বিবিধ

পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থাগার যা আজও খোলা পাঠকদের জন্য

জ্ঞানচর্চার বাহন হিসেবে বই আর লাইব্রেরী দুটোই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আমাদের কাছে। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গ্রন্থাগার প্রবন্ধটি অনেকেরই পড়া আছে। সেই যে মহাসমুদ্রের শত বছরের কল্লোলকে কে যেন একটা ঘরের মধ্যে বেঁধে রেখেছে, ভাষা যেখানে চুপ করে আছে। কিন্তু কেউ কি ভেবেছি আমরা যে এই গ্রন্থাগার ঠিক কবে প্রথম স্থাপিত হয়? একেক জায়গার ইতিহাস একেক রকম হবে ঠিকই, কিন্তু ঐতিহাসিকদের মতে আলেকজান্দ্রিয়াতেই প্রথম রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার গ্রন্থাগার স্থাপন করেন প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। আবার অনেকে মনে করেন অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের আশুরবানিপালের গ্রন্থাগারই সবথেকে প্রাচীন গ্রন্থাগার। এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ প্রবল। ঐ দ্বন্দ্বের মধ্যে না গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থাগার (world’s oldest working library) হিসেবে আজও চলে আসছে আল-কারাওয়াইইন গ্রন্থাগার যা কিনা মধ্যযুগীয় এক মুসলিম নারীর প্রতিষ্ঠিত। মরক্কোর ফেজ শহরের বুকে প্রতিষ্ঠিত এই আল-কারাওয়াইইন গ্রন্থাগার ঐ অঞ্চলের মানুষের কাছে গর্ব এবং লুপ্ত ঐতিহ্যের স্মারক।

৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজ শহরে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল আল-কারাওয়িইইন নামে আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরের মধ্যেই একাধারে ছিল একটি মসজিদ, একটি প্রার্থনাকক্ষ এবং একটি অসাধারণ গ্রন্থাগার। মধ্যযুগের মধ্য-প্রাচ্যে এক মুসলিম নারী ফতিমা-আল-ফিহ্‌রি তৈরি করেছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগারটি। নবম শতাব্দীর মরক্কোয় সেসময় ইদ্রিশ রাজাদের শাসনকাল চলছিল। ঐতিহাসিকদের মতে রাজা দ্বিতীয় ইদ্রিশ মরক্কোর ফেজ শহরটি গড়ে তোলেন। তার পরে পরেই আজ থেকে প্রায় বারোশো বছর আগে ফতিমা-আল-ফিহ্‌রি এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন। কে ছিলেন এই ফতিমা? তিউনিশিয়ার কারাওয়াইইন শহরের এক অভিজাত ধনাঢ্য উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মেয়ে ফতিমা-আল-ফিহ্‌রি। তাঁর পরিবার নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফেজ শহরে চলে আসে থাকার জন্য আর সেই সময় তাঁর বাবা এবং ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যান্য সকল পুরুষ সদস্যের মৃত্যু হলে ফতিমা আর তাঁর বোন মরিয়ম একা হয়ে পড়েন। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন দুই কন্যাকেই যথাযথ উচ্চশিক্ষিত করে তুলবেন, কিন্তু সেই ইচ্ছাপূরণের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে ফতিমা এবং মরিয়ম পারিবারিক প্রভূত সম্পত্তির মালিকানা পান এবং তা অন্যত্র ব্যবহার না করে সেই টাকা দিয়ে একটি শিক্ষায়তন চালু করার কথা ভাবেন ফতিমা। তাঁর ইচ্ছেতেই ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে ওঠে, গড়ে ওঠে এর অভ্যন্তরস্থ গ্রন্থাগার আর প্রার্থনাকক্ষটিও। প্রথমদিকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরান সহ অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ানো হতো। ফতিমা-আল-ফিহ্‌রি নিজেও এখানে পরবর্তীকালে পড়াশোনা করে ডিপ্লোমা অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়। এখনো গ্রন্থাগারে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর ডিপ্লোমার শংসাপত্রটি দেখতে পাওয়া যায়। এত প্রাচীন হওয়ার সুবাদে এর গ্রন্থাগারে এখনও নবম শতাব্দীর কোরান বা দশম শতাব্দীর সময়কার হজরত মহম্মদের জীবনী রয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে চার হাজারটিরও বেশি দূর্লভ দুষ্প্রাপ্য ঐতিহাসিক বই। ইবন খালদুনের লেখা ‘মোকদ্দমা’ আর অ্যাভারোজের লেখা ইসলামি আইন সংক্রান্ত বইয়ের পাণ্ডুলিপিও রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। এমনকি দেখা গেছে নবম শতাব্দীর ‘কুফিক’ হরফে লেখা কোরানটি আজও সেই একইভাবে উটের চামড়ায় বাঁধানো অবস্থায় রয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় বিখ্যাত মরমী কবি এবং দার্শনিক ইবন-আল-‘আরাবি এখানে পড়াশোনা করেছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীতে। ঐতিহাসিক এবং অর্থনীতিবিদ ইবন খালদুন চতুর্দশ শতাব্দীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ফলে এ প্রসঙ্গে একটা তথ্য মনে রাখতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়টি ৮৫৯ সালে চালু হলেও আল- কারাওয়াইয়িন লাইব্রেরীটি চালু হয় ১৩৫৯ সালে।

এই লাইব্রেরীটির সঙ্গে দুজন মহিলার নাম জড়িয়ে আছে ওতপ্রোত। প্রথমজনের কথা আগেই বলা হয়েছে স্থপতি ফতিমা-আল-ফিহ্‌রি আর দ্বিতীয়জন হলেন আজিজা চাওনি যিনি ২০১২ সালে মরক্কোর সংস্কৃতি-মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই গ্রন্থাগার পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব পান। আজিজা ছিলেন একজন মরক্কো-কানাডীয় স্থপতি। গ্রন্থাগার পুনরুদ্ধারের সময় জানা যায় যে তার নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে ফেজ নদী। ফলে বইয়ের সংরক্ষণে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে ভেবে আজিজার পরিকল্পনায় মাটির নীচে একটি খাল খনন করা হয় যার ফলে নদীর গতিপথ বদলে যায়। সোলার প্যানেল, জলের রিজার্ভার ইত্যাদি টেকসই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রন্থাগারটির একেবারে নতুন রূপ দিয়েছেন আজিজা। প্রাচীনকালে এখানে শুধুমাত্র গবেষক এবং উৎসাহী পাঠকরাই প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু এখন সেই নিয়ম তুলে দিয়ে গ্রন্থাগারের দরজা সমস্ত সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। একটা সংগ্রহশালা এবং একটা ক্যাফে তৈরি করা হয়েছে এখানে। শুধু বাইরের সজ্জা-বিন্যাসই নয়, এই গ্রন্থাগারের বইগুলির ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগও নিয়েছেন আজিজা যাতে পাণ্ডুলিপিগুলি আন্তর্জাল মাধ্যমেও অনায়াসে পাওয়া যায়। ইউনেস্কোর বিচারে এটিই এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থাগার যেটি এখনও কার্যকর অবস্থায় আছে।

২০১৬ সালে এই আল-কারাওয়াইয়িন লাইব্রেরী সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় পুনরুদ্ধারের পরে। একটা পাঠকক্ষ, সভাঘর, একটি পাণ্ডুলিপি পুনরুদ্ধারের পরীক্ষাগার এবং একটি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের পৃথক সম্ভার এই সব নিয়েই নতুনভাবে সেজে উঠেছে পৃথিবীর প্রাচীনতম এই লাইব্রেরী।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।