প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরী করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। তবে কিছু দিন গুরুত্বের নিরিখে দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার দাবি রাখে। সেই দিনগুলি কোনো নির্দিষ্ট দেশে নয়, গোটা বিশ্বে সমমর্যাদায় সমান গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়ে থাকে। তেমনই একটি দিবস হল বিশ্ব মশা দিবস (World Mosquito Day)।
প্রতি বছর ২০ আগস্ট সারা পৃথিবী জুড়ে বিশ্ব মশা দিবস পালন করা হয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ ডাক্তার স্যার রোনাল্ড রস আজকের দিনেই ম্যালেরিয়া রোগের বাহক যে স্ত্রী মশকী তা আবিষ্কার করেন। তাঁর এই আবিষ্কারের স্মৃতি রক্ষার্থে সারা পৃথিবী জুড়ে আজকের দিনটি বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
ম্যালেরিয়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে অত্যন্ত গুরুতর একটি সমস্যা ছিল আর তাই এর উৎস বা কিভাবে এটি ছড়ায় তা জানা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। ১৮৯৭ সালে স্যার রোনাল্ড রস মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণের সঙ্গে স্ত্রী মশকীর যোগাযোগের বিষয়টি জনসমক্ষে আনেন। তিনি দেখান যে, ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী পরজীবীটি স্ত্রী মশকীর শরীরে বাসা বাঁধে। সেই পরজীবি বাহক স্ত্রী মশকীর কামড়ে মানুষ অথবা অন্য প্রাণীর ম্যালেরিয়া হয়। অর্থাৎ স্ত্রী মশকী ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী নয়, এটি হলো ম্যালেরিয়ার বাহকমাত্র।
তাঁর এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানকে প্রভূত উন্নতির দিশা দেখায়। একইসঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতার দিকে নজর দেওয়ার বিষয়টিও সমধিক গুরুত্ব পায়। এই আবিষ্কারের পরেই স্যার রোনাল্ড রস সারা বিশ্বে ২০ আগস্ট দিনটিকে বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে উদযাপন করার কথা বলেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা মনে রাখার জন্য এবং সারা বিশ্বে ম্যালেরিয়ার সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে এই দিনটিকে বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয় হয়।
১৯৩০ এর দশক থেকে দ্য লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন (The London School of Hygiene and Tropical Medicine) প্রতি বছর বিশ্ব মশা দিবস উদযাপন করে থাকে। এই বিশেষ দিনটিতে ম্যালেরিয়ার কারণ, কিভাবে তার প্রতিরোধ করা যায় সেই সংক্রান্ত জনসচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি ম্যালেরিয়া দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার স্বার্থে তহবিল উত্থাপন (Fund Raising) করা হয়ে থাকে। এই দিনের ঘোষণা এবং সারা বিশ্বে এর উদযাপনের মাধ্যমে স্যার রোনাল্ড রস এবং অন্য বিজ্ঞানী যাঁরা এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানো হয়।
এই দিনটি গোটা বিশ্বের মানুষ নানানভাবে পালন করে থাকেন যার মূলে থাকে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করার এবং ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার কেন্দ্রীয় ধারণা। এই দিনটিতে ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ইত্যাদির আয়োজন করা হয়ে থাকে। দ্য লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন প্রতি বছর বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী, পার্টি, ক্যাম্পেনের ব্যবস্থা করে। এই অনুষ্ঠানগুলির মাধ্যমে আয়োজকরা ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় যেতে চলেছেন এমন ব্যক্তিদের অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ভ্যাক্সিন নিতে উৎসাহ দেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এই ধরণের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের বিষয়ে ক্যাম্পেন করা হয়।
সাধারণ মানুষ যে যে ভাবে এই দিনটিকে উদযাপন করতে পারেন তার একটি বিস্তারিত তালিকা নীচে দেওয়া হলো:
দরিদ্র মানুষদের মধ্যে মশারি বা কুইনাইন (Quinine) ওষুধ বিতরণ করার জন্য একটি তহবিল উত্থাপন করা যেতে পারে।
ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় যেতে চলেছেন এমন ব্যক্তিদের কি ধরণের সতর্কতা নেওয়া উচিৎ সেই সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে।
ম্যালেরিয়া ছাড়া মশারা আর কি কি ধরণের রোগ ছড়ায় সে সম্পর্কে মানুষজনকে সচেতন করা যেতে পারে।
মশা যাতে বসবাসযোগ্য এলাকায় বংশবিস্তার করতে না পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ তা বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে।
সারা বিশ্ব জুড়ে ম্যালেরিয়া বা মশাবাহিত যেকোন রোগের প্রতিকারের জন্য যে সার্বিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তাতে সাধ্যমত অংশগ্রহণ করা যেতে পারে।
ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত পরিসরে এই নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও জনমত গড়ে তোলা যায়।
প্রত্যেক বছরই এই দিনটি বিশ্বজুড়ে একটি নির্দিষ্ট থিম বা প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। ২০১৯ সালে কোন নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য না থাকলেও ২০২০ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ম্যালেরিয়া (malaria)। ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ম্যালেরিয়া শূন্য পৃথিবীর লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া (Reaching the Zero Malaria Target)। ২০২২ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ম্যালেরিয়া রোগটিকে নির্মূল করে এবং প্রাণ রক্ষার তাগিদে নতুন উদ্ভাবনের চেষ্টা করা Harness innovation to reduce the malaria disease burden and save lives.)। ২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য – মশা: বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ঘাতক (Fighting the World’s Deadliest Killer – the Mosquito)। ২০২৪ সালের প্রতিপাদ্য – সুস্থ এক পৃথিবীর জন্য ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে জোরদার করা (Accelerating the fight against malaria for a more equitable world)।
এইভাবেই প্রতি বছর ২০ আগস্ট সারা পৃথিবীতে বিশ্ব মশা দিবস পালন করা হয়ে থাকে। এই দিনটি একদিকে যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত আবিষ্কারের সাফল্যের উদযাপন, তেমনই এই দিনটিকে সামনে রেখে ম্যালেরিয়া তথা মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করার জন্য মানুষকে সচেতন করার একটি সার্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে এবং মানুষের সচেতনতার জন্য পৃথিবী মশাবাহিত রোগ থেকে দ্রুত মুক্তি পাবে হবে এমন আশা করা অবাস্তব হবেনা বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান