ইতিহাস

সৈয়দ মুজতবা আলী

সৈয়দ মুজতবা আলী (Syed Mujtaba Ali) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক, সাংবাদিক,  ভূপর্যটক, শিক্ষাবিদ এবং ভাষাবিদ।

১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত বাংলায় সিলেটের করিমগঞ্জ শহরে সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী এবং মায়ের নাম আমতুল মান্নান খাতুন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাব রেজিস্ট্রার এবং সৈয়দ বংশের সাথে তাঁর রক্তের যোগ ছিল। তাঁর মায়ের সাথে পাল বংশের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তিন ভাইয়ের মধ্যে মুজতবা আলী সবচেয়ে ছোট ছিলেন।

সৈয়দ মুজতবা তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুল থেকে পাশ করেন। এরপর তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা নির্মিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়তে চলে যান এবং সেখান থেকেই ১৯২৬ সালে স্নাতক হন। তখন বিশ্বভারতী সদ্য তৈরি হয়েছে, মুজতবা আলী এখাঁনকার প্রথম কজন ছাত্রের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি ক্রমশই রবীন্দ্রনাথের স্নেহের পাত্র হয়ে ওঠেন। সেই স্মৃতি  মুজতবা আলী  সারা জীবন বয়ে বেরিয়েছিলেন এবং পরে তাঁর লেখাতেও সেই কথা তিনি বলেছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। ছাত্র জীবনেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

কিছুদিনের জন্য সৈয়দ মুজতবা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন। পরে ১৯২৭ সালে তিনি এখানে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। তবে দু’বছরে বেশি এখানে কাজ করেননি। ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে উইলিয়াম হামবোল্ডট  স্কলারশিপ নিয়ে (William Humboldt Scholarship) তিনি জার্মানি যান। সেখানে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারপর বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন এবং এখান থেকেই তিনি ডক্টরেট উপাধি পান। এখান থেকে ১৯৩২ সালে তিনি তুলনামূলক ধর্মীয় বিদ্যায় ডিস্টিংশন পেয়ে অবতীর্ণ হন। এরপর ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল অব্দি তিনি কায়রোতে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক দর্শনের অধ্যাপনা করেন।

১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বরোদার একটি কলেজে সৈয়দ মুজতবা শিক্ষকতার কাজ করেন। কিছুদিন তিনি পূর্বপাকিস্তানে ছিলেন তারপর  ১৯৪৯ ভারতে চলে আসেন। কিছুদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর ১৯৫০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্সে (Indian Council for Cultural Relations) সেক্রেটারির পদে যোগ দেন এবং এর আরবি ভাষায় প্রকাশিত জার্নাল থাকাফাতুল হিন্দের  (Thaqafatul Hind) সম্পাদনার কাজও শুরু করেন। এরপর ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল অবধি তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর (All India Radio)  নতুন দিল্লির, কটকের এবং পাটনার শাখায় কাজ করেন। 

শিক্ষকতার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি এরপর কলকাতা চলে আসেন এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখালেখির কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর লেখার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দেশে-বিদেশে’ তখন দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। এই বইটি মাধ্যমেই তাঁর নাম বাঙালি পাঠক মহলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি পাকাপাকি জায়গা করে নেন। তাঁর প্রতি লেখাতেই একইসঙ্গে পাণ্ডিত্য এবং রসবোধ প্রকাশ পেত। তাঁর জনপ্রিয় কিছু লেখার মধ্যে অন্যতম হল চাচা কাহিনী, দেশে বিদেশে, ময়ূরকণ্ঠী, পঞ্চতন্ত্র, ধূপছায়া, টুনি মেম, রাজা উজির, কত না অশ্রুজল, হিটলার, শবনম, দু হারা, শহর ইয়ার, পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়, বাংলাদেশ, উভয় বাংলা, সত্যপীরের কলমে, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ইত্যাদি।

মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে কথা দিয়েছিলেন যে যখনই বিশ্বভারতীর তাঁর প্রয়োজন পড়বে তিনি আসবেন। এই কথা রাখতেই ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল অবধি তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান ভাষা এবং ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতির (Islamic History and Culture) অধ্যাপনার কাজ করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে কিছু সমস্যার কারণে তিনি অধ্যাপনার কাজ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৫১ সালে রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে মুজতবা আলীর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই সন্তানের নাম সৈয়দ মুশাররফ আলী ও সৈয়দ জগলূল আলী।

মুজতবা আলীর মাতৃভাষা বাংলা ছিল, কিন্তু তিনি সব মিলিয়ে চোদ্দটি ভাষা জানতেন। যেমন ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, আরবি ,পার্সী, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, মারাঠি, গুজরাটি, গ্রিক এবং পাশতু। মুজতবা আলী মানুষ হিসেবে অত্যন্ত রসিক ছিলেন। ছাত্রজীবনে তাঁর দাদা মুর্তাজা আলীর সাথে ‘কুইনিন’ নামের হাতে লেখা পত্রিকাও বের করেছিলেন তিনি। এই পত্রিকার আদর্শ ছিল অপ্রিয় সত্য ভাষণ। কিন্তু দুই ভাই মিলে পত্রিকাটি বেশিদিন চালাতে পারেননি। এই দৃঢ়চেতা মনোভাবের জন্য তাঁকে বহুবার বিপদেও পড়তে হয়েছে।

ভাষা আন্দোলন হওয়ার অনেক আগেই সদ্য পূর্ব পাকিস্তান গড়ে ওঠার পরে মুজতবা আলী বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং এও বলেছিলেন যদি কখনো উর্দু রাষ্ট্রভাষা করার কথা ভাবা হয় তখন বাঙালিরা  বিদ্রোহ করবেই এবং যার জোরে পাকিস্তান ভেঙে যাবে। তাঁর সেই ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। যদিও সেই সময় তাঁকে এই দাবি তোলার জন্য  অনেকের  বিরাগভাজন হতে হয়েছিল,  এমনকি  এ বিষয়ে তাঁর লেখা  একটি প্রবন্ধও ছাপতে দেওয়া হয়নি। ১৯৪৯ সালে তাঁকে নরসিংহ দাস পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয় এবং ১৯৬১ সালে তাঁকে আনন্দ পুরস্কার দেওয়া হয়। 

মুজতবা আলীর শেষ জীবন কেটেছিল খুব কষ্টের মধ্যে দিয়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে যান। সৈয়দ মুজতবা আলীর ১৯৭৪ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যু হয়।

সৈয়দ মুজতবা আলীকে চিরকাল বাঙালি পাঠক সমাজ একজন পন্ডিত এবং রসজ্ঞ হিসেবে মনে রাখবে। সাহিত্যে জগতে তাঁর অবদান সম্পর্কে এখনো মানুষ সমান শ্রদ্ধাশীল।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।