এই বিশাল মহাবিশ্বে যেমন অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে, তেমনই সেই নক্ষত্রের চারপাশে আবর্তনকারী অসংখ্য গ্রহও রয়েছে। এমন কিছু কিছু মহাজাগতিক বস্তুপিণ্ড রয়েছে যা এইসব গ্রহগুলির চারপাশে আবর্তন করে যাকে উপগ্রহ বলা হয়। পৃথিবীর মাটি থেকে রাতের আকাশে সবথেকে কাছে সাদা উজ্জ্বল চাঁদকে আমরা দেখতে পাই। এই চাঁদকেই পৃথিবীর উপগ্রহ বলে আমরা জানি। আমাদের সৌরজগতে আটটি গ্রহেরও এমন এক বা একাধিক উপগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও অনেক উপগ্রহ রয়েছে যেগুলি মানুষ মহাকাশ সম্পর্কিত গবেষণা ও নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মহাকাশে পাঠিয়েছে। সেই সমস্ত উপগ্রহকেই আসলে কৃত্রিম উপগ্রহ (Artificial Satelite) বলা হয়। শুধু তাই নয়, আজকে যে আমরা টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখতে পাচ্ছি, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর-দূরান্তের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে পারছি কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছি তাও কিন্তু এই কৃত্রিম উপগ্রহের কল্যাণে। এইরকম প্রায় কয়েক হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। এই সমস্ত স্যাটেলাইটগুলির আকার, উচ্চতা বা নকশাটি ঠিক কেমন হবে তা নির্ভর করে এর ব্যবহারের উপর। স্যাটেলাইটগুলিতে অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যন্ত্র লাগানো থাকে, লাগানো থাকে ক্যামেরাও। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে এই সব কৃত্রিম উপগ্রহগুলি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে আর এই উপগ্রহগুলিকে সেই কক্ষপথে পাঠাতে ব্যবহার করা হয় রকেট।
এডওয়ার্ড এভারেট হ্যালের লেখা ছোটগল্প ‘দ্য ব্রিক মুন’ কিংবা জুল ভার্ণের লেখা ‘দ্য বেগমস ফরচুন’ গল্পেই প্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর কাল্পনিক বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে ১৯২৮ সালে হারমান পোটোনিক পৃথিবীর স্থলভাগ পর্যবেক্ষণের জন্য প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে ইংরেজ বৈজ্ঞানিক আর্থার সি ক্লার্ক তাঁর একটি প্রবন্ধে যোগাযোগ স্থাপন প্রক্রিয়ার সুবিধের জন্য একটি উপগ্রহ পাঠাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার ঠিক পরের বছরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি প্রকল্প র্যান্ড (RAND) পরীক্ষামূলক বিশ্ব-প্রদক্ষিণকারী একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছিল। ধীরে ধীরে ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম মহাকাশে সফলভাবে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে যার নাম ছিল ‘স্পুটনিক ১’ (Sputnik I)। ২৩ ইঞ্চি ব্যাসের গোলকাকৃতির এই কৃত্রিম উপগ্রহটির ওজন ছিল ১৮৩ পাউণ্ড। স্পুটনিক ১-এর কাজ ছিল মূলত পৃথিবীর উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় স্তরগুলি শনাক্ত করা এবং আয়নমণ্ডলে বেতার-সংকেত বিতরণের মাধ্যমে তথ্য সরবরাহ প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা। তারপরেই বিশ্বে শুরু হয় মহাকাশীয় যুগ বা স্পেস এজ (Space Age)। ক্রমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় ১৯৬০-এর দশক জুড়ে। কে আগে উন্নত মানের কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে পারে এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণের দুনিয়ায় নতুন আবিষ্কারের শিরোপা পেতে পারে এ ছিল তারই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৫৭ সালেই ৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আবার ‘স্পুটনিক ২’ (Sputnik II) নামে একটি উপগ্রহ প্রেরণ করে পৃথিবীর কক্ষপথে। এই স্পুটনিক ২-তেই পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে উপস্থিত ছিল ‘লাইকা’ নামের একটি কুকুর। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে লাইকা আর জীবিতাবস্থায় পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারেনি। এর কিছুদিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সহায়তায় ভ্যান ব্রাউন নামের এক ব্যক্তির উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘এক্সপ্লোরার ১’ (Explorer I) নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যা ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়। পৃথিবীর চারপাশের চৌম্বকীয় বিকিরণের ক্ষেত্রগুলিকে পর্যবেক্ষণ করাই এর মূল লক্ষ্য ছিল। এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণই মুখ্য গবেষক ও অনুসন্ধানকারী জেমস ভ্যান অ্যালেনের নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছিল। আর এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই এরপর বহু স্বল্প ওজনের কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো শুরু হয়। সেই সময় থেকে ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ৮৯০০টি কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে এবং তার মধ্যে অনেকগুলির সক্রিয়তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মহাকাশে সক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা প্রায় হাজার তিনেক। ভারতও মহাকাশে সফলভাবে প্রথম একটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায় ১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল যার নাম ছিল ‘আর্যভট্ট’ (Aryabhatta)। তারপরে একে একে ‘ইনস্যাট’ (INSAT), ‘আইআরএস’ (IRS), ‘এডুস্যাট’ (EduSAST), ‘জি-স্যাট’ (G-SAT), ‘চন্দ্রযান’ (Chandrayan) ইত্যাদি বহু কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে ভারত। ভারতের পাঠানো উপগ্রহগুলির মধ্যে স্পষ্টই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার জন্য ব্যবহৃত হয় ‘জিওইএস’ (GOES), যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পাঠানো হয় ‘এএনআইকে’ (ANIK) এবং দিক নির্দেশের জন্য ব্যবহৃত হয় ‘জিপিএস’ (GPS)।
উপগ্রহের গতির দিক এবং পৃথিবী থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন
- জিওস্টেশনারি উপগ্রহ (Geo-Stationary Satelite)
- পোলার অরবিটিং উপগ্রহ (Polar Obiting Satelite)
যে সমস্ত কৃত্রিম উপগ্রহগুলি পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার উঁচুতে রয়েছে এবং তাদের পূর্ব-নির্ধারিত কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে তাদের জিও-স্টেশনারি বা জিও-সিঙ্ক্রোনাস (Geo-synchronus) উপগ্রহ বলা হয়। এই ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহগুলি পৃথিবীর চারপাশে প্রায় ৩৬ হাজার কিমি. দূরবর্তী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। এটি পৃথিবীর একটি অক্ষীয় কক্ষপথে ঘোরে এবং এই উপগ্রহের গতিবেগ সমান হয়। উৎক্ষেপণের সময় এরা যে স্থানে অবস্থান করে, সেখানে আজীবন থাকে। স্থান বদল করতে দেখা যায় না জিওস্টেশনারি উপগ্রহগুলিকে। সাধারণভাবে যোগাযোগ এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার ক্ষেত্রেই এই ধরনের উপগ্রহগুলি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভারতের ‘ইনস্যাট’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জিইওএস’ কিংবা জাপানের হিমাওয়ারী ইত্যাদি উপগ্রহগুলি। অন্যদিকে যে সকল কৃত্রিম উপগ্রহগুলি উত্তর-দক্ষিণ কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করতে করতে একবার উত্তর মেরু এবং একবার দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছায় তাদের পোলার অরবিটিং উপগ্রহ বলা হয়। এই ধরনের উপগ্রহগুলি পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫০০-৮০০ কিলোমিটার উঁচুতেই অবস্থিত। এই ধরনের উপগ্রহগুলি এক জায়গায় স্থির থাকে না। প্রতিবার প্রদক্ষিণের সময় এই উপগ্রহগুলি পৃথিবীর নানা অংশ পর্যবেক্ষণ করে। এর ঘূর্ণনকাল পৃথিবীর সমান। মহাবিশ্ব সম্পর্কিত গবেষণা করতে, মহাসাগরের উপর ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখতে, জাহাজ ও বিমানের দিক নির্দেশে সহায়তা করতে কাজে লাগে। এছাড়াও কাজের ভিত্তিতে যে সমস্ত কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে লক্ষ করা যায়, সেগুলি হল – দিকনির্দেশ উপগ্রহ (Navigation Satelite), যোগাযোগ উপগ্রহ (Communication Satelite), সামরিক উপগ্রহ (Military Satelite), জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ (Astronomical Satelite) ইত্যাদি। তবে বর্তমানে মহাকাশে সবথেকে বড় কৃত্রিম উপগ্রহ যেটি রয়েছে তা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station)। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে ‘জিপিএস’ বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম উপগ্রহটি ব্যবহার করা হয় তা আসলে ২৪টি উপগ্রহের সমাহার যেগুলি পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ হাজার কিমি. উপরে পৃথিবীকে সর্বদা প্রদক্ষিণ করে চলেছে।
কৃত্রিম উপগ্রহগুলি কাজের ভিত্তিতে এবং তাতে উপস্থিত যন্ত্রাদির আয়তনের ভিত্তিতে বিভিন্ন আকারের হয়ে থাকে। কোনও কোনওটির আকার ১০ সেন্টিমিটারও হয়ে থাকে, আবার কোনওটি প্রায় ৭ মিটার দীর্ঘ হয় এবং তার সঙ্গে যুক্ত সৌর-প্যানেলটি আবার ৫০ মিটার দীর্ঘ হয়। তবে সবথেকে বড় উপগ্রহ অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটি আকারে একটি বিশালাকায় ফুটবল মাঠের সমান এবং উচ্চতায় তা একটি পাঁচতলা বাড়ির সমান। প্রত্যেক প্রকার কৃত্রিম উপগ্রহের একটি নির্দিষ্ট মৌলিক গঠন কাঠামো রয়েছে। এই কাঠামোর মধ্যেকার উপাদানগুলি হল –
- বাস (Bus) : উপগ্রহের ফ্রেম এটি যার সঙ্গে সমস্ত অংশগুলি যুক্ত থাকে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সৌর-প্যানেলটিও এই বাসের সঙ্গেই লাগানো থাকে। তবে কিছু ব্যাটারিও এর মধ্যে থাকে যা কিনা সূর্যের অনুপস্থিতিতেও কিছু সময় পর্যন্ত উপগ্রহটিকে সচল রাখতে সহায়তা করবে।
- তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Heat Control Sustem) : সূর্যের একেবারে সামনাসামনি থাকার ফলে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় থাকে। তাই তাপ বিকিরণ এবং প্রতিফলনের দরকার হয়ে পড়ে। এমনকি উপগ্রহের মধ্যেকার বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতিগুলি থেকেও প্রভূত তাপ নির্গত হয়। তাই প্রায় প্রত্যেক কৃত্রিম উপগ্রহেই এই ব্যবস্থা থাকে।
এছাড়াও অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কম্পিউটার ব্যবস্থা (Computer System), যোগাযোগ ব্যবস্থা (Communication System), উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Altitude Control System), ঘূর্ণন ব্যবস্থা (A Propulsion System)।
সাধারণভাবে টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এইসব কৃত্রিম উপগ্রহেরই কাজ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংকেত গৃহীত হয় এই উপগ্রহগুলিতে এবং তা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে প্রেরিত হয়। এর মাধ্যমেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট পরিষেবা কিংবা টেলিভিশন পরিষেবা সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া কোনও ব্যক্তি, বিমান কিংবা জাহাজের নিখুঁত অবস্থান জানার জন্যেও এই উপগ্রহগুলি ব্যবহৃত হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান