মানুষের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বা জনজাতির মানুষকে দেখতে একে অন্যের থেকে আলাদা লাগে — এই প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক, আবার বৈজ্ঞানিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহুদিন ধরে এই ভিন্নতা নিয়ে কৌতূহল, ভুল ধারণা, এমনকি বৈষম্যও তৈরি হয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে নৃতত্ত্ব (Anthropology), জিনতত্ত্ব (Genetics) ও বিবর্তনবিদ্যা (Evolutionary Biology) আমাদের পরিষ্কারভাবে জানায় যে মানুষের চেহারার এই পার্থক্যের পেছনে কোনও শ্রেষ্ঠত্ব বা নিকৃষ্টতা নেই; বরং আছে দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক অভিযোজনের গল্প। এখানে আমরা জানব আলাদা জনজাতির মানুষ আলাদা দেখতে হয় কেন?
আজ থেকে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) আফ্রিকা মহাদেশে উদ্ভব হয়। সেখান থেকে ধীরে ধীরে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে—ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মানুষকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের। সেই পরিবেশেই টিকে থাকার প্রয়োজনে মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে কিছু বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই আজ আমরা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে চেহারাগত পার্থক্য দেখতে পাই।
ত্বকের রঙের কথাই ধরা যাক। যেসব অঞ্চলে সূর্যের আলো খুব তীব্র, যেমন আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার বড় অংশ, সেখানে মানুষের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি। এই মেলানিন ত্বককে অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। অন্যদিকে ইউরোপ বা উত্তর এশিয়ার মতো অঞ্চলে সূর্যালোক তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে ফর্সা ত্বক ভিটামিন ডি উৎপাদনে সহায়ক হয়। অর্থাৎ ত্বকের রং কোনো সৌন্দর্যের মানদণ্ড নয়, এটি মূলত সূর্যালোকের সঙ্গে বহু বছরের অভিযোজনের ফল।
একইভাবে নাকের গঠন, চোখের পাতা, চুলের ধরন কিংবা দেহের গড়নও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। শীতল ও শুষ্ক অঞ্চলে লম্বা ও সরু নাক শ্বাস নেওয়া বাতাসকে ফুসফুসে পৌঁছানোর আগে উষ্ণ ও আর্দ্র করতে সাহায্য করে। গরম ও আর্দ্র অঞ্চলে চওড়া নাক বাতাসের চলাচল সহজ করে। পূর্ব এশিয়ার অনেক জনগোষ্ঠীর চোখে যে ভাঁজযুক্ত পাতা (epicanthic fold) দেখা যায়, সেটিও বরফ, তীব্র ঠান্ডা ও আলো থেকে চোখকে রক্ষার অভিযোজন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। চুলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য — আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে কুঞ্চিত চুল মাথার তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক, আবার শীতপ্রধান এলাকায় সোজা বা ঢেউখেলানো চুল উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এই সমস্ত পরিবর্তনের পিছনে কাজ করেছে প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection)। চেহারার বৈশিষ্ট্য যেমন চোখের রং, চুলের ধরন, মুখের গঠন — সবই জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোনও নির্দিষ্ট পরিবেশে যেসব শারীরিক বৈশিষ্ট্য মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে, সেগুলিই ধীরে ধীরে বেশি সংখ্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। যে জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন আলাদা এলাকায় থেকেছে, তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু জিন বেশি প্রচলিত হয়েছে। ফলে চেহারায় মিল দেখা যায়।
পাশাপাশি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রাচীনকালে পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি বা ঘন অরণ্যের কারণে এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ সীমিত ছিল। ফলে জিনের মিশ্রণ কম হয়েছে এবং আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। আধুনিক জিনগত গবেষণা প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর সব মানুষের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ এক। তথাকথিত “জাতি” বা “রেস”-এর মধ্যে যে জিনগত পার্থক্য আছে, তা একই জনগোষ্ঠীর দুই ব্যক্তির মধ্যকার পার্থক্যের থেকেও অনেক সময় কম। অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, মঙ্গোলয়েড — এই ধরনের শ্রেণিবিভাগগুলো মূলত ঐতিহাসিক ও সামাজিক নির্মাণ; এগুলোর শক্ত কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানুষ চেহারায় আলাদা হতে পারে, কিন্তু জৈবিকভাবে আমরা সবাই একই মানব পরিবারের সদস্য।
এই কারণে আধুনিক বিজ্ঞান আজ স্পষ্টভাবে বলে যে চেহারাগত পার্থক্যকে কখনোই বুদ্ধিমত্তা, সক্ষমতা, নৈতিকতা বা মানবিক গুণাবলির সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। মানুষের বৈচিত্র্য প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর দিক। ঠিক যেমন পৃথিবীতে নানা ধরনের ফুল, পাখি বা প্রাণী আছে, তেমনই মানুষের মধ্যেও আছে রঙ, গড়ন ও মুখাবয়বের বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য কোনও বিভাজনের কারণ নয়, বরং মানবজাতির দীর্ঘ অভিযোজন ও টিকে থাকার ইতিহাসের সাক্ষ্য।
সংক্ষেপে বলা যায়, আলাদা জনজাতির মানুষ আলাদা দেখতে হয় কারণ তারা হাজার হাজার বছর ধরে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বসবাস করেছে, সেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে তাদের শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়েছে, এবং সেই বৈশিষ্ট্যগুলো জিনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এই ভিন্নতার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি গভীর সত্য—মানুষ এক, মানবজাতি এক, আর আমাদের মিলই আমাদের পার্থক্যের চেয়ে অনেক বেশি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান