হঠাৎ ভয় পেলে আমাদের শরীর কেঁপে ওঠে। অন্ধকারে হঠাৎ শব্দ, কোন বিপদের আশঙ্কা বা আকস্মিক আতঙ্ক — এই সব পরিস্থিতিতে অনেকেরই হাত-পা কাঁপতে শুরু করে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শরীর যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই কাঁপুনি আসলে দুর্বলতার লক্ষণ নয়; এটি মানুষের শরীরের একটি প্রাচীন ও স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এখানে আমরা জেনে নেব ভয় পেলে শরীর কেঁপে ওঠে কেন?
ভয় পেলে মস্তিষ্কে কী ঘটে
ভয়ের অনুভূতি প্রথমে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (Amygdala) অংশে ধরা পড়ে। অ্যামিগডালা হল মস্তিষ্কের সেই অঞ্চল, যা বিভিন্ন অনুভূতিকে শনাক্ত করে। এই অ্যামিগডালা কোন বিপদ শনাক্ত করলে হাইপোথ্যালামাস অংশে বিপদ সঙ্কেত পাঠায়। হাইপোথালামাস যা মস্তিষ্কের কমান্ড সেন্টার নামে পরিচিত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার নির্দেশ দেয়। এই ধরণের পরিস্থিতিতে যুক্তিবোধের কেন্দ্র প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি শরীরকে সতর্ক করে তোলে। ফলে আমরা ভাবার আগেই শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায়।
‘Fight or Flight’ প্রতিক্রিয়া কী
ভয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর চালু করে দেয় তথাকথিত Fight or Flight Response। এটি একটি বিবর্তনগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা হাজার হাজার বছর আগে মানুষকে শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করত। এই প্রতিক্রিয়ায় শরীর হয় লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়, নয়তো দ্রুত পালানোর জন্য। এই প্রস্তুতির সময় শরীরে একাধিক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা কাঁপুনির মূল কারণ।
অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ এবং শরীর কাঁপা
ভয়ের মুহূর্তে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে হঠাৎ করে অ্যাড্রেনালিন হরমোন বা এপিনেফ্রিন (Epinephrine) নিঃসৃত হয়। এই হরমোন হৃদস্পন্দন বাড়ায়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত করে এবং পেশিতে অতিরিক্ত শক্তি পাঠায়। কিন্তু এই শক্তি যখন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার হয় না, তখন পেশিগুলো টানটান অবস্থায় থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে শুরু করে। এই কাঁপুনি মূলত শরীরের অতিরিক্ত উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ।
স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভয়ের সময় সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম (Sympathetic Nervous System) সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা শরীরকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে। এটি রক্তচাপ বাড়ায়, ঘাম সৃষ্টি করে এবং পেশিতে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এই হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিতে না পারলে স্নায়ু-পেশির সমন্বয় বিঘ্নিত হয়, ফলে হাত-পা বা পুরো শরীর কাঁপতে থাকে।
ভয় কেটে গেলে কাঁপুনি থামে কেন
বিপদ কেটে গেলে শরীর ধীরে ধীরে প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম (Parasympathetic Nervous System) সক্রিয় হয়, যা শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। তখন অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা কমতে থাকে এবং পেশিগুলো শিথিল হয়। এই পর্যায়ে অনেক সময় হালকা কাঁপুনি আবারও দেখা যায়, যা আসলে শরীরের জমে থাকা উত্তেজনা বের করে দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
এটি কি মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ
ভয় পেলে শরীর কাঁপা কোনভাবেই মানসিক দুর্বলতা বা সাহসহীনতার চিহ্ন নয়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, জৈবিক এবং বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি প্রতিক্রিয়া। সাহসী ও অভিজ্ঞ মানুষদের ক্ষেত্রেও বিপদের মুহূর্তে একই শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, কারণ এটি ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণে নয়।
ভয় পেলে শরীর কেঁপে ওঠা আসলে আমাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থারই অংশ। অ্যামিগডালা থেকে শুরু করে অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ ও স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা —সব মিলিয়ে শরীর নিজেকে রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়। এই কাঁপুনি ভয় পাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং বিপদের মুখে মানুষের শরীরের এক অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ। আশা করি বোঝা গেল, ভয় পেলে শরীর কেঁপে ওঠে কেন? বিজ্ঞানের এই ধরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক বা “কেন” বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে এখানে দেখুন। আর আপনার মাথায় এরকম কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান