উনবিংশ শতাব্দীতে বাড়ির হেঁসেলে কাঠ, কয়লা আর গুল দিয়ে উনুনে রান্না করার কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে ইকমিক কুকার উদ্ভাবন করে সাড়া ফেলে দেন ইন্দুমাধব মল্লিক (Indumadhab Mallick)। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয় ইকমিক কুকার (ICMIC cooker)। পেশায় ডাক্তারি করলেও, আইন ও দর্শন বিষয়েও তাঁর পড়াশোনা ছিল। জনশ্রুতি অনুযায়ী , দেওঘরে বোমা বিস্ফোরণে আহত বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তকে তিনিই চিকিৎসা করেছিলেন। শোনা যায় পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের রান্নাঘর দেখেই ইকমিক কুকার তৈরির ভাবনা মাথায় আসে তাঁর। একাধারে ডাক্তার, আইনবিশেষজ্ঞ, সমাজসেবী এবং দেশপ্রেমিক ইন্দুমাধব মল্লিক বাঙালি উদ্ভাবকের ইতিহাসে এক বিস্মৃতপ্রায় নাম।
১৮৬৯ সালের ৪ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় এক বৈদ্য ব্রাহ্মণ পরিবারে ইন্দুমাধব মল্লিকের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাধাগোবিন্দ মল্লিক এবং মায়ের নাম কালীকামিনী দেবী। কলকাতার ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ির সঙ্গে এই পরিবারের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। বাল্যকালে খুবই দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন ইন্দুমাধব। সম্পর্কে ইন্দুমাধব মল্লিক কবি উপেন্দ্র মল্লিকের পিতা এবং অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের ঠাকুরদাদা।
মাত্র সাত বছর বয়সে ইন্দুমাধব মল্লিক ভর্তি হন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। এই স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইন্দুমাধব মল্লিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই দর্শন বিষয়ে ১৮৯১ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। ঠিক এর পরের বছর ১৮৯২ সালে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৯৪ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে আইন পাশ করলেও কখনও ওকালতি করেননি ইন্দুমাধব। এর পাশাপাশি তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজেও ভর্তি হন তিনি। মানুষের সেবা করার লক্ষ্যে ডাক্তারি পড়তে শুরু করেন ইন্দুমাধব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ডাক্তারি পাশ করেছিলেন তিনি। একাধারে বিজ্ঞান ও দর্শন এবং আইনের জ্ঞানের সমাহারে ইন্দুমাধব সেকালের এক অন্যতম পণ্ডিত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ডাক্তারি পাশ করে এলএমএস অর্থাৎ ‘লাইসেন্স ইন মেডিসিন অ্যাণ্ড সার্জারি’ অর্জন করেন তিনি। তখন বঙ্গবাসী কলেজে বটানিতে স্নাতকোত্তর পড়তে শুরু করেন ইন্দুমাধব মল্লিক।
এক নজরে ইন্দুমাধব মল্লিক -এর জীবনী:
- জন্ম: ৪ ডিসেম্বর, ১৮৬৯
- মৃত্যু: ৮ মে, ১৯১৭
- কেন বিখ্যাত: ইন্দুমাধব মল্লিক ইকমিক কুকার আবিষ্কার করেন। পেশার চিকিৎসক হলেও আইন বিষয়েও গভীর জ্ঞান ছিল। চীন ও বিলেত ভ্রমণ করে তিনি যথাক্রমে ‘চীন ভ্রমণ’ ও ‘বিলেত ভ্রমণ’ নামে দুটি বই লেখেন। বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।
১৮৯৭ সালে অ্যালবার্ট কলেজে পড়াতে শুরু করেন ইন্দুমাধব মল্লিক। পরে বঙ্গবাসী কলেজেই লেকচারার পদে নিযুক্ত হয়ে পাকাপাকিভাবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। লজিক, দর্শন, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিষয় এই কলেজে পড়াতেন ইন্দুমাধব। ১৯০৬ সাল পর্যন্ত এই কলেজেই পড়িয়েছেন তিনি। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই নিজে বটানি পড়তেন তিনি। শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা করেননি তিনি, তাঁর মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষেরা সেবায় অধীত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটানো। পড়া এবং পড়ানোর পাশাপাশি রোগী দেখাও শুরু করেন ইন্দুমাধব। বঙ্গবাসী কলেজের প্রায় সকল বিষয়েই তাঁর ডিগ্রি অর্জন করা ছিল। শেষে ‘ফিজিওলজি অ্যাণ্ড জুলজি’ বিষয়েও পড়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বহুধা বিস্তৃত ছিল তাঁর জ্ঞানের পরিধি।
১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনের হাওয়া বইছে যখন, সেই সময় স্থাপিত হল বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ যেখানে যোগ দিয়ে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন ইন্দুমাধব মল্লিক। মনে রাখতে হবে, এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। জীববিদ্যা ও ঔষধশাস্ত্র পড়াতেন ইন্দুমাধব যেখানে পড়ানোর সুবিধের জন্য ডাক্তারির নানাবিধ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে নিয়ে আসা হত। সেই যন্ত্র খারাপ হয়ে গেলে সারানো যেত না কোথাও, ইন্দুমাধব নিজে হাতে সেইসব যন্ত্রপাতি খুলে সারাই করে দিতেন এবং সেই সারাইয়ের পদ্ধতিও ছাত্রদের শিখিয়ে দিতেন। পরবর্তীকালে ১৯০৮ সালে ইন্দুমাধব মল্লিক অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ‘ক্যালকাটা মেডিকেল স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ অফ ফিজিশিয়ান অ্যাণ্ড সার্জেন’ প্রতিষ্ঠানে। ১৯০৮ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় এম.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। সে সময় কলকাতা মেডিকেল কলেজে বছরে মাত্র একজন ছাত্রকেই এম.ডি পড়ার সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু সেবারে ইন্দুমাধবকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাঁর সঙ্গেই ভর্তি হয়েছিলেন বিধান চন্দ্র রায়।
১৯০৪ সাল থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে ইন্দুমাধব চীন ভ্রমণ করেন। তখন রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের প্রবল যুদ্ধ চলছে। প্রথমে কলকাতা থেকে ব্রিটিশ শাসিত রেঙ্গুনে পাড়ি দেন তিনি, তারপর রেঙ্গুন থেকে জাহাজে চড়ে ইন্দুমাধব পৌঁছান পেনাং প্রদেশে। তারপর সেখান থেকে আবার ব্রিটিশ শাসিত মালয় প্রদেশের ক্ল্যাং বন্দরে এসে পৌঁছান তিনি। চীন থেকে ফিরে ১৯০৬ সালে তিনি লিখেছিলেন চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘চীন ভ্রমণ’ বইটি। তার ৭ বছর পরে ইউরোপে ভ্রমণে যান ইন্দুমাধব এবং একইভাবে বিলেত থেকে ফিরে তিনি লিখে ফেলেন ‘বিলেত ভ্রমণ’ নামের আরেকটি ভ্রমণকাহিনী। বিদেশে ঘুরে এসে তিনি বুঝতে পারেন ভারতীয়দের অবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য কত করুণ দশায় আছে।
তাঁর বড় ছেলে শৈশবেই ডায়াবিটিসে মারা গেলে ডায়াবিটিস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। সেযুগে তখনও পর্যন্ত ডায়াবেটিসের কোন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তাঁর নিজের গবেষণাগারেই তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। আর্থিক দৈন্যে ভোগা সমাজে কম দামে পুষ্টিকর খাবারের উপরই বেশি জোর দিতেন তিনি। ওষুধের পাশাপাশি পথ্যের উপরেও গুরুত্ব আরোপ করেন ইন্দুমাধব মল্লিক।
১৯১০ সালে ইকমিক কুকার আবিষ্কার করেন ইন্দুমাধব মল্লিক। ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এই ইকমিক কুকার। এর মধ্যে একটা বড় সিলিণ্ডার থাকত আর থাকত একটা ক্যারিয়ার। সিলিণ্ডারে জল দিয়ে আগুনের উপর বসানো হত। জল ফুটে বাষ্প হলে ক্যারিয়ারের মধ্যে রাখা উপর উপর সব বাটির তরি-তরকারি বা ভাত, মাংস ইত্যাদি সব সেদ্ধ হত। খাবার আগুনে পুড়ে যাওয়ার কোন ভয় ছিল না এতে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে তিনি দেখেছিলেন রান্নাঘরে জ্বলন্ত উনুনের উপর ক্রমান্বয়ে বড়ো থেকে ছোট হাঁড়ি সাজানো আর তাতেই সুন্দর রান্না হচ্ছে দেখে ইন্দুমাধব এই ইকমিক কুকারের ধারণাটা পেয়েছিলেন। এতে একদিকে যেমন জ্বালানিও সাশ্রয় হয়, তেমনই অনেক কম সময়ে নিরাপদে রান্নাও হয়ে যায়। আজকের প্রেশার কুকারের পূর্বসুরি বলা চলে এই ইকমিক কুকারকে। ‘ইকমিক’ নামটির মধ্যে ইকোনমিক এবং হাইজিনিক এই দুটি শব্দের অপভ্রংশ জুড়ে আছে।
দেওঘরে আলিপুরের বাড়িতে তৈরি বোমা ফাটানোর সময় গুরুতরভাবে বিস্ফোরণে আহত হলে গোপনে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের চিকিৎসা করেছিলেন ইন্দুমাধব মল্লিক। বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে তাঁর যথেষ্ট সহানুভূতি ছিল।
১৯১৭ সালের ৮ মে ইন্দুমাধব মল্লিকের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান