সববাংলায়

সাবান মাখা হাত ঘষলে ফেনা হয় কেন

হাত দিয়ে ময়লা ঘাঁটলে হাত তো ধুতে হবেই, কিংবা বাইরে অনেকক্ষণ ধরে নানারকম কাজের পর খাবার খাওয়ার আগেও হাত ধুয়ে নিতে হয় আমাদের। শুধু হাত নয়, স্নানের সময় তো রোজই আমরা গোটা গায়েই সাবান মেখে পরিস্কার হয়ে নিই। মাথায় যে শ্যাম্পু দিই, সেটাও ঐ সাবান-জাতীয় পদার্থ। মোট কথা দৈনন্দিন জীবনে পরিস্কার করার কাজে সাবান আমাদের একটি অপরিহার্য অঙ্গ বলা যায়। কোভিড-মহামারী পৃথিবীতে এসে সাবান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন হয়তো দিনে দশ বারই আমরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলি। হাতে হাতে সাবান ঘষলে সাদা ফেনায় হাত ভরে ওঠে এ তো আমাদের চেনা ঘটনা। কাপড় কাচার যে ডিটারজেন্ট তাও জলে ফেলে হাত দিয়ে নাড়া-চাড়া করলে ফেনায় ভরে ওঠে। কিন্তু এত সাবান, ডিটারজেন্ট ব্যবহার করার পরেও জানেন কী ঠিক কেন এই ফেনা তৈরি হয়? তাহলে চলুন, আজ এই ফাঁকে জেনে নেওয়া যাক সাবান মাখা হাত ঘষলে ফেনা হয় কেন ।

সাবানে ফেনা কেন হয় এটা বোঝার আগে জানতে হবে সাবান বস্তুটি আসলে ঠিক কী। রসায়নবিজ্ঞান অনুযায়ী সাবান হল কয়েকটি জৈব ফ্যাটি অ্যাসিডের লবণ মাত্র। জৈব অ্যাসিড বলতে তো প্রথমেই আমাদের মনে পড়ে তেঁতুলের টারটারিক অ্যাসিডের কথা, যার জন্য তেঁতুল এত টক। বিভিন্ন জৈব পদার্থের মধ্যে এরকম নানা প্রকার অ্যাসিড থাকে। আর ফ্যাটি অ্যাসিড আসে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেল থেকে, আমাদের শরীরেও এটি সঞ্চিত থাকে নির্দিষ্ট পরিমাণে। তবে সাবানের যে জৈব ফ্যাটি অ্যাসিড তার প্রকৃতি অন্যগুলির থেকে একেবারে আলাদা। কারণ এই জৈব ফ্যাটি অ্যাসিডগুলির আণবিক গুরুত্ব অনেক বেশি। স্টিয়ারিক অ্যাসিড, পামিটিক অ্যাসিড, ওলেয়িক অ্যাসিড ইত্যাদি উচ্চ আণবিক গুরুত্ব সম্পন্ন জৈব ফ্যাটি অ্যাসিডের সোডিয়াম বা পটাশিয়াম লবণ বলা হয় সাবানকে। সহজ করে বলা যাক। উদ্ভিজ্জ তেল, খনিজ তেল, চর্বি ইত্যাদিতে থাকা স্টিয়ারিক, পামিটিক, ওলেয়িক ইত্যাদি জৈব ফ্যাটি অ্যাসিডগুলির সঙ্গে তীব্র ক্ষার সোডিয়াম বা পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইডের বিক্রিয়ার ফলে সাবান তৈরি হয়। বিজ্ঞানে আমরা সকলেই পড়েছি অ্যাসিড আর ক্ষারের বিক্রিয়ায় জল আর ঐ অ্যাসিডের লবণ তৈরি হয়। এখানেও ব্যাপার সেই একই। একটা সম্ভাব্য বিক্রিয়া সমীকরণের সাহায্যে ব্যাপারটা দেখানো যাক –

C17H35COOH + NaOH = C17H35COONa + H2O

এখানে C17H35COOH হল স্টিয়ারিক অ্যাসিডের সংকেত, NaOH হল সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড এবং এদের বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন হয়েছে C17H35COONa যার রাসায়নিক নাম সোডিয়াম স্টিয়ারেট লবণ। তবে একটি মাত্র জৈব ফ্যাটি অ্যাসিড থেকেই যে সাবান তৈরি হয় তা নয়, একাধিক ফ্যাটি অ্যাসিড থাকতে পারে। তাই এই সমীকরণটি সর্বত্র কার্যকর হবে না। এটিই আসলে সাবান। এই জৈব লবণটি জলে দ্রবীভূত হয়ে বায়ুর সঙ্গে মিশেই ফেনা তৈরি করে। আসলে এই ফেনা অসংখ্য বুদবুদের সমষ্টি বিশেষ।

জলের ক্ষেত্রে প্রবল পৃষ্ঠটানের কারণে জলের উপরিতলের অণুগুলিকে তার নীচের অণুগুলি প্রচণ্ড শক্ত করে টেনে ধরে রাখে। অন্যান্য সমস্ত প্রকার তরলের তুলনায় আণবিক আকর্ষণ এবং পৃষ্ঠটান জলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বেশি। আর সাবানের অণু জলের এই পৃষ্ঠটান হ্রাস করে। কারণটা জেনে নেওয়া যাক। সাবানের অণুর দুটি প্রান্ত থাকে – একটি জল-আকর্ষী প্রান্ত যাকে হাইড্রোফিলিক বলা হয় আর অন্যটি জল-বিকর্ষী প্রান্ত যাকে হাইড্রোফোবিক প্রান্ত বলা হয়। আমরা দেখেছি শুকনো সাবান হাতে ঘষলে ফেনা হয় না, তার জন্য জল লাগে। এখন সাবান জলে মেশা মাত্রই সাবানের অণুগুলি জলের অণুগুলিকে মাঝে রেখে ত্রি-স্তরীয় একটা গঠন তৈরি করা চেষ্টা করে। সাবান হাতে ঘষলে যে ঘর্ষণ তৈরি হয় তার কারণে ছোটো ছোটো হাওয়ার বুদবুদ ভেসে ওঠে। সাবানের অণুর হাইড্রোফিলিক প্রান্তটি জলের অণুগুলিকে টেনে ধরে রাখে আর অপর প্রান্ত জল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চায় বলে নিকটস্থ বায়ুর বুদবুদকে আটকে ধরে সেই হাইড্রোফোবিক প্রান্ত। এর ফলেই মধ্যিখানে বাতাস আটকে পড়ে এবং তার চারপাশে প্রথমে এক স্তর সাবাণের অণু, তারপর জলের অণু এবং সবার শেষে আরেক স্তর সাবাণের অণু জমে গোটা বুদবুদ তৈরি করে। এরকম অজস্র বুদবুদ একত্রে মিশে তৈরি করে সাবানের ফেনা। স্যাণ্ডুইচের মতো জলের অণুগুলি এখানে সাবানের অণুগুলি মাঝে চেপ্টে থাকে। আর সাবান জলে মিশে যেহেতু জলের পৃষ্ঠটান কমিয়ে দিয়েছে, তাই জলের অণুগুলির মধ্যেও আর বিশেষ আকর্ষণ নেই। বাতাসের অণু, সাবানের অণু সকলের সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে সাবানের ফেনা। আশা করি এবার নিশ্চই বোঝা গেছে সাবান মাখা হাত ঘষলে ফেনা হয় কেন ।

এক্ষেত্রে আরো একটা বিষয় খুব মজার, সাবানের রঙ তো আমরা অনেক রকম দেখে থাকি। নীল, হলুদ, কমলা, সবুজ কত কি! কিন্তু সেই সাবান হাতে ঘষা মাত্র সবসময় সাদা ফেনাই তৈরি হয়। সবুজ রঙের সাবানের সবুজ ফেনা হয়েছে এ ঘটনা কেউই চোখে দেখেনি আর দেখবেও না। এর পিছনেও রয়েছে বিশেষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সব সাবানের ফেনার রঙ সাদা হয় কেন তা নিয়ে নাহয় অন্য একদিন জানা যাবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading