ভারতে বিশেষত উত্তর ভারতের বৈষ্ণো দেবী মন্দির (Vaishno Devi Temple) হিন্দু ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্র। এই মন্দির শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মন্দির বা বৈষ্ণো দেবী ভবন নামেও পরিচিত। মন্দিরটি ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের রিয়াসি জেলার কাটরার ত্রিকুট পর্বতের উপরে অবস্থিত। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই মন্দিরটি একটি প্রাচীন গুহা মন্দির। পুরাণ ও লোককথায় এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া গেলেও বহুকাল এই মন্দিরটি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। তবে সাম্প্রতিককালে এই মন্দিরটি জম্মু-কাশ্মীরের জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। অনেকে বৈষ্ণো দেবীকে দেবী দুর্গার স্বরূপ আবার অনেকে তাঁকে বিষ্ণুর সাধিকা বলে মনে করলেও ভক্তদের কাছে তিনি ‘মুহ মাঙ্গি মুরাদ পুরি করনে ওয়ালি মাতা’ কারণ তিনি ভক্তদের যেকোন কামনা পূরণ করতে পারেন।
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেবীর প্রতি অচল বিশ্বাস ও ভক্তির কারণে প্রতিবছর প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বৈষ্ণো দেবী মন্দিরে যাত্রা করেন, এই পবিত্র তীর্থযাত্রা শুরু হয় মাতার ডাক দিয়ে। অনেক তীর্থযাত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে মাতা বৈষ্ণো দেবী তাঁর সন্তানদের নিজের কাছে ডেকে পাঠান, তাঁর অনুমতি ছাড়া কোন মানুষই এই মন্দিরে যেতে পারে না।
বৈষ্ণো দেবী মন্দির সম্পর্কে নানা পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমন- হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী মনে করা হয় যে ত্রেতা যুগে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে রত্নাকর সাগর ও তাঁর স্ত্রী বসবাস করতেন। নিঃসন্তান এই দম্পতি অনেক উপাসনার পর ত্রিকুটা বা বৈষ্ণবী নামে এক কন্যাসন্তান লাভ করে। ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত ওই কন্যা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বহু সাত্ত্বিক গুণের অধিকারী। মাত্র ৯ বছর বয়সে মৃত্যু হবে জেনে সে আরাধ্য দেবতা ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্য ঘোর তপস্যা করতে শুরু করে। কথিত আছে, সীতা উদ্ধারের সময় শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কায় যাওয়ার সময় সাগর পাড়ে ধ্যানমগ্ন জ্যোতির্ময়ী ওই বালিকা ত্রিকুটাকে দেখতে পান। রামচন্দ্র বালিকার ধ্যানের কারণ জানতে পেরে তাঁকে বিষ্ণুরূপে দর্শন দেন। এরপর বিষ্ণু ত্রিকুটার কাছে তাঁর ইচ্ছে জানতে চাইলে ত্রিকুটা বিষ্ণুকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে চান। ভগবান বিষ্ণু খুশি মনে ত্রিকুটাকে এই বর প্রদান করলেও তিনি জানান যে রাম অবতারে বিষ্ণু এক পত্নীব্রত ধর্ম পালন করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছেন, তাই তিনি এই জন্মে ত্রিকুটাকে বিয়ে করতে পারবে না, তবে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে কলিযুগের শেষে কল্কি অবতারে বিষ্ণু তাঁকে অবশ্যই বিয়ে করবেন। ততদিন পর্যন্ত ভগবান বিষ্ণু ত্রিকুটাকে নির্জনে থেকে জগতের সকল জীবের কল্যাণ সাধন করার পরামর্শ দেন। সেই থেকে ত্রিকুটা বিষ্ণুর প্রেমিকা, বিষ্ণুর সাধিকা রূপে উত্তরের পর্বতমালার ত্রিকুট পর্বতে নির্জন গুহায় বসবাস শুরু করেন।
এছাড়া মহাভারতেও বৈষ্ণো দেবীর পূজার উল্লেখ রয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে দেবী দুর্গার উপাসনা করার পরামর্শ দেন। সেই অনুযায়ী অর্জুন দেবী দুর্গার আরাধনা করলে তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দুর্গা বৈষ্ণো দেবী রূপে তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করেন। এই সময় অর্জুন দেবীকে ‘জাম্বুকাটক চাইত্যাইষু নিত্যম সন্নিহিতালয়ে’ বলে সম্বোধন করেন, যার অর্থ ‘যিনি সর্বদা জম্বুর পাহাড়ের ঢালে মন্দিরে বাস করেন’। আর জনশ্রুতি আছে যে, পাণ্ডবরাই প্রথম দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বৈষ্ণো দেবী মন্দিরে কোল কান্দোলি এবং ভবন নির্মাণ করেছিলেন।
আবার কিছু শাক্ত ঐতিহ্য অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের পর সতীর মাথার খুলি এই ত্রিকূট অঞ্চলে পড়েছিল, আর সেই থেকেই এই স্থানটিকে ৫১ সতীপীঠের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে, এই বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে এবং সতীপীঠের প্রামাণ্য তালিকায় এই মন্দির অন্তর্ভূক্ত নয়।
এছাড়া বৈষ্ণোদেবী মন্দির নিয়ে পন্ডিত শ্রীধর (Pandit Shridhar) সম্পর্কিত একটি কাহিনীও প্রচলিত আছে। জনশ্রুতি আছে যে, তিনি বৈষ্ণো দেবীর সাথে একদিন এক ভান্ডারের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ভৈরননাথ বা ভৈরবনাথ নামক এক অসুর বা উপদেবতা বা কাপালিক বৈষ্ণো দেবীর উপর আক্রমণ করে। তখন দেবী বাঁচার জন্য ওই ভান্ডার ত্যাগ করে ত্রিকুট পাহাড়ে পালিয়ে যান। এরপর ওই পাহাড়ের একটি গুহায় ভৈরননাথের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়, শেষ পর্যন্ত ভৈরননাথ নিজের ভুল বুঝতে পেরে বৈষ্ণো দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে মাতা বৈষ্ণো দেবী তাকে ক্ষমা করে দেন এবং আশীর্বাদ করেন যে এই গুহায় আসা প্রতিটি ভক্তকে ভৈরনের দর্শনের জন্য যেতে হবে, তবেই তার বৈষ্ণোদেবী মন্দির যাত্রা সম্পূর্ণ হবে। আর এরপর দেবী তার শিরশ্ছেদ করে তাকে মুক্তি দেন। দেবী এত জোরে ভৈরনের মাথায় আঘাত করেন যে মাথাটি প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পড়ে। শির যেখানে গিয়ে পড়ে, সেটি পরবর্তীকালে ভৈরন ঘাটি নামে পরিচিত হয়।
অন্যদিকে বৈষ্ণো দেবীকে না দেখতে পেয়ে পণ্ডিত শ্রীধর অসহায় হয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে নিজেকে ঘরে বন্দী করে নেয়। এরপর মাতা বৈষ্ণো শ্রীধরের স্বপ্নে আবির্ভূত হন এবং শ্রীধরকে ত্রিকুট পর্বতের মাঝখানে অবস্থিত পবিত্র গুহায় যাওয়ার আদেশ দেন। মাতা বৈষ্ণো স্বয়ং তাঁকে পবিত্র গুহায় যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেন এমনকি পণ্ডিত শ্রীধর যতবারই পথ হারিয়ে ফেলতেন, ততবারই তাঁর চোখের সামনে স্বপ্নের দৃশ্যগুলি পুনরায় ভেসে উঠত বলে মনে করা হয়। আর এই ভাবেই অবশেষে শ্রীধর তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে যান। গুহায় প্রবেশ করে তিনি তিনটি মাথা বিশিষ্ট একটি শিলারূপ দেখতে পান। তারপর মাতা বৈষ্ণো দেবী স্ব-মহিমায় তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে পবিত্র গুহায় অবস্থিত ওই তিনটি শিলারূপ বা পবিত্র পিন্ডিস সম্পর্কে শ্রীধরকে বলেন। এরপর দেবী তাঁকে চারটি পুত্রের বর দেন এবং এই পবিত্র মন্দিরের মহিমা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। জনশ্রুতি আছে যে, সেই থেকেই পন্ডিত শ্রীধর এই পবিত্র গুহার রক্ষক হিসাবে রয়েছেন।
আবার কথিত আছে যে, একজন বিখ্যাত হিন্দু তান্ত্রিক ভৈরননাথ একটি কৃষি মেলায় তরুণী বৈষ্ণো দেবীকে দেখে তাঁর প্রেমে পাগল হয়ে যান। তাই বৈষ্ণো দেবী তার থেকে বাঁচতে ত্রিকুট পাহাড়ে পালিয়ে যান এবং সেখানে নিজের আসল রূপ অর্থাৎ দুর্গার স্বরূপ ধারণ করেন। আর এরপর ত্রিকুট পাহাড়ের একটি গুহায় দেবী তাঁর তরবারি দিয়ে ভৈরননাথের মাথা কেটে ফেলেছিলেন।
শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবীর উৎপত্তি নিয়ে নানা কিংবদন্তি থাকলেও একথা স্বীকার্য যে, প্রায় ৭০০ বছর আগে পণ্ডিত শ্রীধর এই মন্দিরটি আবিষ্কার করেছিলেন।
বৈষ্ণো দেবী মন্দির একটি গুহা মন্দির, যার প্রবেশপথটি আকারে ছোট হলেও ভেতরে মন্দিরটি বেশ প্রশস্ত। গুহার পুরাতন প্রবেশদ্বারটি প্রায় ৩০ মিটার লম্বা ছিল, তবে বর্তমানে নবনির্মিত নতুন প্রবেশপথটি ২০০ মিটার দীর্ঘ। এছাড়া ত্রিকুট পর্বতের ঠিক সংলগ্ন অঞ্চলে পাঁচটি পাথরের একটি কাঠামো রয়েছে, যা পাঁচ পাণ্ডবের প্রতীক বলে মনে করা হয়। ভক্তরা প্রায় ১৩ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তবে দেবীর দর্শন পান তবে কাটরা গেট থেকে শুরু করে চরণ পাদুকা পর্যন্ত আরো একটি সংক্ষিপ্ত পথ রয়েছে, যেখানে প্রায় ৭৪০টি সিড়ি রয়েছে। বৈষ্ণোদেবী মন্দিরের যাওয়ার পথে বানগঙ্গা, অর্ধকুয়ারি, ভৈরব মন্দিরে এবং চরণ পাদুকা মন্দিরগুলিও তীর্থযাত্রীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরে যাওয়ার পথে ভক্তরা ‘জয় মাতাদি’ (Jay Mata Di) ধ্বনি তুলতে তুলতে যান। এই মন্দিরে ভক্তরা দেবীকে নারকেল, চুনরি বা স্কার্ফ এবং প্রসাদ নিবেদন করেন।
মাতা বৈষ্ণো দেবী মন্দিরের পবিত্র গুহা বা গর্ভগৃহের মধ্যে তিনটি প্রাকৃতিক শিলা বা পিন্ডি রয়েছে। এই পিন্ডিগুলি দেবী মহাকালী, মহালক্ষ্মী এবং মহাসরস্বতীর প্রতীক। এখানে মা কালি শক্তি, মহালক্ষ্মী সম্পদ ও সৌভাগ্য এবং মহাসরস্বতী শিক্ষার দেবী হিসাবে বিরাজমান। এছাড়া এই মন্দিরে যাত্রীদের অপেক্ষা করার কক্ষে বৈষ্ণো দেবীর একটি মূর্তি আছে যেখানে আরতির সময় ভক্তরা বসে থাকে।
বৈষ্ণো দেবী মন্দিরে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উৎসব হল নবরাত্রি, যেখানে দুষ্ট রাক্ষসদের উপর দেবীর বিজয়কে আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। এছাড়া এখানে অন্ধকারের উপর আলো, মন্দের উপর শুভ এবং অজ্ঞতার উপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক হিসাবে এই উৎসব পালন করা হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের এই উৎসবে গোটা ত্রিকুট পর্বতকে রাজপ্রাসাদের মত আলো দ্বারা সুসজ্জিত করে সাজিয়ে তোলা হয়। এছাড়া দেওয়ালি ও নববর্ষের অনুষ্ঠানে প্রচুর ভক্ত এই মন্দিরে আসে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান