হাইফা যুদ্ধ (Battle of Haifa) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত হওয়া একটি বিখ্যাত যুদ্ধ। এই যুদ্ধটি কেবল একটি শহর দখল বা কৌশলগত বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল অশ্বারোহী বাহিনীর শৌর্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সনাতন রণকৌশলের এক বিরল সমাহার। ব্রিটিশ বাহিনী পরিচালিত এই যুদ্ধ সিনাই এবং ফিলিস্তিন অভিযানের একটি অংশ ছিল। ১৯১৮ সালের এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ ভূমধ্যসাগরের কাছে অবস্থিত মাউন্ট কারমেলের পাদদেশে সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে একদিকে ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর যোধপুর, মহীশূর ও হায়দ্রাবাদ ল্যান্সার বাহিনী আর অন্যদিকে ছিল অটোমান তুর্কি ও জার্মান বাহিনী। এই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল হাইফা বন্দর নগরীকে অটোমান বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করে ব্রিটিশদের দখলে আনা।
সাম্প্রতিক পোস্ট
হাইফা যুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনারা বর্শা ও তরবারিসহ ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র ব্যবহার করে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অটোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ভারতীয় অশ্বারোহী সৈন্যরা এই যুদ্ধে বীরত্বের অনন্য নির্দশন তুলে ধরেছিল। সমস্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তারা এই যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধে ব্রিটিশদের এই বাহিনীকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘হাইফার নায়ক’ দলপত সিং শেখাওয়াত। ইতিহাসে এই যুদ্ধ অশ্বারোহী বাহিনীর শেষ দিকের সফল আক্রমণগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এই যুদ্ধ অটোমান বাহিনীর দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, যদিও এই যুদ্ধ তাদের পতনের একমাত্র কারণ ছিল না। এই যুদ্ধের সেনাদের বীরত্বপূর্ণ কীর্তি এবং সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানাতে প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর ‘হাইফা দিবস’ পালন করা হয়।
১৯১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হাইফা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ব্রিটিশ ভারতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর ১৫তম ইম্পেরিয়াল সার্ভিস ক্যাভালরি ব্রিগেডের সঙ্গে অটোমান ও জার্মান সেনাবাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধ হয়েছিল। এই ব্রিগেডের মধ্যে ছিল মাইসোর, জোধপুর এবং হায়দরাবাদ ল্যান্সার্স। তবে মূল আক্রমণে জোধপুর ও মাইসোর ল্যান্সাররা প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে সেই সময় ভারতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর ১৫ তম ইম্পেরিয়াল সার্ভিস ক্যাভালরি ব্রিগেডের মধ্যে ছিল মহীশূর, যোধপুর এবং হায়দরাবাদ ল্যান্সার্স। এছাড়া এই বাহিনীগুলিকে ভাবনগর, জামনগর, বরোদা, ইদর প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যের বাহিনী সহায়তা করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কৌশলগতভাবে ব্রিটিশদের কাছে হাইফা দখল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা এই বন্দর দখল করতে পারলে ব্রিটিশরা ভূমধ্যসাগরের দিক থেকে সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারত। এছাড়া ওই এলাকা প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে হাইফার উপর আক্রমণ করা সহজ ছিল না। হাইফার কাছে মাউন্ট কারমেলের খাড়া পাথুরে ঢালে অটোমান এবং জার্মান সৈন্যরা মেশিনগান এবং কামান নিয়ে সর্বদা সতর্ক পাহাড়া দিত। সেখান থেকে তারা শহরে প্রবেশের পথগুলির উপর নজর রাখতে পারত, ফলে হাইফা একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহে পরিণত হয়েছিল।
এছাড়া হাইফা যুদ্ধের অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বাহাই ধর্মের নেতা আব্দুল-বাহাকে (Abdul Baha) মুক্ত করা। পারস্যে বাহাই ধর্মের উৎপত্তি হয় উনবিংশ শতাব্দী নাগাদ। রক্ষণশীল খিলাফত অটোমান শাসকদের বিরোধী এই ধর্ম উদারনৈতিক মতাদর্শ প্রচার শুরু করে, ফলে দ্রুত এই ধর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় আব্দুল-বাহার জনপ্রিয়তাকে অটোমান শাসকরা ভয় পেতে শুরু করে। এই কারণে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের শাসনামলে আব্দুল-বাহাকে নির্বাসিত করা হয় ও পরবর্তীকালে তাঁকে হাইফাতে বন্দী করে রাখা হয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের কাছে এই আব্দুল-বাহার নিরাপত্তা এক মানবিক ও কৌশলগত বিষয় ছিল। তারা আব্দুল-বাহার মতো সম্মানিত ধর্মগুরুকে নিরাপত্তা দিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছিল। এই কারণে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত হাইফা দখলের পরিকল্পনা করে।
১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ১৫তম ইম্পেরিয়াল সার্ভিস ক্যাভালরি ব্রিগেডকে হাইফা দখল করার আদেশ দেয়। এরপর ওই ব্রিগেডের যোধপুর ল্যান্সার, মহীশূর ল্যান্সাররা চারিদিক থেকে আক্রমণ করা শুরু করে। এই অভিযানে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যোধপুর ল্যান্সার বাহিনীর প্রধান মেজর দলপত সিং শেখাওয়াত।
মাউন্ট কারমেল পাহাড়ের ঢাল বেশি হওয়ায় অটোমান ও জার্মান সেনারা নিশ্চিন্ত ছিল যে, ঘোড়া নিয়ে এই রাস্তায় ভারতীয় সৈনিকেরা উঠে আসতে পারবে না। কিন্ত সেই সময় ব্রিটিশদের গোলন্দাজ বাহিনী পাহাড়ের এক দিক থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। আর তখন ধীরে ধীরে ঘোড়া নিয়ে মহীশূর ল্যান্সার্স বাহিনী মাউন্ট কারমেল পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের উপর থাকা কামানগুলোকে অকেজো করা, যাতে তারা নীচের যোধপুর ল্যান্সার্সদের উপর হামলা করতে না পারে। তবে কিশন নদীর তীরের জলাভূমি এবং চোরাবালির কারণে ব্রিটিশ ভারতের অশ্বারোহী বাহিনী প্রথমে সমস্যার মধ্যে পড়েছিল। ঘোড়াগুলো কাদা ও বালিতে আটকে যাওয়ায় তারা তুর্কি মেশিনগানারদের নজরে পড়েছিল। এই রকম পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনারা খানিকটা বাম দিকে সরে গিয়ে মাউন্ট কারমেল পাহাড়ের উপরে ওঠে। এই সময় তুর্কিদের মেশিনগানের গুলিতে মেজর দলপত সিং শেখাওয়াত শহীদ হন। তারপর ক্যাপ্টেন আমান সিং যোধপুর ল্যান্সার বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এমনকি ভারতীয় সেনারা হাইফা যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছিল, যাতে অন্য কেউ অটোমান, জার্মান সেনাদের সাহায্য করতে না পারে।
এরপর রাঠোর রাজপুতদের নিয়ে গঠিত যোধপুর ল্যান্সার্সের বি স্কোয়াড্রন তুর্কিদের উপর আক্রমণ করে ও বহু সেনাকে হত্যা করে। সেই সময় অশ্বারোহী সৈন্যরা বর্শা ও তরোয়াল ব্যবহার করে মেশিনগান সজ্জিত বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। তারা ২৩ সেপ্টেম্বর হাইফা থেকে অটোমান তুর্কি ফৌজকে হটিয়ে দেয় এবং শহরটি দখল করে। অন্যদিকে চারিদিক থেকে চাপের মুখে তুর্কি বাহিনী দামেস্কের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং অনেকে আক্রে অঞ্চলের দিকে পালানোর চেষ্টা করে।
অটোমান, জার্মান সেনাবাহিনীর পরাজয়ের পর হাইফা শহরে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনারা প্রায় ১,৫০০ তুর্কি, জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান সৈন্যকে বন্দী করেছিল। এছাড়া এই যুদ্ধে প্রায় ৪৪ জন ভারতীয় অশ্বারোহী সৈন্য হতাহত হয়েছিল। এছাড়া অশ্বারোহী বাহিনীর অনেক ঘোড়াও মারা গিয়েছিল।
এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে শুধু যে ব্রিটিশরা হাইফা দখল করতে পেরেছিল তা নয় বরং হাইফায় ভারতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর এই জয় ব্রিটিশবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ওই ঘটনার কিছু দিনের মধ্যেই নিকটবর্তী আক্রে শহরের উপরেও নিয়ন্ত্রণ হারায় অটোমান তুর্কিরা। এর ফলে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মিত্র বাহিনী সহজে ভূমধ্যসাগরের দিক থেকে পশ্চিম এশিয়ায় হাতিয়ার, গোলা-বারুদ এবং রসদ পাঠাতে শুরু করেছিল। এই জয়ের পর মিত্রবাহিনী সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করে। এছাড়া এই যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ভারতীয় সৈন্যদের দক্ষতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
হাইফা যুদ্ধের বীর সৈন্যদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। যোধপুর ল্যান্সার্সের মেজর দলপত সিংহ (মরণোত্তর), সগত সিংহ এবং ক্যাপ্টেন অনুপ সিংহকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানজনক ‘মিলিটারি ক্রস’ পদক দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ব্রিটিশরা দলপত সিং শেখাওয়াতকে হাইফার নায়ক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৬১তম ক্যাভালরি রেজিমেন্ট যোধপুর, মহীশূর, গোয়ালিয়র, পাতিয়ালা এবং অন্যান্য দেশীয় রাজ্যের অশ্বারোহী ইউনিটগুলোর উত্তরসূরি হিসেবে তাদের ঐতিহ্য ও বীরত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এই রেজিমেন্টটি বিশ্বজুড়ে বিরল, সক্রিয় অশ্বারোহী ইউনিটগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখনও প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর এই যুদ্ধের সাহসী সৈনিকদের স্মরণ করে হাইফা দিবস পালন করা হয়। মহীশূর ল্যান্সারদের বীরত্ব উদযাপন করে বেঙ্গালুরুর জেসি নগরে অবস্থিত মহীশূর ল্যান্সার্স মেমোরিয়াল-এ সকালবেলায় ‘হাইফা দিবস’ পালন করা হয়। এছাড়া হাইফা এবং জেরুজালেমে ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল। অন্যদিকে নয়াদিল্লির বিখ্যাত ‘তিন মূর্তি চক’-এর নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তিন মূর্তি হাইফা চক’ নাম দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইফা যুদ্ধ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করে নেয়। ১৯২৩ সালে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। হাইফা অঞ্চলটি ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে আসে, যেখানে পরবর্তীকালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে ইসরায়েল সরকার হাইফা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভারতীয় সৈন্যদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলের হাইফা বন্দর পরিচালনার সঙ্গে ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির সংস্থাও যুক্ত রয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান