ইতিহাস

বিষ্ণু দে

বিষ্ণু দে (Bishnu Dey) ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি কবি, লেখক এবং চলচ্চিত্র সমালোচক। ১৯২৩ সালে কল্লোল পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে যে সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কবি বিষ্ণু দে তার একজন দিশারী। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে। তাঁর কবিতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও তাঁদের সংগ্রামের ইতিহাস ও রাজনীতির গল্প ফুটে উঠেছে। এছাড়াও ফুটে উঠেছে সমকালীন জীবনের, দেশ ও কালের, রাজনীতি ও সমাজের স্পষ্ট ছবি। 

১৯০৯ সালের ১৮ জুলাই কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিষ্ণু দে’র জন্ম হয়। তাঁর বাবা অবিনাশ চন্দ্র দাস ছিলেন একজন আইনজীবী।  বিষ্ণু দে’র প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের স্কুলেই। তারপর তিনি কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউট এবং সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯২৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি বঙ্গবাসী কলেজে আইএ পড়তে যান। এরপর সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজ থেকে তিনি ১৯৩২ সালে তিনি ইংরেজি বিষয়ে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি ।        

বিষ্ণু দে’র কর্মজীবন শুরু হয় একজন শিক্ষক হিসাবে। ১৯৩৫ সালে তিনি রিপন কলেজে (যার বর্তমান নাম সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) শিক্ষকতা করার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি কলেজে এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত মৌলানা আজাদ কলেজে পড়ান। কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজেও অধ্যাপনার কাজ করেছেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইংরাজীতে এম.এ.র ছাত্রী প্রণতি রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাঁরা বিয়ে করেন।

তিরিশের দশকের যেসমস্ত কবিসাহিত্যিক ও লেখকরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবের বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের নিজের সাহিত্যকে সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন বিষ্ণু দে তাঁদের মধ্যে একজন। ১৯২৩ সালে কল্লোল পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে যে সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কবি বিষ্ণু দে তার একজন দিশারী। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রাখবে সবসময়। ১৯৩০ সালে কল্লোল পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হলে তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয় পত্রিকায়’ যোগদান করেন এবং সেখানে একজন সম্পাদক হিসাবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে চঞ্চল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় তিনি সাহিত্য পত্র প্রকাশ করেন। বিষ্ণু দে ‘নিরুক্তা’ নামের একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁর কবিতার মূল বিষয় হল মানুষ, তার সংগ্রাম ও রাজনীতি, সেখানে সমকালীন জীবনের, দেশ ও কালের, রাজনীতি ও সমাজের প্রতিধ্বনি। তাঁর প্রথমদিককার কাব্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুই সংস্কৃতিরই প্রভাব পড়েছে। দেশীয় পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, শিল্পসাহিত্য থেকে ইউরোপীয় ক্লাসিক ও আধুনিক শিল্প সাহিত্যের প্রভাব এবং পরে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, তেভাগা-আন্দোলন ইত্যাদি থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরের ঘটনাবহুল জীবন ও আন্দোলন তাঁর কবিতায় সরাসরি ছায়া ফেলেছে। বিষ্ণু দে বামপন্থী দর্শন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া কবি টি.এস এলিয়টের রচনাশৈলী এবং ভাবনা দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত হয়ছিলেন তিনি। তিনি ‘ছড়ানো এই জীবন’ নামে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন। শিল্পী যামিনী রায় ও শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ শাহেদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৪০ সালে তৈরি হওয়া ক্যালকাটা গ্রুপ অব্ আর্টিষ্ট দলের তিনি ছিলেন ‘ফ্রেন্ড ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড’। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ সাহিত্যের তুলনায় কোনো অংশে কম ছিলনা। নিজেকে সাহিত্যের জগতে আরও সৃষ্টিশীল করে তুলে ধরতে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত একটি চিত্রকলা প্রদর্শনীতে কলকাতার মানুষ প্রথম তাঁর আঁকা ছবি দেখার সুযোগ পান। ত্রিকুট পাহাড় ছিল তাঁর কাছে দ্বিতীয় ঘর। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হন ও তা নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন। এছাড়াও তাঁর লোকশিল্পের সংগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। দুর্গা মূর্তি, লক্ষ্মীর সরা প্লেট, অসংখ্য পোড়া মাটির হাতি, পুতুল এবং কাঠে খোদাই করা জগন্নাথ বলরাম সব ছিল তাঁর সংগ্রহশালায়।

অঙ্কন শিল্পের উপর কিছু বইও রচনা করেন তিনি, যেমন ‘আর্ট অফ যামিনী রায়,১৯৮৮'(Art of Jamini Roy,1988) ‘দ্য পেন্টিংস অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর,১৯৫৮'(The Paintings of Rabindranath Tagore, 1958) এবং ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড মডার্ন আর্ট,১৯৫৯'(India and Modern Art,1959) । তিনি ক্যালকাটা গ্রুপ সেন্টার, সোভিয়েত ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন, প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘ, ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েসন, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রভৃতি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রচিত বই গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘ছড়ানো এই জীবন’, ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ (১৯৩২), ‘চোরাবালি’ (১৯৩৮), ‘পূর্বলেখ’ (১৯৪০), ‘রুচি ও প্রগতি’ (১৯৪৬), ‘সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ (১৯৫২), ‘সন্দীপের চর'(১৯৪৭), ‘অন্বীষ্টা’ (১৯৫০), ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’ (১৯৫০), ‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ’ (১৯৫৮), ‘রবীন্দ্রনাথ ও শিল্প সাহিত্য আধুনিকতার সমস্যা’ (১৯৬৬), ‘মাইকেল রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা'(১৯৬৭), ‘ইন দ্য সান অ্যান্ড দ্য রেন’ (১৯৭২), ‘উত্তরে থাকে মৌন,’ (১৯৭৭), ‘সেকাল থেকে একাল’ (১৯৮০), ‘আমার হৃদয়ে বাঁচো’ (১৯৮১), স্মৃতি সত্ত্বা ভবিষ্যৎ (১৯৭১)। সাহিত্যে এই অবদানের জন্য বিষ্ণু দে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার(১৯৬৬), নেহরু স্মৃতি পুরস্কার(১৯৬৭), এবং ১৯৭১ সালে তাঁর ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ বইটির জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জ্ঞানপীঠ পান।   

১৯৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর বিষ্ণু দে’র মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।