বিখ্যাত আমেরিকান উদ্যোক্তা এবং বিশ্বখ্যাত রোলফিল্ম প্রস্তুতকারক ‘কোডাক’ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ইস্টম্যান (George Eastman)। ছবি তোলার ক্ষেত্রে রোল ফিল্মের ব্যবহারকে বাণিজ্যিক স্তরে একেবারে মূলধারায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি। একজন বিখ্যাত সমাজসেবক হিসেবে ইস্টম্যান স্কুল অফ মিউজিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তাছাড়া রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুলস অফ ডেন্ট্রিস্ট্রি অ্যান্ড মেডিসিনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতিতে প্রভূত সহায়তা করেছেন তিনি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণেই ‘ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি’ সমগ্র বিশ্বে একটি বহুজাতিক কর্পোরেশন হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং তার ফলে জর্জ ইস্টম্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী শিল্পপতিতে পরিণত হন।
১৮৫৪ সালের ১২ জুলাই নিউ ইয়র্কের ইউটিকার দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়াটারভিল গ্রামে জর্জ ইস্টম্যানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জর্জ ওয়াশিংটন ইস্টম্যান এবং মায়ের নাম মারিয়া কিলবার্ন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার রোচেস্টারের বাইরে মুমফোর্ডের গিনিস কান্ট্রি মিউজিয়াম-এ চলে আসে। জর্জের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর বাবা পরিবার নিয়ে রোচেস্টারে আসেন এবং সেখানেই বহু পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ইস্টম্যান কমার্শিয়াল কলেজ গড়ে তোলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বাবা মারা যান। ফলে একইসঙ্গে এই কলেজ গড়ার কাজও অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং তাঁর পরিবার আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে জর্জের বোন কেটিও পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮৭০ সালে মারা যান।
স্কুলে ভর্তি হলেও ১৪ বছর বয়সেই পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন জর্জ ইস্টম্যান। তাঁকে প্রথমে কেউই বিশেষ প্রতিভাধর বলে মনে করতে চাননি, কিন্তু একদিকে তাঁর বিধবা মা আর দুই বোনের ভরণ-পোষণের জন্যেই পড়াশোনা ছেড়ে তাঁকে চাকরি খুঁজতে হয়েছিল।
১৪ বছর বয়সে একটি বীমা কোম্পানিতে একজন অফিস বয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন জর্জ ইস্টম্যান। সেই সময় সপ্তাহে ৩ ডলার বেতন ছিল তাঁর। পরে আরেকটি বীমা কোম্পানিতে তিনি কাজ করতে শুরু করেন সাপ্তাহিক ৫ ডলার বেতনে। এই বীমা কোম্পানিতে কাজের জন্য ঘরে বসে হিসাবশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে শুরু করেন জর্জ। এর পাঁচ বছর পরে ১৮৭৪ সালে স্থানীয় রোচেস্টার সেভিংস ব্যাঙ্কে সাপ্তাহিক ১৫ ডলার বেতনে কাজে যোগ দেন তিনি।
২৪ বছর বয়সে সান্টো ডোমিঙ্গোতে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। তাঁর এক সহকর্মী তাঁকে এই ভ্রমণের সব মুহূর্ত রেকর্ড করার পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শেই জর্জ ইস্টম্যান সমস্ত ধরনের ফটোগ্রাফিক সরঞ্জাম কিনে ফেলেন। সেই সময় ভেজা প্লেটে প্যারাফার্নেলিয়া সহযোগে ছবি ওয়াশ করা হত, এ সবই কিনেছিলেন জর্জ। তাঁর ক্যামেরাটি ছিল মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মত বড় এবং সেটাকে বসানোর জন্য একটি ভারী ট্রাইপডের প্রয়োজন ছিল। একটি তাঁবুও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে জর্জ কাচের প্লেটে তিনি ফটোগ্রাফিক দ্রবণ ছড়িয়ে দিতে পারেন ছবিগুলি নিষ্কাশনের আগে। এরপরে নিষ্কাশিত (Exposed) ছবিগুলিকে পরিমার্জিত (Develop) করার পরিকল্পনাও তাঁর ছিল। কিছু রাসায়নিক, কাচের ট্যাঙ্ক, একটি ভারী প্লেট ধারক এবং এক জগ জল ছিল সেই তাঁবুতে। মাত্র ৫ ডলারের বিনিময়ে কীভাবে ছবি তুলে দিতে হয়, তা এইভাবেই শিখেছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। সান্টো ডোমিঙ্গোতে তাঁর আর যাওয়া হয়নি, কিন্তু ফটোগ্রাফি চর্চায় তিনি একেবারে ডুবে গেলেন। এত জটিল ছবি তোলার পদ্ধতিটিকে সরল করে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। ব্রিটিশ পত্রিকায় তিনি পড়েছিলেন যে, চিত্রগ্রাহকেরা তাঁদের নিজেদের মত করে জিলেটিন দ্রবণ তৈরি করছিলেন সেই সময়। এই দ্রবণ প্লেটের উপর ছড়িয়ে দিলে ধীরে সুস্থে ছবি পরিমার্জিত করা সম্ভব। এইসব ব্রিটিশ পত্রিকার একটি ফর্মুলা অনুসরণ করেই জর্জ ইস্টম্যান জিলেটিন দ্রবণ তৈরি করতে শুরু করেন। দিনের বেলায় তিনি ব্যাঙ্কে কাজ করতেন আর রাত্রে বাড়িতে তাঁর মায়ের রান্নাঘরে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে জামা-কাপড় না ছেড়েই রান্নাঘরের উনুনের পাশেই শুয়ে পড়তেন তিনি। দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জর্জ ইস্টম্যান নিজের একটি ফর্মুলা তৈরিতে সমর্থ হন। ১৮৮০ সাল নাগাদ তিনি একইসঙ্গে একটি শুষ্ক প্লেট ফর্মুলা তৈরি করেন এবং অনেকগুলি প্লেট একত্রে তৈরি করার একটি বড় যন্ত্র নির্মাণের পেটেন্টও অর্জন করেন। অন্যান্য চিত্রগ্রাহকদের কাছে এই শুষ্ক প্লেট তৈরি করে বিক্রি করার কথা মাথায় আসে জর্জের।
১৮৭৯ সালে ফটোগ্রাফি ও ব্যবসার জগতের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু ছিল লন্ডন। প্লেট-কোটিং যন্ত্রের পেটেন্ট পাওয়ার জন্য লন্ডনেই গিয়েছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। এর পরের বছর একটি আমেরিকান পেটেন্টও পান তিনি। ১৮৮০ সালের এপ্রিল মাসে রোচেস্টারের স্টেট স্ট্রিটে একটি বাড়ির তিনতলার অংশটি লীজ নেন এবং শুষ্ক প্লেট তৈরি করে বিক্রি করা শুরু করেন। ১২৫ ডলার মূল্যের একটি সেকেন্ড-হ্যান্ড ইঞ্জিন কিনেছিলেন তিনি প্রথমে। সেই সময় মাত্র ১ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন হলেই তাঁর কাজ চলে যেত, কিন্তু তাঁর মনে হয়ে হয়েছিল ব্যবসা যদি বড় হয় তখন ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতাও বাড়াতে হতে পারে। জর্জের এই শুষ্ক প্লেট বিক্রির ব্যবসায়িক পরিকল্পনা পছন্দ হয়ে যায় হেনরি এ স্ট্রং-এর এবং হেনরি তাঁর ব্যবসায় কিছু টাকা লগ্নি করেন। ১৮৮১ সালের ১ জানুয়ারি জর্জ ইস্টম্যান এবং হেনরি স্ট্রং ‘ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট কোম্পানি’ নামে একটি অংশীদারি ব্যবসা চালু করেন। ঐ বছরই শেষ দিকে ইস্টম্যান ব্যাঙ্ক থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যবসাতে মনোনিবেশ করেন। ব্যবসার উন্নতি করার পাশাপাশি ফটোগ্রাফির পদ্ধতিকে কীভাবে আরও সহজ করে তোলা যায়, সে চেষ্টাও নিরন্তর চালিয়ে যান তিনি। ১৮৮৪ সালে জর্জ ইস্টম্যান ও হেনরি স্ট্রং-এর অংশীদারিত্বেই একটি নতুন ফার্ম গড়ে তোলা হয় ‘দ্য ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট অ্যান্ড ফিল্ম কোম্পানি’ নামে যেখানে মোট ১৪ জন শেয়ার-মালিক ছিলেন। ক্রমেই ১৮৮৯ সালে তৈরি হয় ‘দ্য ইস্টম্যান কোম্পানি’। ১৮৯২ সাল থেকে এই কোম্পানিটি ‘ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি’ নামে পরিচিত হতে শুরু করে। প্রথমে নিউ ইয়র্কে এই কোম্পানি চালু হলেও পরে ১৯০১ সালে নিউ জার্সিতেও এই কোম্পানিটি চালু হয়। মূলত চারটি প্রাথমিক নীতির উপর ভিত্তি করে জর্জ ইস্টম্যান তাঁর এই ব্যবসাকে দাঁড় করিয়েছিলেন। যেমন – ক্রেতার প্রতি বিশেষ মনোযোগ, কম খরচে অনেক বেশি উৎপাদন, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি এবং প্রভূত বিজ্ঞাপন। প্রথম থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্রেতার চাহিদা ও আশা পূরণ করতে না পারলে কর্পোরেট সাফল্য পাওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বিক্রয়কারীদের হাতে কোনও কোনও প্লেট নষ্ট হয়ে গেলে জর্জ ইস্টম্যান সেগুলি বদলে নতুন ও ভাল মানের প্লেট আবার তাদের দিয়ে দেন। শুধু প্লেট তৈরিই নয়, ক্যামেরা ব্যবহার সরলীকরণের জন্যেও নানাবিধ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন জর্জ। এমনকি ছবি তোলার ক্ষেত্রে কাচের তুলনায় হাল্কা ও নমনীয় বস্তু ব্যবহারের চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তাছাড়া কাগজের উপর ফটোগ্রাফিক দ্রবণটি ছড়িয়ে তারপর রোল-ধারকের মধ্যে সেই কাগজ ঢুকিয়েও ছবি তোলার চেষ্টা করেছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। ১৮৮৩ সালের দিকে রোল ফিল্ম তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন জর্জ যা তাঁর ব্যবসাকে এক অন্য মাত্রা দেয়। ক্রমেই রোল-ধারকের সাহায্যে ছবি তোলার পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠল। একেবারে নিখুঁত স্বচ্ছ রোল ফিল্ম প্রস্তুতি এবং রোল হোল্ডারের সাহায্যে ছবি তোলার ধারণার মধ্য দিয়ে শৌখিন ফটোগ্রাফির জগতে বিপ্লব ঘটান তিনি। ১৮৮৮ সালেই জর্জ ইস্টম্যান তৈরি করেন ‘কোডাক ক্যামেরা’। এই ক্যামেরায় আগে থেকেই একশটি ছবি তোলার জন্য ফিল্ম ভরা থাকত এবং এটি বহন করার পক্ষেও খুব হাল্কা ছিল। একেবারে প্রথমে এর দাম ছিল মাত্র ২৫ ডলার। একবার ছবি তোলা হয়ে গেলে তা রোচেস্টারে নিয়ে আসতে হত ক্রেতাদের এবং সেখানেই ফিল্ম পরিমার্জিত করা ও নতুন ফিল্ম পুনরায় ক্যামেরায় ঢুকিয়ে দেওয়া হত মাত্র ১০ ডলারের বিনিময়ে। তিনি তাঁর কোম্পানিতে কর্মচারীদের লভ্যাংশ (Wage Dividend) দেওয়াও শুরু করেন।
একজন বিখ্যাত সমাজসেবক হিসেবে ইস্টম্যান স্কুল অফ মিউজিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তাছাড়া রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুলস অফ ডেন্ট্রিস্ট্রি অ্যান্ড মেডিসিনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জর্জ ইস্টম্যান। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতিতে প্রভূত সহায়তা করেছেন তিনি
১৯৩০ সালে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ কেমিস্টস গোল্ড মেডেলে ভূষিত হন জর্জ ইস্টম্যান। ১৯৫৪ সালের ১২ জুলাই মার্কিন ডাক বিভাগ নিউ ইয়র্কের রোচেস্টারে তাঁর ছবি দিয়ে একটি স্মারক স্ট্যাম্প প্রকাশ করে। ১৯৬৬ সালে জর্জ ইস্টম্যানের বাড়িটি জাতীয় ঐতিহাসিক দিক নির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৪০-এর দশকে তাঁর জীবন অবলম্বনে একটি জীবনীচিত্র নির্মিত হয়।
১৯৩২ সালের ১৪ মার্চ নিজের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন জর্জ ইস্টম্যান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান