ধর্ম

প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পূজা একই তারিখে হয় কেন

মহালয়া এলেই পুজোর সাজো সাজো রব আরো তুঙ্গে ওঠে। আর এক সপ্তাহ পরেই তো মা এসে যাবেন ঘরে, কৈলাস থেকে এই মর্ত্যধামে তার শুভ আগমন। মহালয়ার দিনটি তাই বাঙালিদের কাছে এক অন্যমাত্রা নিয়ে হাজির হয়। আর এই মহালয়ার আগে আগেই, কখনো আবার ঠিক আগেরদিনই আসেন দেব বিশ্বকর্মা। বেশ সময়ানুবর্তী তিনি। ভাববেন না মজা করছি! বিশ্বকর্মা সত্যই সময়ানুবর্তী, প্রচণ্ড শৃঙ্খলাপরায়ণ তা নাহলে প্রতি বছর একই তারিখে তাঁর পূজা হয় কেন শুনি! হ্যাঁ ঠিকই। আমরা অনেকেই লক্ষ্য করেছি বছরে সমস্ত পূজা-পার্বণের তারিখ, তিথি ইত্যাদি কখনো এক থাকে না, পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই একটি পূজার তারিখ কখনোই প্রায় বদলায় না। এ যেন জাতীয় ছুটির মতো প্রতিবার পড়ে একইদিনে। ভাবছেন কেন এমন হয়? সত্যিই ভাবার বিষয়। তাহলে চলুন ভাবনার উত্তরটা খুঁজে নিই। জেনে নিই প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পূজা একই তারিখে হয় কেন ?

দেবতাদের মধ্যে শিল্পী বা স্থপতি বলা হয় বিশ্বকর্মাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন যে বিশ্বের সকল প্রকার কর্মের তিনি অধিপতি, তাই তাঁর নাম বিশ্বকর্মা। শিল্পের দেবতা বিশ্বকর্মা পুরাণের বিভিন্ন কাহিনিতে কখনো কৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা শহর নির্মাণ করেন, কখনো রামায়ণে বর্ণিত রাবণ রাজার সোনার লঙ্কা তৈরি করেন, আবার কখনো বিভিন্ন দেবতাদের অস্ত্রগুলিও নির্মাণ করে দেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের জন্য ত্রিশূল, ব্রহ্মার পুষ্পক রথ, ইন্দ্রের বজ্র সবই দেব বিশ্বকর্মার তৈরি। হস্তীবাহনে আসীন বিশ্বকর্মা বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে, কামার-কুমোর-স্বর্ণলার-ঢালাইকর-শ্রমিকদের মধ্যে মহাসমারোহে পূজিত হন। প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে বিশ্বকর্মার পূজা হয়ে থাকে। প্রতিবছর একইদিনে এই পূজা হয়, এর কোনো পরিবর্তন হয় না বিশেষ। আসলে আমাদের হিন্দুদের মধ্যে সমস্ত পূজা-পার্বণের দিন-ক্ষণ, তিথি-নক্ষত্র ইত্যাদি সবই নির্ধারিত হয় একটা বিশেষ বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। আমরা বাংলা বর্ষপঞ্জি দেখেছি, ইংরাজি বর্ষপঞ্জি দেখেছি। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের সকলেরই প্রায় অজানা যে এই বর্ষপঞ্জিগুলির প্রকৃতি কিরকম। দু ধরনের পঞ্জি ব্যবহার করে থাকি আমরা। একটাকে বলা হয় সৌরপঞ্জি আর অন্যটা চান্দ্রপঞ্জি। সহজ করে বললে, সূর্যের অবস্থান, গতি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে একটা পঞ্জি তৈরি হয়ে থাকে আর অন্যটা হয় চাঁদের গতি বা অবস্থানের ভিত্তিতে। এখন দেখে গেছে হিন্দুদের সমস্ত পূজার্চনাই মানা হয় চান্দ্রপঞ্জির উপর ভিত্তি করে। চন্দ্রের অবস্থান যেমন যেমন বদলায় সেইরকমভাবেই অন্যান্য পূজার দিনক্ষণও বদলে যায়। কিন্তু বিশ্বকর্মা পূজার সময়কাল নির্ধারিত হয় সৌরপঞ্জি অনুসারে। অর্থাৎ যে পঞ্জি অনুসারে আমাদের ইংরেজি ক্যালেণ্ডার যাকে আসলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়, তা তৈরি করা হয়েছে। সেই সৌরপঞ্জিতে মূল নির্ণায়ক হল সূর্যের উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ন। আমাদের জ্যোতিষশাস্ত্রে বারোটি রাশির কথা বলা আছে – মেষ, বৃষ, মিথুন, সিংহ, কন্যা, তুলা, মীন ইত্যাদি। সূর্য উত্তরায়ণ থেকে দক্ষিণায়নে যাওয়ার সময় এই প্রতিটি রাশিতে কিছুদিন করে অবস্থান করে। এই রাশিতে অবস্থানের দিন-ক্ষণ মেনেই সমস্ত তিথি নির্ধারিত হয়ে থাকে। সেই সৌরপঞ্জি অনুযায়ী উত্তরায়ণের সময় সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে গমন করলে মনে করা হয় দেবতারা সকলে নিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন। আর এই সময়েই বিশ্বকর্মা দেব পূজিত হন। এবারে একটা সহজ অঙ্কের হিসেব আমাদের বুঝে নিতে হবে। ভাদ্র মাসের একেবারে শেষ দিনে এই বিশ্বকর্মা পূজার দিন নির্ধারিত থাকে। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে ভাদ্র মাসের আগে আরো পাঁচটি মাস রয়েছে – বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ এবং ভাদ্র মাসের প্রায় পুরোটা। দিনসংখ্যার হিসেবে এই পাঁচ মাসে রয়েছে মোট ১৫৬ দিন। ফলে এই হিসেব অনুযায়ী ইংরেজি বর্ষপঞ্জিতে ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিতে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মনে রাখতে হবে কোনো কোনো বাংলা মাসে যদি ২৯ দিন বা ৩২ দিন হয়ে থাকে কখনো সেক্ষেত্রেই একমাত্র এই ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটি পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। ফলে তখনই কেবল বিশ্বকর্মা পূজা এগিয়ে বা পিছিয়ে যায় যা খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পূজা একই তারিখে হয় কেন আশা করা যায় এবার বোঝা গেল।

ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই রান্নাপুজো হয় কেন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।