ইতিহাস

বিদ্যা মুন্সি

বিদ্যা মুন্সি (Vidya munshi) ভারতের প্রথম মহিলা সাংবাদিক এবং কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। বেশ কয়েক বছর ধরে, সিপিআইয়ের মুখপত্র ‘কালান্তর’-সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে কাজ করেছিলেন। তিনি ২০০০ সাল অবধি রাজ্য মহিলা কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কমিউনিস্ট নেত্রী, পণ্ডিত ও লেখিকা, সাংবাদিক, এবং সম্পাদক।

১৯১৯ সালে বোম্বাইয়ে (অধুনা মুম্বাই) বিদ্যা মুন্সির জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সুপরিচিত অপরাধী আইনজীবী।  

ছোট থেকেই বিভিন্ন ধরনের বইয়ের প্রতি ছিল বিদ্যার অগাধ ভালবাসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মুম্বইয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং তারপর ডাক্তারি পড়ার জন্য একাই ইংল্যান্ড যাওয়া স্থির করেন যদিও এই ব্যাপারে পরিবারের অত্যন্ত আপত্তি ছিল। অবশেষে বিদ্যা মুন্সি একাই ডাক্তারি পড়ার জন্য বাড়ি ইংল্যান্ড যান।  ইংল্যান্ডে ১৯৪২ সালে, বিদ্যা গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সি.পি.জি.বি) যোগদান করেন এবং মূলত ফ্যাসিবাদী শক্তির দ্বারা পরিচালিত সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ইউরোপের কমিউনিস্ট পার্টির অনেকগুলি অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সি.পি.আই) এর ছাত্র-শাখা ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন’-এর পক্ষ থেকে, বিদ্যা মুন্সি প্যারিসে একটি ‘ইভেন্ট অল উইমেন কনফারেন্স’-এ (ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ডেমোক্র্যাটিক ইয়ুথ) অংশ নিয়েছিলেন। এরপর ঠেকে রাজনৈতিক জীবনে আর কখনও তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে এসে ‘দ্য স্টুডেন্ট’-এর সম্পাদক এবং ভূ-বিশেষজ্ঞ সুনীল মুন্সি-কে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৫২ সালে মুম্বাইয়ের ‘দ্য ব্লিটজ’ পত্রিকার কলকাতা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করার সময় থেকে তিনি কলকাতার প্রথম কর্মরতা মহিলা সাংবাদিক হওয়ার নজির গড়েন। তিনি বহু বছর চেষ্টার পরে বাংলা লিখতে শিখেছিলেন। বিদ্যা মুন্সি দীর্ঘদিন সি.পি.আই দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং দলীয় মুখপত্র ‘কালান্তর’-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তাও সেই সময় যখন কমিউনিস্ট পার্টি নারী-স্বরকে সেভাবে গুরুত্ব দিত না। তিনি ২০০০ সাল অবধি রাজ্য মহিলা কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ‘ইন রেট্রোস্পেক্ট’নামে একটি বই লিখেছিলেন যেখানে তিনি তাঁর জীবন, রাজনৈতিক উত্থান এবং তাঁর সময়ের ‘ইংল্যান্ডে এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ডেমোক্র্যাটিক ইয়ুথ-এর সদর দফতরে কাটানো যুদ্ধকালীন স্মৃতি এবং এবং স্বাধীনোত্তর ভারতে নারী আন্দোলনের উপর নানান চিন্তাভাবনা দুর্দান্তভাবে বর্ণনা করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত প্রতিবেদক হিসাবে তাঁর দশ বছরের মেয়াদে লেখা নিবন্ধগুলি বইটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। 

বিদ্যা মুন্সি মুম্বাইয়ের ‘দ্য ব্লিটজ’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার কলকাতা সংবাদদাতা ছিলেন। সরকারি নীতিমালার সমালোচনা এবং তদন্তকারী সাংবাদিকতায় অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি সেই সময়ে। কানাডার দুই পাইলট কীভাবে হংকং থেকে সোনা পাচার করে সুন্দরবনের একটি দ্বীপে ফেলে যাচ্ছিল এবং কীভাবে তা কলকাতায় পাচার করা হচ্ছিল তা নিয়ে তিনি একটি আলোড়নকারী প্রতিবেদন লিখেছিলেন । আসানসোলের চিনাকুরি খনি বিপর্যয়ের ফলে খনিতে কর্মরত শত শত শ্রমিক কীভাবে মারা গিয়েছিল তাই নিয়ে তাঁর আর একটি প্রতিবেদনে আপামর ভারতবাসী বিস্মিত হয়েছিল। এই সাহসী সাংবাদিকতা, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং বিভিন্ন সংগঠনের মহিলাদের সাথে কাজ করার তাঁর দক্ষতা ও নেতৃত্ব ‘কলকাতার প্রথম কর্মজীবী মহিলা সাংবাদিক’ বিদ্যা মুন্সিকে সমাজের আরও বড় উচ্চতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। স্বাধীনতার পরে নারী আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসাবে বিভিন্ন দেশে তিনি সফর করেছেন এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ভারতে যে নব্য-নারীবাদ গড়ে উঠেছিল, সে নিয়ে প্রায়সই উত্তপ্ত বিতর্কে অংশ নিতেও তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। ৬৫ বছর বয়সে তিনি সি.পি.আই.-এর জাতীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। এর পরেই তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সভাপতি হন এবং পরবর্তী বহু বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গ স্টেট সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাডভাইসারি বোর্ডের (West Bengal State Social Welfare Advisory Board) সদস্যা ছিলেন। তিনি বহু বছর মহিলাদের কর্মাধিকার নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন।

৮৩ বছর বয়সে তাঁর সেরিব্রাল স্ট্রোক হয় যার ফলে তাঁর দেহের ডানদিকের অংশ প্রায় নিশ্চল হয়ে যায়। বিদ্যা মুন্সি  পড়ার জন্য একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার এবং প্রয়োজন মতো বাঁ হাত দিয়ে নোট তৈরি করতেন। প্যারালাইসিস বা সেরিব্রাল স্ট্রোক, কোনও কিছুই অদম্য বিদ্যা মুন্সিকে আটকাতে পারেনি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কাউন্সিলের প্রাক্তন সদস্য প্রবীণ বিদ্যা মুন্সি ৯৪ বছর বয়স অবধি জীবিত ছিলেন। 

২০১৪ সালের ৭ জুলাই কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন