি। সেখানে তিনি জি এস ঘুরিয়েকে শিক্ষক হিসেবে পান। পড়াশুনার সাথে সাথেই তিনি চিতপবন ব্রাহ্মণ এবং পরশুরামকে কেন্দ্র করে লোককথার ওপর দুটি থিসিস (thesis) তৈরি করেন।

ইরাবতীর কার্ভের বিবাহ হয় স্কুল শিক্ষক দিনকর ধন্দ কার্ভের সাথে যিনি একটি স্কুলে রসায়নবিদ্যা পড়াতেন। ইরাবতীর বাবা এই বিয়েতে মত দেননি। তিনি চেয়েছিলেন কোন ধনী পরিবারের ছেলের সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিতে। দিনকর ধন্দ কার্ভে সমাজ সংস্কারক মহর্ষি ধন্দ কার্ভের সন্তান ছিলেন। মহর্ষি ধন্দ কার্ভে বোম্বেতে  এস এন ডি টি উইমেন্স ইউনিভার্সিটি (SNDT Women’s University) প্রতিষ্ঠা করেন যেটি ছিল ভারতীয় মহিলাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। দিনকর ধন্দ কার্ভে পরে ফার্গুসন কলেজের অধ্যক্ষ হন। বিয়ের পর ইরাবতী জার্মানিতে পড়াশোনা করতে যান। এর আগে তাঁর স্বামী জার্মানি থেকে রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি করেন। তিনি ইরাবতীকে সেখানে গিয়ে পড়াশোনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর পড়াশোনা করার খরচ জুগিয়েছিলেন তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য জীবরাজ মেহেতা। একজন সমাজ সংস্কারক হলেও ইরাবতীর শ্বশুর মশাই তাঁর জার্মানি যাওয়াকে মেনে নিতে পারেননি। 

ইরাবতী জার্মানির বার্লিন শহরে অবস্থিত কাইসার উইলহেম ইনস্টিটিউট অফ অ্যানথ্রোপলজি (Kaiser Wilhelm Institute of Anthropology) থেকে পড়াশোনা করেন এবং দুই বছর বাদে সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করে ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। জার্মানিতে ইরাবতী ইউজেন ফিসারকে অধ্যাপক হিসেবে পেয়েছিলেন। এরপর তিনি

ইরাবতী তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন প্রশাসক হিসেবে বোম্বের এস এন  ডি টি উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে । তিনি সেখানে ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল অব্দি কাজ করেন। এরপর ১৯৩৯ সালে তিনি পুণেতে চলে যান এবং সেখানকার ডেকান কলেজে সমাজবিজ্ঞানের রিডার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখানেই তিনি তাঁর সম্পূর্ণ কর্ম জীবন অতিবাহিত করেন। নৃতত্ত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যার মধ্যে সেরোলজি (serology), ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, জীবাশ্মবিদ্যা (palaeontology) ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন লোকসংগীতের সংগ্রাহক ছিলেন এবং নারীবাদী কবিতা অনুবাদ করতেন। চিন্তাবিদ হিসেবে সমাজে তাঁর সুনাম ছিল।

১৯৬৩ সালে পুণে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নৃতত্ত্বের বিভাগ স্থাপন করেন। এখানে বহু বছর তিনি সমাজবিজ্ঞান এবং নৃতত্ত্ব  বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৪৭ সালে  দিল্লিতে জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস দ্বারা আয়োজিত নৃতত্ত্ব বিভাগে তিনি সভাপতিত্ব করেছেন। ইরাবতী কিছুদিন এস এন ডি টি উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। ১৯৫১ সালে  লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (School of Oriental and African Studies) বিভাগ থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানেই তিনি তাঁর প্রথম বই ‘কিনশিপ অর্গানিজেশন ইন ইন্ডিয়া’ (Kinship Organization in India)-র পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। আমেরিকার রকফেলার ফাউন্ডেশন (Rokefeller Fooundation) থেকেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তিনি ভারতের কিনশিপ অরগানাইজেশন (Kinship Organization) সম্বন্ধে যে রকম বিস্তারিতভাবে গবেষণা করে গেছেন তা ভবিষ্যতে গবেষকদের সেই বিষয়ে গবেষণা করার জন্য খুব সাহায্য করেছে। তিনি যেভাবে ভাষার নিদর্শনকে এবং ভৌগলিক বিভাগকে নিজের কাজে লাগিয়েছেন তা এককথায় অনবদ্য। এর দ্বারা তাঁর কাজের বিষয়ে একটি নতুন দিক খুলে গেছে। তিনি সমাজে হওয়া অন্যায়, নারীদের প্রতি হওয়া  অত্যাচার এবং জাতিভেদ প্রথার তীব্র প্রতিবাদ করতেন এবং তা দূরীকরণের জন্য সরব হতেন। 

তিনি মারাঠি এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখালেখি করতেন। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘কিনশিপ অর্গানিজেশন ইন ইন্ডিয়া’ (Kinship Organization in India), ‘হিন্দু সোসাইটি- অ্যান ইন্টারপ্রিটেশন’ (Hindu Society- An interpretation), ‘মহারাষ্ট্র’, ‘যুগান্তর’, ‘পরিপূর্তি’, ‘ভোভারা’, ‘গঙ্গাজল’, ‘দ্য নিউ ব্রাহ্মণস’ (The New Brahmans) ইত্যাদি। ১৯৬৮ সালে তিনি ‘যুগান্ত’ বইটি মহাভারত অবলম্বন করে লেখেন। তিনি ‘যুগান্ত’ বইটির জন্য সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পান। তিনিই প্রথম লেখিকা যিনি মারাঠি ভাষায় লেখার জন্য সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পান।

ইরাবতী এবং  দিনকরের  তিন সন্তান। তাঁদের ছেলে আনন্দ কার্ভে পুণে শহরে ‘আরতী’ নামক একটি এনজিও (NGO) চালান, তাঁদের বড় মেয়ে জয় নিম্বকার একজন উপন্যাসিক এবং তাঁদের ছোট মেয়ে গৌরী দেশপান্ডেও একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক।

একজন নৃতত্ত্ববিদকে কাজের সূত্রে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। ইরাবতীর সময়ে দাঁড়িয়ে একজন নারীর পক্ষে সেই কাজ করা প্রায় অভাবনীয় ব্যাপার ছিল। কিন্তু ইরাবতী সব বাধা অতিক্রম করে সেই কাজ করে গেছেন। তিনি একজন প্রগতিশীল নারী ছিলেন। বিয়ের পর হিন্দু ধর্ম  অনুযায়ী একজন বিবাহিত মহিলাকে যা যা ধারণ করতে হয় তিনি সে সবই ধারণ করতে অস্বীকার করেন। এছাড়াও তিনি পঞ্চাশের দশকে পুণে শহরে  স্কুটার চালিয়ে ঘোরাফেরা করতেন যা কিনা তখনকার দিনে একজন মেয়ের পক্ষে ভাবনার অতীত ছিল। বলা হয় নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে যেসব অসামান্য কাজ তিনি করে গেছেন তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি এবং তাঁর খ্যাতি  সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। লুইস ডুমন্ট বা জি এস ঘুরিয়ে যে খ্যাতি পান, তিনি তা পাননি। এছাড়াও তাঁর কোনো ছাত্র ছাত্রীই তাঁর উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে তার সবই অনামী প্রকাশকের দ্বারা প্রকাশিত। সেই কারণেই তাঁর বই অনেকাংশেই অপঠিত থেকে গেছে।

ইরাবতী কার্ভের ১৯৭০ সালের ১১ আগস্ট মৃত্যু হয়।

 ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ্যায় ইরাবতী কার্ভের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে আগামী প্রজন্ম একজন দিকপাল নৃতত্ত্ববিদ এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে মনে রাখবে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন