ডাক ব্যবস্থা বা টেলিগ্রাফ আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই মানুষ দূরবর্তী দুটি স্থানের মধ্যে বার্তা প্রেরণের জন্য বিভিন্ন ধরণের পাখি এবং প্রাণীদের ব্যবহার করে আসছে। বার্তা প্রেরণকারী প্রাণীদের মধ্যে সবার প্রথমে রয়েছে পায়রা। যুদ্ধক্ষেত্রে বার্তা প্রেরণের ক্ষেত্রে এই পায়রারা সেই ষষ্ঠ শতক থেকে পারস্যের রাজা সাইরাসের আমল থেকে অটল নির্ভরশীলতার এক নাম হয়ে উঠেছে। প্রাচীন রোমের শাসক জুলিয়াস সিজারও পায়রাকে বার্তা প্রেরক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সেনাবাহিনী এরকমই বার্তা প্রেরক ছয়শোটি পায়রা সম্বলিত একটি বাহিনী গঠন করেছিল। সেই বাহিনীর সদস্য ছিল ‘শের আমি’ নামের একটি পায়রা। এই পায়রাটি বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পঁচিশ মাইল দূরত্ব মাত্র পঁচিশ মিনিটে অতিক্রম করে নির্দিষ্ট জায়গায় বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘শের আমি’ শব্দটি একটি ফরাসী শব্দ যার অর্থ ‘প্রিয় বন্ধু’। শের আমি ছিল কালো রঙের চেক কক প্রজাতির পায়রা। ফ্রান্সের ভেরদুন সংলগ্ন এলাকাগুলিতে সে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত। শের আমি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছিল। ১৯১৮ সালের ৪ অক্টোবর ১৯৪ জন মার্কিনী সেনার একটি দলকে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল শের আমি। এই ঘটনার দ্বারা শের আমি পায়রাটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছে। মেজর চার্লস হোয়াইট হোয়াইটেলস এর পাঠানো বার্তার দ্বারা এতজন মার্কিনী সেনার জীবন রক্ষার রোমাঞ্চকর কাহিনী পৃথিবীর মানুষ কোনদিন ভুলে যাবে না।
১৯১৮ সালের ৩ অক্টোবর মেজর হোয়াইটেলস সহ ৫৫০ জন মার্কিনী সেনাকে দুর্ধর্ষ জার্মান বাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের সাথে থাকা গোলা বারুদ এবং খাবারের পরিমান দুইই প্রায় শেষের মুখে ছিল। এই অবস্থায় খাদ্যের অভাবে ও শত্রুপক্ষের প্রবল গুলিবর্ষণে অনেকেই নিহত হয়। ৫৫০ জনের মধ্যে জীবিতের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৯৪ জনে। গভীর এই সংকটকালে প্রাণরক্ষার তাগিদে মেজর হোয়াইটেলস বার্তাবাহক পায়রাদের মাধ্যমে একে একে বার্তা পাঠাতে থাকেন। প্রথম পায়রাটির মাধ্যমে তিনি বার্তা পাঠান, “Many wounded. We cannot evacuate.” কিন্তু বার্তা বহনকারী সেই পায়রাটিকে জার্মানবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলে। দ্বিতীয় পায়রার মাধ্যমে তিনি পুনরায় বার্তা পাঠান, “Many are suffering. Can support be sent?” কিন্তু দ্বিতীয় বার্তা বহনকারী পায়রাটিকেও জার্মান সেনারা গুলি করে হত্যা করে। এর পর আসে শের আমির পালা। ৪ অক্টোবর, ১৯১৮, মেজর হোয়াইটেলস শের আমির বাঁ পায়ে বার্তা-ক্যাপস্যুল জুড়ে দিলেন যাতে একটি কাগজে লেখা ছিল – “We are along the road parallel to 276.4. Our own artillery is dropping a barrage directly on us. For heaven’s sake stop it.” শের আমিকে উড়তে দেখে জার্মান বাহিনী শের আমিকেও লক্ষ্য করে গুলি করতে শুরু করে। শের আমির বুকে ও ডান পায়ে গুলি লাগে। গুলির আঘাতে একটি চোখ অন্ধ হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থাতেও শের আমি ৭৭ ডিভিশন হেড কোয়ার্টারে পৌঁছে যায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও ২৫ মাইল পথ মাত্র ২৫ মিনিটে পারি দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে বার্তা বহন করে শের আমি একটি ব্যাটেলিয়নকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
১৯১৯ সালের ১৩ জুন গুরুতর আঘাতজনিত কারনে নিউ জার্সির ফোর্ট মনমাউথে শের আমির মৃত্যু হয়। এই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য শের আমিকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সেনা সম্মান ক্ৰয় দে গুয়ের (Croix De Guerre) পদক দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর শের আমির দেহটিকে আমেরিকার বিখ্যাত স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে সর্বসাধারণের দেখার জন্য সংরক্ষিত করা হয়। ১৯৩১ সালে শের আমিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা পালনের জন্য স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। শের আমির এই রোমাঞ্চকর কাহিনী আমেরিকাবাসীর মনে দশকের পর দশক ধরে বেঁচে আছে। শের আমির বীরত্বের কাহিনী সারা বিশ্বের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে চিরকাল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান