সববাংলায়

ইন্ডিয়া গেট

বিভাগঃ ,

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইন্ডিয়া গেট (India Gate) এমন এক স্মৃতিস্তম্ভ বা যুদ্ধ স্মারক, যেখানে খোদিত রয়েছে একটি জাতির বীরদের আত্মত্যাগের অপূর্ব নিদর্শন। ইন্ডিয়া গেটকে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম যুদ্ধ স্মৃতিসৌধ হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বহু ব্রিটিশ স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শহীদ ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণে একটি বিজয় তোরণ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছিল। ইন্ডিয়া গেট শুধু রণাঙ্গনে যুদ্ধরত বীরদের শৌর্যের সাক্ষ্য হিসেবেই নয়, বরং সময়ের স্রোতে ভারতের যাত্রার প্রতীক হিসেবেও দাঁড়িয়ে আছে। এই গেটের পূর্ব নাম ছিল ‘অল ইন্ডিয়া ওয়ার মেমোরিয়াল’। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক ‘রাজপথ’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কর্তব্য পথ’ রাখা হয়েছে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তির প্রতীক এবং জনসাধারণের সেবার দায়িত্ববোধকে তুলে ধরে ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন নামকরণ করেন। ইন্ডিয়া গেটের স্থাপত্যের উপর সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্যরশ্মির এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে আসেন।

ইন্ডিয়া গেট কোথায়

ভারতের নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থল ও কর্তব্য পথের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ইন্ডিয়া গেট। এই স্মৃতিসৌধের কাছেই রয়েছে ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল এবং রাষ্ট্রপতি ভবন।

ইন্ডিয়া গেটের ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াই করে প্রাণ হারানো ৭৪,১৮৭ সৈনিকের স্মৃতি ও গৌরবময় আত্মত্যাগকে অমর করে রাখতে ইন্ডিয়া গেট স্থাপন করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে অল ইন্ডিয়া ওয়ার মেমোরিয়াল হিসেবে এটি নির্মিত হয়।

নতুন দিল্লি শহরের পরিকল্পনাকারী স্যার এডউইন লুটিয়েন্স (Sir Edwin Lutyens) ইন্ডিয়া গেটের নকশা তৈরি করেন। তাছাড়া স্যার শোভা সিং ইন্ডিয়া গেট নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯২১ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার তৃতীয় পুত্র ডিউক অফ কনট এই স্থাপত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর নির্মাণ কাজ শেষের পর ১৯৩১ সালে ইন্ডিয়া গেটের উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া সেই বছরই নতুন দিল্লির উদ্বোধন হয়। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইন এই স্মৃতিস্তম্ভটি জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন।

১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বীর শহীদদের স্মরণে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের তোরণের নীচে ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’ নামে একটি কালো মার্বেল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। ১৯৭২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এর উদ্বোধন করেন।

ইন্ডিয়া গেটের গঠনশৈলী

ইন্ডিয়া গেটের ষড়ভুজাকৃতি মূল চত্বরটি প্রায় ৩,২৯০,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মূল আয়তাকার ইন্ডিয়া গেটের কাঠামোটি প্রায় ১৩৮ ফুট উঁচু। এই স্মৃতিসৌধটির উপর প্যারিসের আর্ক ডি ট্রায়োম্ফের (Arc de Triomphe) ও রোমের কনস্ট্যান্টাইনের (Arch of Constantine) তোরণের প্রভাব লক্ষ করা যায়। স্থাপত্যটি নির্মাণ করার জন্য রাজস্থানের ভরতপুরের লাল ও হলুদ বেলেপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ইন্ডিয়া গেটের দেয়ালে প্রায় ১৩, ৫০০ সৈনিকের নাম খোদাই করা আছে, যার মধ্যে কিছু ব্রিটিশ সৈনিক এবং অফিসারের নামও রয়েছে। কোন বিশেষ দিনে তেল দিয়ে জ্বালানোর জন্য এখানে একটি অগভীর গম্বুজাকৃতির বাটি তৈরি করা হয়েছিল, তবে এটি খুব একটা ব্যবহৃত হয়নি। ইন্ডিয়া গেটের কাঠামোটি আয়তাকার (oblong) আকৃতির। এর চারটি দিকেই একটি করে বৃহৎ খিলানপথ রয়েছে, তবে দীর্ঘ দিকগুলির খিলানগুলি তুলনামূলকভাবে বেশি উঁচু ও বড়। ছোট দিকগুলির খিলানগুলির নিচের অংশ বন্ধ করে সেখানে প্রবেশদ্বার তৈরি করা হয়েছে, যদিও উপরের অংশ খোলা রাখা হয়েছে। স্থাপত্যবিদ্যার পরিভাষায়, এই চারটি খিলানের কারণে ইমারতটিকে একটি টেট্রাপাইলন (tetrapylon) বলা যায়।

ছোট দিকগুলির খিলানের বন্ধ নিচের অংশের উপরে পাথরের তৈরি একটি বৃহৎ অলংকরণ স্থাপন করা হয়েছে। খিলানগুলির উত্থানস্থলের উচ্চতা বরাবর পুরো স্থাপত্যকে ঘিরে অলংকরণমূলক ছাঁচনির্মিত ব্যান্ড বা মোল্ডিং (moulding) রয়েছে। খিলানগুলির শীর্ষস্থ কেন্দ্রীয় পাথর বা কীস্টোন (keystone) সামান্য বাইরে বেরিয়ে আছে। ছোট দিকের খিলানগুলির কীস্টোনের উপরের অংশ দীর্ঘ দিকের বৃহত্তর খিলানগুলির ভিত্তিস্থ মোল্ডিংয়ের নিচের অংশকে স্পর্শ করেছে।

এছাড়া খিলানগুলির ছাদ ও অভ্যন্তরীণ নিচের অংশে সমান দূরত্বে বিন্যস্ত কোফার (coffer) বা খোপযুক্ত অলংকরণ করা হয়েছে, যা স্থাপত্যটিকে আরও নান্দনিক ও শৈল্পিক সৌন্দর্য প্রদান করেছে

ইন্ডিয়া গেটের তোরণের উপরে উভয় পাশে বড় করে ‘INDIA’ শব্দটি লেখা আছে। আর এই ইন্ডিয়ার বাম পাশে রোমান সংখ্যা MCMXIV ও ডান পাশে MCMXIX লেখা আছে। এখানে MCMXIV মানে ১৯১৪ এবং MCMXIX মানে ১৯১৯ সাল। INDIA শব্দটির নিচে বড় হাতের অক্ষরে বিশ্বযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণে একটি বিশেষ উৎসর্গ বার্তা খোদাই করা রয়েছে। সেখানে লেখা আছে ফ্রান্স, ফ্ল্যান্ডার্স, মেসোপটেমিয়া, পারস্য, পূর্ব আফ্রিকা, গ্যালিপোলি, দূর প্রাচ্যের অন্যান্য স্থানে বীরত্ব প্রদর্শনে প্রাণ হারানো ভারতীয় সেনাদের উদ্দেশ্যে এটি নিবেদিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে নিহত সৈনিকের মধ্যে ১২,৩৫৭ জন ভারতীয় সৈনিকের নাম লিপিবদ্ধ আছে। এই স্মৃতিসৌধে খোদিত সব নাম সরাসরি খুঁজে বের করা সহজ নয়, তবে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন ওয়েবসাইটে ওই নামগুলি দেখা যায়। এখানে সেনাদের নাম ছাড়াও সৈনিকদের মৃত্যুর তারিখ, ইউনিটের নাম, রেজিমেন্ট ও ইন্ডিয়া গেটের কোন স্থানে তাঁর নাম খোদাই করা আছে ও অন্যান্য তথ্য পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সৈন্যদের স্মরণ করে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের তোরণের নিচে ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’-তে চারটি শিখা স্থাপন করা হয়েছিল। এই শিখাগুলি প্রায় পঞ্চাশ বছর নিরন্তর জ্বলত। এখানে একটি কালো মার্বেল বেদির মাঝে আছে একটি উল্টানো রাইফেল এবং তার উপর যুদ্ধের হেলমেট। এটি পরবর্তীকালে জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সালে অমর জওয়ান জ্যোতির শিখাটির কাছাকাছি অবস্থিত ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালের সাথে এই জ্যোতিকে একীভূত করা হয়।

ইন্ডিয়া গেটের পূর্ব দিকে বর্তমান কর্তব্য পথ বরাবর প্রায় ১৫০ মিটার দূরত্বে ছয়টি রাস্তার সংযোগস্থলে ৭৩ ফুট উঁচু একটি ছাউনি বা ক্যানোপি রয়েছে। এই ছাউনিটি সপ্তম শতাব্দীর মহাবলীপুরমের একটি মণ্ডপ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। একসময় এই ক্যানোপির নিচে ব্রিটেনের রাজা পঞ্চম জর্জের একটি মূর্তি ছিল, যা এখন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারপর এখানে প্রথমে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হোলোগ্রাফিক প্রতিকৃতি ও পরবর্তীকালে গ্রানাইটের এক স্থায়ী মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

বলা হয় যে, এই ইন্ডিয়া গেটের নির্মাণকাজে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা ছিল। এখানকার প্রধান বাধা ছিল নির্মাণস্থলের কাছের আগ্রা-দিল্লি রেললাইন। এই রেললাইন পরবর্তীকালে যমুনা নদীর দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া বিশাল এই স্থাপত্যে নির্মাণ করাও ছিল যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। তবে সতর্ক পরিকল্পনা এবং টেকসই উপকরণের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত এই স্থাপত্যটি তৈরি করা হয়েছিল।

জনজীবনে ইন্ডিয়া গেটের প্রভাব

কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানগুলিতে ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইন্ডিয়া গেটে সেনাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। তবে বর্তমানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনীর প্রধানরা প্রজাতন্ত্র দিবসসহ অন্যান্য বিশেষ দিনে জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। ইন্ডিয়া গেটে প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বিভিন্ন দল, ট্যাঙ্ক, সেনার জমকালো গাড়ি, অস্ত্রশস্ত্রকে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হতে দেখা যায়। সেনার পাশাপাশি লোকনৃত্যশিল্পীরা এই কুচকাওয়াজে যোগ দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটিতে একটি সাংস্কৃতিক ছোঁয়া যোগ করে।

পূর্ব দিকে মুখ করা কর্তব্য পথের শেষে অবস্থিত ইন্ডিয়া গেটের তোরণের মধ্য দিয়ে সরাসরি ভেতরে এসে সূর্যরশ্মি এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে। দিগন্তে অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে ইন্ডিয়া গেটের দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন। উষ্ণ আলোয় স্নাত অন্ধকার নেমে আসা আকাশের পটভূমিতে এই স্মৃতিস্তম্ভটি এক নতুন রূপ ধারণ করে। এই সময় পর্যটকরা ইন্ডিয়া গেটকে এক অনন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পান। এছাড়া সন্ধ্যায় রঙিন আলো দিয়ে সুসজ্জিত করা হয় ইন্ডিয়া গেট। এই স্মৃতিসৌধের আশেপাশে প্রচুর সুন্দর সবুজ গাছপালা রয়েছে। এই স্থান পিকনিক ও ভ্রমণের জন্য বেশ জনপ্রিয়। আর এইসব কারণে বর্তমানে দিল্লির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইন্ডিয়া গেট। তবে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের মূল স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় এখন কঠোর নিরাপত্তার কারণে সাধারণের অবাধ যাতায়াত এবং গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আলোকচিত্রপ্রেমীদের জন্য ইন্ডিয়া গেট ছবি তোলার এক চমৎকার স্থান। এই স্থানটি প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে, তবে সন্ধ্যাবেলা এই স্থাপত্য দেখতে সবচেয়ে বেশি মানুষের ভিড় হয় । এছাড়া সারা বছর ধরে এই এলাকাটি খাদ্য উৎসব, ম্যারাথন এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে মুখরিত থাকে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।