ইতিহাস

জালালউদ্দিন রুমি

জালালউদ্দিন রুমি

ইতিহাস বিখ্যাত একজন পার্সি কবি তথা সুফি দার্শনিক, ধর্মযাজক এবং আইনজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন জালালউদ্দিন রুমি (Jalalad-Din Mohammad Rumi)। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় জালালউদ্দিন রুমির আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনদর্শন সর্বধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে রাজনৈতিক সীমানা পার করে বিশ্বের সকল দেশে সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। সমগ্র বিশ্বসাহিত্য জালালউদ্দিন রুমির সৃষ্টির দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর লেখা ‘মসনবী’ ফার্সি ভাষায় লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। রুমির লেখা প্রেমের কবিতাগুলি পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। রুমি শুধুমাত্র ইরানে নয়, আমেরিকারও সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি হিসেবে উল্লেখিত। জালালউদ্দিন রুমি ছাড়াও তিনি মাওলানা রুমি কিংবা মৌলবী রুমি নামেও সমানভাবে পরিচিত।

১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এক ফার্সি পরিবারে জালালউদ্দিনের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মুহাম্মদ বিন আল হুসাইন আল খতিবি আল বালখি আল বাকরি (Muhammad bin al-Husayn al-Khatibi al-Balkhi al-Bakri)। কিন্তু তিনি জালাল উদ্দিন মহম্মদ রুমি বা জালাল উদ্দিন মহম্মদ বালখি নামেই বেশি পরিচিত। আবার তিনি ‘রুমি’ নামেও বেশি পরিচিত ইংরেজদের মধ্যে। ‘রুমি’ ও ‘বালখি’ এই দুটি আরবি শব্দ তাঁর জাতিগত পরিচয় বহন করে থাকে। ইতিহাসবিদদের মতে, বালখি এবং রুমি শব্দ দুটি প্রাচীন রোমের বাইজ্যানটাইন প্রদেশের অধিবাসীদের বলা হয়ে থাকে। মনে করা হয় রুমির পূর্বপুরুষ আনাতোলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কারণ সেই সময়ে আনাতোলিয়ায় জন্মগ্রহণ করা বা সেই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষরা ‘রুমি’ নামে পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও  তিনি ইরানে ‘মাওলানা’ ও তুরস্কে ‘মেভলানা’ নামে এবং ‘মোল্লা ই রুম’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা  বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ ও আইনজ্ঞ। রুমির মা মুমিনা খাতুন ছিলেন একজন ইসলাম ধর্মপ্রচারক পরিবারের কন্যা। রুমির জন্ম হয় তাজাকিস্তানের বলখ শহরের ভাখশ নদীর তীরে ‘ওয়াখশ’ নামে একটি গ্রামে যা বর্তমানে আফগানিস্তানে অবস্থিত। সেই সময়ে বলখ ছিল পারস্য সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র ও সুফিবাদ বিকাশের মূলকেন্দ্র। এই বলখ শহরের আরও দুজন বিখ্যাত ফার্সি কবি ছিলেন আত্তার ও সানাই যাদের প্রভাব পড়েছিল রুমির জীবনে। 

রুমির বাবা বাহাউদ্দিন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, অতীন্দ্রিয়বাদী এবং সুফিবাদী হওয়ায় তাঁর ঈশ্বরের প্রতি আধ্যাত্মিক সমর্পণের ভাব রুমির জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাঁর বাবার অণুপ্রেরণায় ও উৎসাহে রুমির শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটেছিল। রুমির বাবা বাহাউদ্দিন একটি মাদ্রাসার প্রধান হওয়ার কারণে রুমির ইসলামশাস্ত্রে জ্ঞানার্জন করার সুযোগ ঘটে শৈশবেই। ১২১৯ সালে রুমির এগারো বছর বয়সে মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়া আক্রমণ করলে রুমির বাবা তাঁর পরিবার ও  কিছুসংখ্যক অনুসারীদের নিয়ে বলখ্ ছেড়ে এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দশ বছর যাবৎ বাহাউদ্দিন তাঁর পরিবার নিয়ে এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন প্রান্ত ও আরবে ভ্রমণ করেন। রুমির পরিবার মক্কার উদ্দেশ্যে ভ্রমণকালে যখন নিশাপুরে অবস্থান করছিলেন, সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত সুফি কবি আত্তারের দেখা হয়। তাঁদের দেখা হওয়ার পরে আত্তার রুমি সম্পর্কে ভবিষৎবাণী করেন এই বলে যে, সে একদিন ভালোবাসার দ্বারা মানুষের অন্তরের দ্বার উদঘাটন করবে। মক্কা থেকে রুমির পরিবার দামাস্কাসে এসে উপস্থিত হলে তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ইনবুল আরবির সঙ্গে রুমির দেখা হয়। তিনি রুমিকে দেখে তাঁর গভীরতাকে সাগরের সঙ্গে তুলনা করেন। দশ বছর এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করার পরে ১২২৯ সালে রুমির বাবা কোনিয়ার সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদের দ্বারা আমন্ত্রিত হন এবং কোনিয়ায় একটি বিদ্যাপীঠে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। তিরমিজ নামে রুমির বাবার এক শিষ্যের কাছে ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা, সুফিধর্মের ঐতিহ্যবাহী আইনি বিধি অধ্যয়ন করেন রুমি। তিরমিজের পরামর্শ অনুসারে রুমি পুনরায় দামাস্কাসে গিয়ে অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যোর্তিবিদ্যা, আরবি ও ফারসি ভাষা, ব্যাকরণ ও কোরানের বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করে কোনিয়ায় ফিরে আসেন। আঠারো বছরে বয়সে রুমি সমরখন্দের এক অমাত্যের কন্যা গওহর খাতুনকে বিবাহ করেন এবং সুলতান ওয়ালাদ ও আলাউদ্দিন তিলবি নামে তাঁদের দুই পুত্রসন্তান হয়।

১২৩১ সালে রুমির  বাবার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকারি হিসেবে  মাদ্রাসার মৌলবী হিসেবে দায়িত্ব নেন পঁচিশ বছর বয়সে। এই সময়ে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাবের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাঁর শিক্ষা ও ধর্মপরায়ণতা তাঁকে তরুণ পণ্ডিত, বাগ্মী হয়ে সুনাম অর্জন করতে সাহায্য করে। রুমির বিশ্বাস ছিল সঙ্গীত, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর পথ সুগম হয়। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সঙ্গীত ভক্তদের বার্তা দেন, তাঁদের সমগ্র সত্তাকে ঈশ্বরে সমর্পণ করার জন্য। ১২৪৪ সালে রুমির দেখা হয় তাবরিজ শামসের সঙ্গে। তারবিজ আদপে ছিলেন একজন প্রবীণ ভ্রমণকারী ও আধ্যাত্মিক গুরু যিনি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছিলেন উপযুক্ত শিষ্যের সন্ধানে। শামসের সঙ্গে রুমির সাক্ষাৎ মানবজীবনের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। শামস তাঁর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা, আধ্যাত্মিক প্রেম ও জীবনের প্রতি গভীর আত্মোপলব্ধি দান করার জন্য একজন নির্ভীক, স্বচ্ছমনা এবং দৃঢ়চেতা শিষ্যের সন্ধান করেছিলেন যা তিনি রুমির মধ্যে দেখতে পান। শামস রুমিকে তাঁর অধ্যাত্মবাদে দীক্ষিত করেন এবং সমগ্র ইসলামের তথা মানবজাতির কল্যাণের কাজে রুমিকে নিয়োজিত করেন। তাঁর উপস্হিতি রুমির জীবনে এমন এক পরিবর্তন আনে যা রুমি সারাজীবন তাঁর রচনার মাধ্যমে প্রকাশ করে গিয়েছেন। শামস ও রুমি  ঐশ্বরিক প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন যা অনেকটাই সূর্য ও পৃথিবীর মতো একে অন্যকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনীয় ছিল।

রুমির রচনাগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলিকে চতুষ্পদী শ্লোক ও গজল এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয় এবং গদ্যগুলিতে ধর্ম-উপদেশ, প্রবন্ধ ও পত্র এই তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। ‘মসনবী’ হল ফার্সি ভাষায় লেখা রুমির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। এটি পঞ্চাশ হাজার পংক্তি বিশিষ্ট ছয় ভাগে বিভক্ত ফার্সি সুফি আধ্যাত্মিক ভাবধারায় রচিত একটি কবিতাসমগ্র। সুফিবাদের এই সর্বশ্রেষ্ঠ রচনাটিতে বর্ণনা আছে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রেমের পথ অনুসরণ করার শিক্ষা। কোরান থেকে এবং প্রাত্যহিক নানা ঘটনা থেকে নেওয়া একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে ইসলামিক জ্ঞান বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ‘মসনবী’তে। রুমি তাঁর জীবনের শেষদিকে এটি রচনা করেন। ইরানে কোরাণের পরই সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে রুমির এই কাব্যগ্রন্থ সমাদৃত হয়। ‘মসনবী’ ছাড়া  রুমির জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ হল তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু শামস তাবরিজির সম্মানে রচিত ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই তাবরিজি’। এটি ৯০টি গজল, ৩৫ হাজার ফার্সি উদ্ধৃতি নিয়ে রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। ‘মাজালেস ই সাব’-এ রুমি ফার্সি ভাষায় সাতটি ধর্মোপদেশ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই গ্রন্থটিতে রুমির জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী আত্তার, সানাইয়ের মতো কবিদের উদ্ধৃতি রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রুমি তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাঁরই সংকলন রয়েছে ‘ফিহি মা ফিহি’ গ্রন্থে। এটি রুমির মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যরা সংকলন করেন। ‘মাকাতিব’ গ্রন্থটি একটি চিঠির সংকলন। রুমি তাঁর শিষ্যদের, পরিবারের ও রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যে চিঠিগুলি লিখেছিলেন, সেই সব চিঠিই সংকলন করা হয়েছে ‘মাকাতিব’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থটির মাধ্যমে জানা যায় রুমি তাঁর শিষ্যদেরকে পরিচালনা করতে এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বপালনে কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন। রুমির রচিত কাব্যগ্রন্থ ও গজলগুলি সারা পৃথিবীতে বহু মানুষকে প্রভাবিত করে আজও।

রুমির জীবনদর্শন ও রচনা জাতিধর্ম নির্বিশেষে শান্তির বাণী পৌঁছে দিয়ে সকলকে একসঙ্গে থাকার জন্য দিকনির্দেশ দেয়। রুমির রচিত কবিতাগুলি রুশ, জার্মান, উর্দু, তুর্কি, আরবি, বাংলা ও ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। ইংরেজ কবি কোলম্যান বার্কস রুমির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেছেন যা বিশ্বের বহু পাঠক পড়েছেন এবং তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মার্কিন লেখক দীপক চোপড়া রুমির প্রেমের  কবিতাগুলিকে অনুবাদ করেছেন যা থেকে বিশ্ববিখ্যাত পপ সঙ্গীতশিল্পী ম্যাডোনা গান রচনা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবির সম্মান লাভ করেছেন জালালউদ্দিন রুমি। রুমির কবিতার রেকর্ডিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ডে শীর্ষ কুড়ির মধ্যে স্থান অর্জন করে। রুমির রচিত গজল বা কবিতাগুলি গির্জা, উপাসনালয়, জৈন সমাবেশে বা পশ্চিমা সংস্কৃতির কোনো সমাবেশে শোনা যায়। রুমির রচনাগুলি সুফিবাদের শ্রেষ্ঠ দর্শন যা পশ্চিমের দেশগুলিতেও সমানভাবে জনপ্রিয়। উত্তর ভারতের লক্ষৌতে একটি স্থাপত্য আছে যা ‘রুমি গেট’ নামে পরিচিত। ভারতের বিখ্যাত কবি নজরুল ইসলামও রুমির রচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ইরানের সর্বশ্রেষ্ঠ কবির সম্মান লাভ করেছেন জালালউদ্দিন রুমি।

১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে অধুনা তুর্কীর কোয়েনাতে জালালউদ্দিন রুমির মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালে রুমির আদর্শ ও ধারণার উপরে গবেষণায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যে  ইউনেস্কো রুমির আটশোতম মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি পদক সম্মান হিসেবে বিতরণ করা শুরু করে। একই বছরে ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে ‘আন্তর্জাতিক রুমি বর্ষ’ ঘোষণা করে। ২০০৭ সালে ইরানে ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর অবধি ‘রুমি সপ্তাহ’ পালন করা হয় তাঁর আটশোতম মৃত্যুবার্ষিকীতে।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন