ইতিহাসে একজন পর্তুগিজ অভিযাত্রী হিসেবেই বিখ্যাত হয়ে আছেন ভাস্কো দা গামা (Vasco Da Gama)। ভারতের দক্ষিণ উপকূলে কালিকট বন্দরে তিনিই প্রথম পদার্পণ করেছিলেন। ১৪৯৭ সালে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে তিনি ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছন। ইউরোপীয়রা তারপর থেকে এই পথ ধরেই অনেক কম সময়ে ও কম খরচে ভারতে এসে মশলাপাতির ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। পর্তুগাল থেকে তিনিই প্রথম সরাসরি ভারতে এসে পৌঁছান। ১৫২৪ সালে তাঁকে পর্তুগিজ ভারতের ভাইসরয় পদে অধিষ্ঠিত করে পর্তুগাল সরকার। এই বছরই ভারতের উদ্দেশ্যে তৃতীয়বার অভিযাত্রার সময় কোচিন বন্দরে এসে উপনীত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ভাস্কো দা গামার এই অভিযান যেমন একদিকে ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও এশিয়ার সংযোগ ঘটিয়েছিল মহাসাগরীয় পথে, ঠিক তেমনিই এর ফলেই ক্রমে ভারতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে মশলা সংগ্রহ করে তা বিদেশের বাজারে বিক্রি করে পর্তুগিজদের প্রভূত লাভের পথ খুলে দিয়েছিলেন ভাস্কো দা গামা।
১৪৬০ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম পর্তুগালের আলেন্তেজো উপকূলের অন্যান্য বন্দরগুলির মধ্যে সিনেস শহরে ভাস্কো দা গামার জন্ম হয়। তাঁর বাড়িটি পর্তুগালের স্থানীয় নোসা সেনোরা ডাস সালাস গির্জার কাছেই ছিল। সিনেস বন্দর শহরের এই গির্জার ঘন্টাধ্বনি শৈশব থেকে শুনে শুনেই বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা এস্তেভাও দা গামা একজন ডিউক নাইট ছিলেন এবং সান্তিয়াগোর সামরিক অর্ডার পদে তিনি উন্নীত হয়েছিলেন। ১৪৬০ সালে তিনি সিনেস অঞ্চলের সিভিল গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৪৭৮ সাল পর্যন্ত এই পদেই আসীন ছিলেন তিনি। এছাড়াও সিনেসের পরবর্তীকালে একজন খাজনা আদায়কারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন এস্তেভাও গামা। ভাস্কো দা গামার মা ছিলেন ইংরেজ বংশোদ্ভূত জোয়াও। এস্তেভাও ও জোয়াও-এর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ভাস্কো দা গামা। তাঁর এক বোনও ছিল তেরেসা নামে।
ইভোরা শহরেই তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। মূলত গণিত আর জাহাজ চালনার দিকনির্দেশনা বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন তিনি। পর্তুগালের একজন খ্যাতনামা জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিদ আব্রাহাম জাকুটোর কাছে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন বলে জানা যায়।
তাঁর বাবার মতোই ভাস্কো দা গামা ১৪৮০ সালে অর্ডার অফ সান্তিয়াগোর একজন সেনা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সান্তিয়াগোর মাস্টার প্রিন্স জন কিছুদিনের মধ্যেই পর্তুগালের রাজা হলে ভাস্কো দা গামা এবং তাঁর বাবা এস্তেভাও-এর সম্মান, প্রতিপত্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। ১৪৯২ সালে রাজার আদেশে সেটুবাল ও আলগার্ভ বন্দরে ফরাসি জাহাজ দখল করার অভিযানে সফল হয়ে ফিরে এলে দেশ জোড়া সুনাম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর।
সেই সময় ইউরোপীয় দেশগুলিতে মশলার বাণিজ্য চলত মূলত আফ্রিকার সঙ্গে। ভারতের ব্যাপারে তখনও পর্যন্ত কারও কোন ধারণাই ছিল না। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে পর্তুগালের প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটরের মাধ্যমে পশ্চিম আফ্রিকার ধনসম্পদ, সোনা-দানা ইত্যাদি আবিষ্কারের চেষ্টা শুরু হয়ে যায়। মূলত ধনসম্পদ আহরণের চেষ্টাতেই এই ভৌগলিক অভিযানগুলি শুরু হয়েছিল, এছাড়া ছিল ক্রীতদাস সংগ্রহের চেষ্টা। ১৪৬০ সালে হেনরির মৃত্যু হলে, পর্তুগাল সরকার এই অভিযানে খুব বেশি আগ্রহ না দেখানোয় ফার্নাও গোমসের নেতৃত্বে লিসবনের একটি ব্যক্তিগত বণিক সংগঠনকে এই অভিযানের অনুমতি দেয় পর্তুগাল সরকার। গোমস এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সোনার গুঁড়ো, মেলেগুয়েটা মরিচ, হাতির দাঁত এমনকি ক্রীতদাসও সংগ্রহ করেছিলেন। তারপরে ১৪৮১ সালে দ্বিতীয় জন পর্তুগালের রাজা হওয়ার পরে তিনি রাজকীয় একটি কোষাগার স্থাপন করতে চাইলেন এবং বণিকদের উপর নির্ভরতা কমাতে চেষ্টা করলেন। তাছাড়া এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অত্যন্ত লাভজনক মশলার বাণিজ্য শুরু করার কথা ভাবলেন জন। তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে ভেনিস স্থলপথে এই বাণিজ্য চালাত পূর্ণ একাধিপত্য নিয়ে। জন পর্তুগালের নাবিকদের নির্দেশ দিলেন পশ্চিম আফ্রিকার সঙ্গে জলপথে কীভাবে মশলার বাণিজ্য করা যায় তার একটা দিক আবিষ্কার করতে। ইউরোপ থেকে এশিয়ার মধ্যে নতুন একটি জলপথের সন্ধানেই শুরু হয়েছিল ভাস্কো দা গামার ভৌগলিক অভিযান। ভাস্কো দা গামার যখন মাত্র ২০ বছর বয়স, সেই সময়েই রাজা দ্বিতীয় জন মিশর হয়ে পূর্ব আফ্রিকার পথে দুজন গুপ্তচরকে পাঠান সেখানকার মশলা ও অন্যান্য সামগ্রী বাণিজ্যের রকমফের বুঝে আসবার জন্য। ইতিমধ্যে পর্তুগিজ অভিযাত্রী বার্থোলোমিউ দিয়াজ উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলের সংবাদ বয়ে নিয়ে আসেন রাজার কাছে। ফলে মশলার লাভজনক বাণিজ্যের সন্ধানে শুরু হয়ে যায় অভিযান।
১৪৯৭ সালের ৮ জুলাই পর্তুগালের লিসবন বন্দর থেকে ভারতে পৌঁছানোর সমুদ্রপথ আবিষ্কার এবং গোলমরিচ ও মশলাপাতির বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামার নেতৃত্বে এক বিশাল নৌবহর রওনা দেয়। ভাস্কো দা গামার বয়স তখন মাত্র ৩০ বছর। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন যে প্রথমে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে দক্ষিণে যাবেন, তারপর আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে পূর্বদিকের পথ ধরবেন এবং সবশেষে উত্তর দিকের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। ভারত মহাসাগরের উপর এসে পৌঁছালে সেই পথে পূর্বদিকে অভিযান চালাবেন ভেবে রেখেছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিল মোট চারটে জাহাজ এবং ১৭০ জন নৌ-কর্মী। সাও গাব্রিয়েল, সাও রাফায়েল, বেরিও ইত্যাদি নামের সেই চারটে জাহাজ নিয়ে দিক ভুল করার জন্য ভাস্কো দা গামার এই অভিযান সফল হয়নি। ১৭০ জনের মধ্যে ফিরে এসেছিলেন মাত্র ৫৫ জন, দুটো জাহাজ ডুবে গিয়েছিল সমুদ্রঝড়ে। ১৪৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে টেনেরিফ, কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জ হয়ে আফ্রিকাল উপকূল বরাবর সিয়েরা লিওনে পৌঁছানোর পরে নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ আটলান্টিকের পশ্চিমাঞ্চল খুঁজতে শুরু করেন গামা। এই পথেই গিয়েছিলেন বার্থোলোমিউ দিয়াজ। ১৪৯৭ সালের ৪ নভেম্বর আফ্রিকার মাটিতে তাদের জাহাজ নোঙর ফেলে। তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন ভাস্কো দা গামা যা সেই সময়ের নিরিখে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এরপরে মোজাম্বিক দ্বীপ, মোম্বাসা, মালিন্দি পেরিয়ে ১৪৯৮ সালের ২০ মে তিনি গিয়ে পৌঁছান ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে। কালিকটের রাজা সামুদিরিকে ভাস্কো দা গামা উজ্জ্বল লাল কাপড়ের চারটি জোব্বা, ছয়টি টুপি, চার ধরনের প্রবাল, বারোটি আলমাসার, সাতটি পিতলের পাত্রসহ একটি বাক্স, এক সিন্দুক চিনি, দুই ব্যারেল তেল এবং এক পিপা মধু উপহার হিসেবে দেন। কালিকটের রাজাও প্রথমে সকল বিদেশি অভিযাত্রীদের খুবই আপ্যায়ন করেন। কিন্তু উপহারে সোনা-রূপো না থাকায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল তাঁর। ১৪৯৮ সালের ২৯ আগস্ট ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দর থেকে ফেরার জন্য রওনা দেন পর্তুগালের উদ্দেশ্যে। অজ্ঞাত মৌসুমি বায়ুর বিভীষিকার সম্মুখীন হয়ে তেইশ দিনের পথ পেরোতে তাদের একশো বত্রিশ দিন লেগে যায়। মালিন্দিতে ফিরে আসার সময় কয়েকজন নৌ-কর্মী স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। লোকসংখ্যা কমে যাওয়ায় ভাস্কোর নির্দেশে সাও রাফায়েল জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পর্তুগালের লিসবনে পৌঁছে ভাস্কো দা গামার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সান্তিয়াগো দ্বীপে কিছুদিন থেকে তাঁর ভাই পাউলোর মৃত্যু হয়। ১৪৯৯ সালের ২৯ আগস্ট লিসবনে পৌঁছালে বীরের মতো রাজকীয় সমাদরে ভূষিত হন ভাস্কো দা গামা।
১৫০২ সালে পর্তুগাল থেকে ৪র্থ ভারতীয় নৌবহর রওনা দেয়। ভাস্কো সেখানে অংশ নিতে চান এবং কালিকটের রাজার উপর প্রতিশোধ নিতে চান। এই বহরের মাধ্যমে কালিকটের রাজাকে পর্তুগালের শর্তে যেনতেন প্রকারেণ রাজি করানোই ছিল এই অভিযানের উদ্দেশ্য। এই সময় তাঁদের নৌবহর ভারতে পৌঁছানো মাত্রই মক্কা ফেরত ‘মিরি’ নামের এক জাহাজে আক্রমণ চালিয়ে ভাস্কো দা গামা সব যাত্রীদের সমুদ্রে ডুবিয়ে মারেন এবং তাদের কাউকে কাউকে পুড়িয়ে মারেন। এরা সকলেই ছিলেন হজযাত্রী। ঐ জাহাজের চারশো জন যাত্রীর মধ্যে ৫০ জনই ছিলেন মহিলা যাঁরা তাঁদের শিশুদের দেখিয়ে ভাস্কো দা গামার বাহিনীর কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও ভাস্কো দা গামা বিরত হননি। অবশেষে ভারতের উপকূলে কালিকটের রাজা ভাস্কোর শর্তে রাজি হন এবং মশলার বাণিজ্যে অনুমতি দেন। কামান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে শহরের বহু ক্ষয়-ক্ষতি করেছিলেন ভাস্কো দা গামা। কালিকট আর কোচিনের মধ্যে তখন বিবাদ চলছিল বলে সেই সুযোগে তিনি ভারতে প্রথম পর্তুগিজ বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। ১৫২৪ সালে তৃতীয়বার পুনরায় ভারত অভিযানের সময় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন ভাস্কো দা গামা।
পর্তুগালের রাজা তৃতীয় জন ভাস্কো দা গামাকে ভারতের ‘ভাইসরয়’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাছাড়া ভারতের পশ্চিম উপকূলের পর্তুগিজ কলোনিগুলির শাসনকর্তাও ছিলেন তিনি।
১৫২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভাস্কো দা গামার মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান