ইতিহাস

আনন্দ বাগচী

আনন্দ বাগচী

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন বহু সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে যাঁদের সৃষ্টি সমসময়ের সারস্বত সমাজে প্রভূত প্রশংসা কুড়োলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। এমনই একজন উচ্চমানের সাহিত্যিক তথা কবি আনন্দ বাগচী (Ananda Bagchi)। মূলত সাহিত্যপাঠকের কাছে তিনি ঔপন্যাসিক, কিশোর সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, গল্পকার হিসেবে পরিচিত হলেও অনেকেই তাঁর কবিজীবনের কথা জানেন না। পঞ্চাশের দশকের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে আনন্দ বাগচী প্রভূত জনপ্রিয় ছিলেন। চারপাশের প্রকৃতিকে তিনি নিরীক্ষণ করেছিলেন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এবং কবিতায় তার যথাযথ রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীরও সদস্য ছিলেন তিনি। সাগরময় ঘোষের অনুরোধে ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যুক্ত হন আনন্দ বাগচী। বিখ্যাত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সম্পাদকদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘পারাবত’, ‘বৃশ্চিক’-এর মতো পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনায় তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষায় লেখা সম্ভবত প্রথম কাব্যোপন্যাসটি আনন্দ বাগচীরই লেখা। হাংরি জেনারেশনের কবিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁদের হয়ে সওয়াল করেছিলেন তিনি। বাংলা তথা ভারতবর্ষের সাহিত্যের আঙিনায় এক যুগান্তকারী ঘটনা যে ‘কবিতা-ঘন্টিকী’ পত্রিকার প্রকাশ, তার সম্পাদকমণ্ডলীতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল আনন্দ বাগচীর। তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হল ‘চকখড়ি’, ‘স্বকালপুরুষ’, ‘পরমায়ু’ ইত্যাদি।

১৯৩২ সালের ১৫ মে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের স্বাগতা গ্রামে আনন্দ বাগচীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শ্রীচন্দ্র বাগচী এবং মায়ের নাম সজলবালা দেবী। মোট পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আনন্দ ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পরে ১৯৬১ সাল নাগাদ সঙ্গীতশিল্পী মানসী পালের সঙ্গে বিবাহ হয় আনন্দের। যদিও এক বছরের মধ্যেই তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে যায়। ফলে বিচ্ছেদজাত এক শূন্যতা তো ছিলই, সেই সঙ্গে জীবিকার তাগিদও তাড়না করছিল তাঁকে। সেই সময় তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার অজ্ঞাতবাস এবং নির্বাসনের পালা শুরু হতে যাচ্ছে এই সময়।…লেখালেখি, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা—সামাজিক সব বন্ধনগুলোই আলগা হতে হতে শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে গেছে।’ বাস্তবিকই এ এক অন্ধকার,হতাশাময় সময় ছিল আনন্দ বাগচীর জীবনে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

বিদ্যালয় স্তরের পড়াশোনা শেষ করবার পর আরও উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য আনন্দ বাগচী কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগবশত বিষয় হিসেবে বাংলা সাহিত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। এই কলেজের অধ্যায়টি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। তখন থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর। কবিতা দিয়েই যে মূলত তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়েছিল এবং তৎকালীন কবিমহলে যে আনন্দ বাগচীর বিশেষ পরিচিতি ছিল, আজকালকার হাতে-গোনা কিছু পাঠকই তার খোঁজ রাখেন বলে মনে হয়। স্কটিশ চার্চ কলেজে আনন্দ বাগচীর পাশেই বসতেন তাঁরই সহপাঠী বিখ্যাত কবি দীপক মজুমদার। দু’বছর জেল খাটার ফলে দীপক মজুমদার তখন স্কটিশের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছেন। দীপকের তখন বাংলার বিভিন্ন স্বনামধন্য জ্ঞানী-গুণী কবিদের মহলে যাতায়াত ছিল, অনেকের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও। দীপক মজুমদারের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক আনন্দ বাগচী পরিচয় করে বন্ধুত্ব স্থাপন করে নিয়েছিলেন। এরপর সফলভাবে কলেজের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করবার পর আরও উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে যান তিনি এবং ঐতিহ্যশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। সেখান থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হন আনন্দ।

আনন্দকে তাঁর কলেজের কবি-বন্ধু দীপক মজুমদার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম তখন অত জনপ্রিয় নয়। মূলত এই তিনজন একত্রেই বিখ্যাত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার জন্ম দিয়েছিলেন ১৯৫৩ সালের বর্ষায়। ‘কৃত্তিবাস’ প্রতিষ্ঠা এবং প্রকাশের আগে থেকেই যে আনন্দ বাগচী কবিতা লিখে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি বয়ান থেকেই প্রমাণিত হয়। কৃত্তিবাস বেরোলে পরে আনন্দ বাগচী লিখেছিলেন, ‘কবি হিসেবে আমারও একাকীত্বের দিন শেষ হল’। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সূত্রেই প্রচুর আড্ডার অবকাশ পেয়েছিলেন তিনি নানা কবি, লেখকের সঙ্গে। সেসময়তেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ প্রখ্যাত কবিদের সঙ্গে৷ ‘কৃত্তিবাস’ প্রকাশনা থেকেই আনন্দ বাগচীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘স্বগতসন্ধ্যা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বিখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক এবং ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুকে। প্রথম তিনটি সংখ্যার পর দীপক মজুমদারের সঙ্গে কৃত্তিবাসের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল, তেমনি আনন্দ বাগচীর সঙ্গেও এই সম্পর্ক খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ধীরে ধীরে কৃত্তিবাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যত শিথিল হয়, সেখানে কবিতার সংখ্যাও কমে যায় ততোধিক।

বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক কবিতার সংকলন’-এ জায়গা না পেলেও সেই সংকলনের প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বী বিষ্ণু দে-র ‘একালের কবিতা’ (১৯৬৩) সংকলনটিতে আনন্দ বাগচীর ‘সহজিয়া’ শিরোনামের কবিতাটির দেখা মেলে। যদিও ততদিনে, ১৯৫৯ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তেপান্তরে’ প্রকাশিত হয়েছিল এবং ‘সহজিয়া’ কবিতাটি সেই কাব্যগ্রন্থেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল আনন্দ বাগচীর দুটি কবিতা আবু সয়ীদ আইয়ুব মহাশয় সম্পাদিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছিল। সেই কবিতাদুটির নাম ‘জলসিঁড়ি’ ও ‘কাকতালীয়’। আবু সয়ীদ আইয়ুব যে তাঁর কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাও উল্লেখ করতে কার্পণ্য করেননি তিনি। উপরোক্ত দুটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘উজ্জ্বল ছুরির নীচে’ এবং ১৯৮২ সালে ‘বিস্মরণ’ নামে আরেকটি কবিতার বই বেরোয়। এই শেষ গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে কবি হিসেবে আনন্দ বাগচীর নাম তখন অনেকটাই ম্লান, প্রায় বিস্মৃতির পথেই বলা চলে। আদ্যোপান্ত কলকাতা শহরের একজন কবি হয়ে উঠেছিলেন আনন্দ বাগচী। নাগরিক জীবনের ক্লেদ, দীর্ণতা, বিবর্ণতা তাঁকে আলোড়িত করেছিল বারবার। আবার এই বেরঙিন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন কলকাতার পাশাপাশি অফিসযাত্রীর ভিড়, সিগারেট ধরানোর জন্য নির্দিষ্ট ঝুলন্ত দড়ির আগুন যে কলকাতার অংশ, তাকেও তুলে ধরেন তিনি সমান দক্ষতায়। ধানের গন্ধ, পালকির প্রসঙ্গ, কৃষকের গায়ের ঘ্রাণ যতই তাঁর কবিতায় উঠে না আসুক, আনন্দ বাগচী ছিলেন আগাগোড়া একজন নাগরিক কবি। জীবন-মৃত্যুর রঙগুলিকে তিনি অনায়াসে তাঁর কবিতার ক্যানভাসে বিন্যস্ত করে দিতে পারতেন। এসময় কবিতার পাশাপাশি গদ্য রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন আনন্দ বাগচী এবং সাহিত্যের সেই শাখাতেও তিনি আশাহত করেননি তাঁর পাঠককে। ‘অমৃতধারা’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘চকখড়ি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। পরে সেই উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ১৯৬৪ সালে।

১৯৬২ সালে কলকাতা থেকে একশো চুয়াল্লিশ মাইল দূরে বাঁকুড়াতে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। সেখানে ক্রিশ্চান কলেজে প্রায় সতেরো বছর অধ্যাপনার কাজ করেছিলেন তিনি। বাঁকুড়ার অধ্যায় যেন তাঁর জীবনের ছন্দপতন ঘটিয়ে দিয়েছিল হঠাৎ। সদ্য বিবাহবিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খেত সেই বান্ধবহীন নির্জন রুক্ষ জগতে। এই একাকীত্ব ছাপ ফেলেছিল তাঁর কবিতাতেও। কলকাতা শহর, সেখানকার পরিজন থেকে দূরে থাকতে মন চাইত না। যখন তখন ছুটে যেত মন কলকাতায়। তা তিনি গেছেনও অবশ্য, যোগ দিয়েছেন সাহিত্যের কাজকর্মে। যেমন ১৯৬৬ সালের ৭ মে। দিনটা বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের আঙিনায় এক উল্লেখযোগ্য দিন কারণ ঐদিনই ‘কবিতা-ঘন্টিকী’ প্রকাশিত হয়। এটি মূলত সুশীল রায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি সাহিত্যিক উদ্যোগ—প্রতি ঘন্টায় একটি করে কবিতাপত্র প্রকাশ যার উদ্দেশ্য। সেই ‘কবিতা-ঘন্টিকী’র সম্পাদকমণ্ডলীতে সুশীল রায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়দের সঙ্গে ছিলেন আনন্দ বাগচীও। ষাটের দশকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাংরি জেনারেশনের কবিরা যখন প্রচলিত পবিত্রতার ধারণা ভেঙে জীবন থেকে তুলে এনে গড়ে তুলছেন নয়া ভাষ্য, তখন অনেকেই অশ্লীল বলে তাঁদের দেগে দিয়েছিল, এমনকি হাংরির কবিদের রচনাকে কেন্দ্র করে মামলাও হয়েছিল আদালতে। সেসময় শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়দের মতো সাহিত্যিকেরা হাংরির কবিদের বিচারে সাক্ষী হতে অস্বীকার করলে আনন্দ বাগচী সেই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন এবং আদালতের মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য স্বেচ্ছায় সাক্ষী হয়েছিলেন যদিও বাঁকুড়া কলেজ তাঁকে সেসময় একাজের অনুমতি দেয়নি। পরবর্তীকালে আনন্দ বাগচী যখন ‘প্রথম সাড়া জাগানো কবিতা’ সম্পাদনা করেন তখন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিন ছুতার’ কবিতাটি তার অন্তর্ভুক্ত করেন। এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে মামলা তো হয়ই, এমনকি কবিকে গ্রেফতার করাও হয়েছিল।

সুদূর বাঁকুড়ার নির্বান্ধব পরিবেশে বসেও আনন্দ বাগচী সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হতে দেননি কখনও। সেই পরিবেশে বসেও ১৯৬৩ সালে তিনি রচনা করেছিলেন ‘স্বকালপুরুষ’ নামে একটি কাব্যোপন্যাস। বাংলাভাষায় লেখা প্রথম কাব্যোপন্যাস সম্ভবত এটিই। আজকের জীবনের বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা, ভণ্ডামির কথা লেখেন তিনি এই রচনায়। ছেড়ে আসা কলকাতার স্মৃতি ঘুরে ফিরে আসে এই লেখায়। তাঁর রচনা যে কতখানি চিত্ররূপময়, তা এই ‘স্বকালপুরুষ’ পাঠ করলে বুঝতে পারা যায়। এই লেখাটি সুশীল রায়ের ‘ধ্রুপদী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও বাঁকুড়ার অবনী নাগের সঙ্গে আনন্দ বাগচীর সম্পর্ক বেশ ভাল ছিল। এই অবনী নাগকে নিয়েই শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘অবনী বাড়ি আছো?’ রচনা করেছিলেন বলে শোনা যায়। এই অবনীর সঙ্গেই মিলিত হয়ে ‘পারাবত’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই তাঁর লেখা ‘আক্ষেপানুরাগ’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকা সম্পাদনাকালেই ‘শ্রীহর্ষ’ ছদ্মনামে লিখেছিলেন ‘রূপান্তর’ নামের একটি নাটক। এছাড়াও অবনী নাগ ও বিবেকজ্যোতির সঙ্গে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন একটি অন্য ধরনের ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা ‘বৃশ্চিক’। নামকরণ থেকেই বোঝা যায় কোনও অন্যায় বা অনৈতিকতার বিরুদ্ধে বৃশ্চিকের দংশনের মতো জ্বালাময় ব্যঙ্গ উপস্থাপনাই এর উদ্দেশ্য। ‘ত্রিলোচন কলমচী’ ছদ্মনামেও বহু উল্লেখযোগ্য নিবন্ধ রচনা করেছিলেন তিনি।

কিন্তু এত কিছুর ভিড়ে তাঁর ভিতরকার কবিসত্ত্বার স্ফুলিঙ্গ যেন ম্লান হয়ে আসছিল। কবিজীবন পুনরায় ফিরে পেতে কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেন অনুভব করেছিলেন তিনি। সেই কারণে যখন সাগরময় ঘোষের আহ্বান পেলেন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজের জন্য, তখন একছুটে তিনি কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। যদিও কাব্যলক্ষ্মী আর খুব একটা প্রসন্ন হননি তাঁর ওপর।

সেসময় কিছু গদ্য রচনা করেই তার সাহিত্যিক জীবন কাটছিল। অধিকাংশ সময়েই লিখতে হত ফরমায়েশি লেখা। বাঁকুড়াকে কখনই ভোলেননি তিনি। ‘প্রথম প্রেম’ উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাঁকুড়াকেই। কিশোরদের জন্যও লেখালেখি করেছেন আনন্দ বাগচী। গোয়েন্দা কাহিনী বা রহস্য রেমাঞ্চ রচনার জন্য এখনও পাঠক মহলে সমাদৃত হন তিনি। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তাঁর জনপ্রিয় কয়েকটি গ্রন্থ হল ‘ভূত-রহস্য’, ‘মৃত্যুর টিকিট’, ‘অদৃশ্য মৃত্যুর ছক’, ‘অদৃশ্য চোখ’ ইত্যাদি। এছাড়াও তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি সৃষ্টি হল ‘ফেরা না ফেরা’, ‘চাঁদ ডুবে গেল’, ‘পরমায়ু’ ‘রাজযোটক’, ‘সাহিত্য প্রসঙ্গে’ ইত্যাদি।

শেষ জীবনে আনন্দ বাগচী থাকতেন হালিশহরে। স্মৃতিশক্তি তাঁর নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, হয়ে পড়েছিলেন চলচ্ছক্তিহীন। প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে দিনযাপন করতে হয়েছিল তাঁকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল মাসিক আড়াই হাজার টাকা সরকারি ভাতা দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে।

অবশেষে ২০১২ সালের ৯ জুন সাহিত্যিক আনন্দ বাগচীর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. রাখাল বিশ্বাস, পঞ্চানন মালাকার (সম্পা:), অধুনা পত্রিকা, ১০ম বর্ষ, শারদীয় সংখ্যা, ১৩৯০, পৃষ্ঠা ৪১-৪৮
  2. https://hungryalist.wordpress.com/
  3. https://www-anandabazar-com.cdn.ampproject.org/ https://www.kaliokalam.com/
  4. https://pagefournews.com/
  5. http://baak-patrika.blogspot.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন