সববাংলায়

মুকেশ আম্বানি

ভারতের একজন বিখ্যাত ধনকুবের ব্যবসায়ী তথা ‘রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি (Mukesh Ambani)। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ব্লুমবার্গ বিলিওনেয়ার সূচক অনুযায়ী বিশ্বের সবথেকে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি দশম স্থানে আছেন। তাছাড়া বর্তমানে তিনি সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সবথেকে ধনী ব্যক্তি। বাজার মূল্যের দিক থেকে তাঁর রিলায়েন্স কোম্পানি ভারতের সবথেকে মূল্যবান কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত। তাঁর বাবা ধীরুভাই আম্বানির বস্ত্র শিল্পের প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে ক্রমে টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থা, পেট্রোকেমিক্যাল ইত্যাদি নানা খাতে ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করেন তিনি। শুধুমাত্র নিজের জন্যেই নয়, কোম্পানির কর্মচারী এবং তাঁর কোম্পানির অংশীদারি-ধারকদের সম্পদ বৃদ্ধিতেও প্রভূত সহায়তা করেছেন তিনি। ভারতের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি আজও এক জীবন্ত কিংবদন্তী।

১৯৫৭ সালের ১৯ এপ্রিল অ্যাডেনের (অধুনা ইয়েমেন) ব্রিটিশ ক্রাউন কলোনিতে মুকেশ আম্বানির জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল মুকেশ ধীরুভাই আম্বানি। তাঁর বাবা বিখ্যাত ভারতীয় ব্যবসায়ী ধীরুভাই আম্বানি এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল কোকিলাবেন আম্বানি। তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম অনিল আম্বানি এবং তাঁর আরও দুই বোন ছিল যাঁদের নাম যথাক্রমে নীনা ভদ্রশ্যাম কোঠারি এবং দীপ্তি দত্তরাজ সালগাওনকার। ইয়েমেনে তাঁর জন্ম হলেও খুব বেশি দিন তিনি সেখানে কাটাননি। ১৯৫৮ সালে তাঁর বাবা ধীরুভাই আম্বানি ভারতে ফিরে আসেন পরিবার নিয়ে। মূলত তাঁর ইচ্ছে ছিল ভারতে এসে মশলাপাতি ও পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবসা করবেন। সেই থেকেই ধীরুভাই আম্বানি তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত ‘ভিমল’ (Vimal) কোম্পানি যার পরে নামকরণ হয় ‘ওনলি ভিমল’। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার মুম্বাইয়ের ভূলেশ্বরে একটি দুই কামরার ঘরে বসবাস করত। ভারতে এসে ব্যবসা শুরু করার পরে তাঁদের আর্থিক অবস্থা একটু সচ্ছল হয়। ক্রমে তাঁদের এই সংস্থা ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের দুনিয়ায় আমূল পরিবর্তন ঘটায়। যদিও পরে ধীরুভাই আম্বানি তাঁর পরিবারের জন্য কোলাবায় একটি ১৪ তলা বাড়ি কিনেছিলেন যেখানে বর্তমানে মুকেশ আম্বানি ও তাঁর ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালে নীতা আম্বানিকে বিবাহ করেন মুকেশ এবং তাঁদের দুই পুত্র যথাক্রমে আকাশ ও অনন্ত এবং এক কন্যা ঈশা।  

মুম্বাইয়ের পেডার রোডে হিল গ্রেঞ্জ হাই স্কুলে পড়াশোনা সম্পন্ন হয় মুকেশ আম্বানির। সেই স্কুলে তাঁর ভাই অনিল আম্বানিও একইসঙ্গে পড়াশোনা করতেন এবং সেখানেই মুকেশের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে আনন্দ জৈনের সঙ্গে। মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে মুম্বাইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন মুকেশ আম্বানি। তারপর ‘ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল টেকনোলজি’ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বি.ই ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তারপরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ পড়তে ভর্তি হলেও ১৯৮০ সালেই বাবাকে সাহায্য করার জন্য পড়া ছেড়ে দেন মুকেশ। সেই সময় ধীরুভাই আম্বানি ‘রিলায়েন্স’ সংস্থাটি গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় খুবই ক্ষুদ্র ব্যবসা ছিল এটা, কিন্তু খুব দ্রুত এই কোম্পানি বেড়ে উঠছিল। ধীরুভাই আম্বানি বুঝতে পেরেছিলেন যে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই কেবলমাত্র কাজের দক্ষতা বাড়ান সম্ভব। তাই ক্লাসে বসে নয়, তাঁর ছেলে মুকেশ আম্বানিকে তিনি স্ট্যানফোর্ড ছেড়ে ভারতে এসে ব্যবসার হাল ধরতে বলেন। কোম্পানির সুতো তৈরির এক নতুন প্রকল্পের দায়িত্ব নেন মুকেশ আম্বানি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধ্যাপক উইলিয়াম এফ শার্প এবং মনমোহন শর্মা প্রভূত প্রভাবিত করেছেন মুকেশ আম্বানিকে। তাঁদের সাহায্যেই অন্য ধরনের চিন্তা করতে শিখেছিলেন মুকেশ।

১৯৮১ সালে তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা ‘রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ সংস্থাটির পরিচালনায় বাবার পাশাপাশি সাহায্য করতে শুরু করেন মুকেশ আম্বানি। এই সময়ের মধ্যে তৈল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের পরিকাঠামোও তৈরি হয়ে গিয়েছিল কোম্পানিতে। তাছাড়া ব্যবসার মধ্যে অঙ্গীভূত ছিল খুচরো পণ্য ও টেলি-যোগাযোগ শিল্পের পণ্য ও পরিষেবাও। এই ব্যবসারই একটি শাখা হিসেবে গড়ে ওঠে ‘রিলায়েন্স রিটেইল লিমিটেড’ যা পরে ভারতের সবথেকে বড় খুচরো পণ্য বিক্রেতায় পরিণত হয়। ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রিলায়েন্স কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘জিও’ (Jio) নামের নতুন একটি টেলি-যোগাযোগ মাধ্যম বাজারে আসে আর তার ফলে ভারতের টেলি-যোগাযোগ ব্যবসার চেহারাটাই বদলে যায়। ক্রমে অন্যান্য সংস্থাগুলি বসে যেতে থাকে এবং সমগ্র ভারত জুড়ে ‘জিও’ সংস্থার বিপুল বিস্তৃতি মুকেশ আম্বানিকে অদ্বিতীয় করে তোলে। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মুকেশ আম্বানি ছিলেন বিশ্বের ৩৬তম ধনী ব্যক্তির স্থানে। বিগত দশ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ‘ফোর্বস’ পত্রিকা ভারতের সবথেকে ধনী ব্যক্তির খেতাব ধরে রেখেছেন। ফোর্বস পত্রিকার সমীক্ষায় ভারতের একমাত্র ব্যবসায়ী হিসেবে তিনিই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ২০২০ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ফোর্বস পত্রিকার পরিসংখ্যানে মুকেশ আম্বানি ছিলেন বিশ্বের ষষ্ঠ ধনী ব্যক্তি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে আলিবাবা গ্রুপের চেয়ারম্যান জ্যাক মা’কে ছাড়িয়ে মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪৩ কোটি ডলার যার ফলে এশিয়ার সবথেকে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে বাকি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। চিনের হুরুন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুসারে ২০১৫ সালের মধ্যে মুকেশ আম্বানি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত সমাজসেবীদের মধ্যে পঞ্চম ব্যক্তি। পরবর্তীকালে ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকার একজন পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি এবং তিনিই ছিলেন এই ব্যাঙ্কের বোর্ডের প্রথম অ-আমেরিকান সদস্য। রিলায়েন্সের মধ্য দিয়েই মুকেশ আম্বানি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের ফ্র্যাঞ্চাইজি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মালিকানা অধিকার করেন এবং ইন্ডিয়ান সুপার লিগ নামে একটি ফুটবল দলও তৈরি করেন তিনি। ২০১২ সালে ফোর্বস পত্রিকা তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া মালিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বর্তমানে তিনি যে বাড়িতে থাকেন তার নাম ‘অ্যান্টিলিয়া বিল্ডিং’ এবং এই বাড়িটি তৈরি করতে হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর অধীনে ভারত সরকার বেসরকারি খাতে পিএফওয়াই (PFY) অর্থাৎ পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতো উৎপাদন করতে শুরু করে। সেই সময় ধীরুভাই আম্বানি এই সুতো তৈরির জন্য একটি কারখানা স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন সরকার বৃহৎ আকারের উৎপাদনকে সীমায়িত করতে শুরু করেছিল। তাছাড়া অনুমতি পাওয়ার জন্য সরকারি মহলে দলবাজিও হত। এমনকি সরকারের নীতির ফলে সুতো আমদানি করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ব্যবসার কাজে মুকেশ আম্বানি যখন সাহায্য করতে স্ট্যানফোর্ড ছেড়ে ভারতে এসেছিলেন, সেই সময় মুকেশের প্রধান দায়িত্ব ছিল অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের জন্য এবং পণ্যের গুণমান বৃদ্ধির জন্য কাঁচামাল সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে কোম্পানির আয়ত্তে নিয়ে আসা। ১৯৮৬ সালে ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যু হলে মুকেশ আম্বানি গড়ে তোলেন ‘রিলায়েন্স ইনফোকম লিমিটেড’ যা পরে রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্স লিমিটেড নামে পরিচিত হয়। ২৪ বছর বয়সে মুকেশ আম্বানি পাতালগঙ্গা পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট স্থাপনের দায়িত্ব পান। সেই সময় রিলায়েন্স কোম্পানির একটি শাখা হিসেবে তৈল শোধনাগার ও পেট্রোকেমিক্যাল ক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করছিল।

২০০২ সালের জুলাই মাসে ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যু হলে মুকেশ আম্বানি ও অনিল আম্বানির মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বিরাট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সেই সময় ধীরুভাই কোনও উইল করে যাননি। মুকেশের মা কোকিলাবেন এই বিরোধ থামাতে হস্তক্ষেপ করেন এবং সমগ্র রিলায়েন্স কোম্পানিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ইন্ডিয়ান পেট্রোকেমিক্যালস কর্পোরেশন লিমিটেডের দায়িত্ব পান মুকেশ আম্বানি। ২০০৫ সালে এই বিভাজন বম্বে উচ্চ আদালত দ্বারা অনুমোদিত হয়। ভারতের জামনগরে মুকেশ বিশ্বের বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম শোধনাগার নির্মাণকার্যে নির্দেশনা ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০১০ সালে যেখানে প্রতিদিন ৬ লক্ষ ৬০ হাজার ব্যারেল তৈল শোধনের ক্ষমতা ছিল অর্থাৎ বছরে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টন। পরে এই উৎপাদনের সঙ্গে জুড়ে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর ও এই সংক্রান্ত নির্মাণকার্য। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মোহালিতে প্রগতিশীল পাঞ্জাব সম্মেলনে মুকেশ আম্বানি প্রথম ভারতী এয়ারটেল সংস্থার সঙ্গে একত্রিত হয়ে যৌথভাবে ভারতে একটি ফোর-জি নেটওয়ার্ক স্থাপনের কথা বলেন। ২০১৪ সালের ১৮ জুন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ৪০তম বার্ষিক সাধারণ সভায় আগামী তিন বছরের জন্য মোট ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করার প্রতিশ্রুতি দেন মুকেশ আম্বানি এবং একইসঙ্গে ২০১৫ সালের মধ্যে সমগ্র ভারত জুড়ে ফোর-জি ব্রডব্যান্ড পরিষেবা চালু করবেন স্থির করেন।

তৈল শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যবসায়িক দক্ষতার জন্য ২০১৬ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আম্বানির নেতৃত্বেই ভারতে ‘জিও লাইফ’ (Jio LYF) নামে প্রথম ফোর-জি পরিষেবা সহ একটি স্মার্টফোন বাজারে নিয়ে আসে। ২০১৮ সালের ব্লুমবার্গের রবিনহুড সূচক অনুসারে বলা হয় সেই সময় মুকেশ আম্বানির ব্যক্তিগত সম্পদ দিয়ে টানা কুড়ি দিন ভারতের ফেডারেল সরকারের কাজকর্ম চলে যেতে পারত। যদিও ২০১৪ সালে কেজি বেসিন থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগে মুকেশ আম্বানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সরকার।

২০১০ সালে বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধি পান তিনি। ঐ বছরই ‘ফিনান্সিয়াল ক্রনিকল’ তাঁকে ‘বিজনেসম্যান অফ দ্য ইয়ার’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও ‘বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর পক্ষ থেকে মুকেশ আম্বানি ‘গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পান। ২০১৬ সালে ‘কেমিক্যাল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ মুকেশ আম্বানিকে ওথমার স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।

বর্তমানে মুকেশ আম্বানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদে আসীন।     


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading