ধর্ম

পিতৃপক্ষ

আশ্বিনের কৃষ্ণ পক্ষের তিথিকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণ পক্ষকে বলা হয় ‘অপরপক্ষ’ কিংবা ‘পিতৃপক্ষ'(mahalaya)। পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করার অনুষ্ঠান বা রীতিই হল পিতৃপক্ষ।মহালয়া(mahalaya) হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের শুরুর আগের দিন।

হিন্দু রীতি অনুযায়ী  এ কথা বিশ্বাস করা হয় যে পিতৃপক্ষে  পূর্বপুরুষদের আত্মারা পিতৃলোক থেকে নেমে আসেন এবং ভূতপ্রেতদের সঙ্গে মর্ত্যলোকে ঘুরে বেড়ান। এ বিশ্বাস শুধু যে হিন্দুরাই করে তা নয়, এই বিশ্বাসের সমর্থন পাওয়া যায় ইংরেজ পণ্ডিতদের বক্তব্যেও। যেমন এম এম আন্ডারহিল লিখেছেন- ‘সূর্য এই সময় কন্যা রাশিতে অবস্থান করে… আত্মারা যমের বাড়ি ছেড়ে মর্তে নেমে এসে নিজের নিজের বংশধরদের গৃহে অবস্থান করেন।’ আবার আরেক ইংরেজ পণ্ডিত সি এইচ বাক-এর একটি রিপোর্টে পাওয়া যায়- ‘বছরে যতগুলি অমাবস্যা আছে, তার মধ্যে মহালয়া(mahalaya), মানে আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চদশ বা শেষ দিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ কেন করা হয়? এ বিষয় জানতে গেলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে মহাভারতের।

মহাভারত অনুযায়ী , মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা  স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হয় কেবলই সোনা।হতচকিত  কর্ণ  তার সাথে এরকম অদ্ভূত ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞেস করলে  ইন্দ্র তাঁকে বলেন, বেঁচে থাকাকালীন  সারাজীবন কর্ণ কেবল সোনাদানাই দান করেছে, পিতৃপুরুষকে জল দেয় নি। সেই কারণেই তার জন্যে এই ব্যবস্থা। কর্ণ  তখন প্রত্যুত্তরে বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগের রাতে পিতৃপুরুষের কথা জানতে পারেন মা কুন্তীর কাছ থেকে যখন মা এসে তাকে বলেন, কর্ণ তাঁর ছেলে। এরপর যুদ্ধে ভাইয়ের হাতেই তাঁর  মৃত্যু হলো।সুতরাং পিতৃতর্পণের সময়ই তো তিনি পেলেননা। ইন্দ্র বুঝলেন, কর্ণের দোষ নেই। তিনি কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দিলেন।ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল (পনেরো দিন) ধরে কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন।  কর্ণের এই মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দেওয়ার পক্ষটি সেই থেকে পরিচিত পিতৃপক্ষ নামে।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাঁকে তাঁর পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়। পিতৃপক্ষে পুত্র দ্বারা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “পুত্র বিনা মুক্তি নাই।”  মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ, তাঁরা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন।শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে  তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়, তাঁদের নাম উচ্চারণ করা হয় এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়। ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতাত্ত্বিক উষা মেননের মতেও, পিতৃপক্ষ বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে বংশের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বপুরুষের নাম স্মরণ করে তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পিতৃপুরুষের ঋণ হিন্দুধর্মে পিতৃমাতৃঋণ অথবা গুরুঋণের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

To Top
error: Content is protected !!