সববাংলায়

মান্ধাতার আমল

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “মান্ধাতার আমল”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: অতি প্রাচীন কাল। কোন কিছু পুরনো বা বর্তমান কালের অনুসারী না হলে মান্ধাতার আমল প্রবাদের প্রয়োগ হয়ে থাকে।

“মান্ধাতার আমল” প্রবাদের উৎস খুঁজতে হলে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির দিকে নজর দিতে হবে। বিষ্ণুপুরাণে রাজা মান্ধাতা বা মান্ধাত্রির উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতেও রাজা মান্ধাতার কাহিনি পাওয়া যায়।

মান্ধাতা সূর্য বংশের রাজা ছিলেন, এই বংশেই মান্ধাতার বহুকাল পরে রামায়ণের প্রধান চরিত্র রামের জন্ম। মান্ধাতার জন্মবৃত্তান্ত খুবই অদ্ভুত। তিনি ছিলেন রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। যুবনাশ্বর সন্তান ছিল না। অনেক চেষ্টা করলেও সবই বিফল হয়। অবশেষে যুবনাশ্ব মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগ সাধনা শুরু করেন। দীর্ঘ সাধনায় তৃপ্ত হলেন মুনিরা। তাঁরা সবাই মিলে যুবনাশ্বর জন্য যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞ শেষ হতে হতে মাঝরাত হয়ে গেল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মুনিরা কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত জল বেদিতে রেখে দিলেন। এই কলসির জল যুবনাশ্বর স্ত্রী পান করলেই তিনি গর্ভবর্তী হবেন।

কিন্তু রাত্রে তীব্র তৃষ্ণা পেলে কাওকে ঘুম থেকে না তুলে যুবনাশ্ব সেই কলসির জল পান করেন। সকালে মুনিরা যখন সেই জল নেই দেখে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, রাতে পিপাসা পাওয়ায় রাজা যুবনাশ্ব সেই জল পান করেছেন। মুনিরা জানালেন – জল যেহেতু যুবনাশ্ব পান করেছে, সুতরাং তাঁর গর্ভেই সন্তান জন্মাবে। তবে যুবনাশ্বের প্রার্থনায় মুনিরা নারীর গর্ভধারনের কষ্ট থেকে যুবনাশ্বরকে মুক্তি দেন। পরে যুবনাশ্বরের পেটের বাম দিক চিড়ে মান্ধাতাকে বের করা হয়। তারপর সমস্যা দেখা গেল সন্তানকে স্তন্যদানের ব্যাপারে। দেবরাজ ইন্দ্র সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন, বললেন ‘মাং ধস্যতি’ অর্থাৎ ‘আমাকে পান করবে’। এর থেকেই তাঁর নাম হল মান্ধাতা। ইন্দ্রের আঙুল চুষে মাত্র ১২ দিনে তিনি পূর্ণতা পেলেন ১২ বছর বয়সী বালকের মতো। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পড়াশোনা এবং অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন।

পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত হয়ে মান্ধাতা পৃথিবী জয় করতে বের হলেন। একসময় যুদ্ধ করে পৃথিবী জয় করলেন। যুদ্ধ করে তিনি অনেক সম্পদ আহরণ করেছিলেন যে তাঁর রাজ্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রজারা সুখে, শান্তিতে বাস করত। তিনি একশত রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন এবং মুনি-ঋষিদের প্রচুর দান করেছিলেন। সেই সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভেবেও সম্ভবত মান্ধাতার আমল কথাটি প্রচলিত হয়েছিল।

মান্ধাতার সঙ্গে রাবণের রাবণেরও একবার যুদ্ধ হয়েছিল তবে সেই যুদ্ধে কেউই জয়ী হননি। পৃথিবী জয় সম্পূর্ণ হলে তিনি স্বর্গ জয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দ্র তখন বলেন যে তাঁর পুরো পৃথিবী জয় শেষ হয়নি, মধু ও কুম্ভিনীর (রাবণের বোন) পুত্র লবণাসুর এখনও তাঁর বশ্যতা মেনে নেয়নি। তাই মান্ধাতা লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে মধুপুরী গেলেন। তবে এই যুদ্ধই তাঁর শেষ যুদ্ধ হয়েছিল, লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন।

এখন প্রশ্ন হল, মান্ধাতার আমল কখন ছিল? হিন্দুধর্ম মতে চারটি যুগ হল সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। এর মধ্যে সত্য যুগকে শ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। সে যুগে পাপ ছিল না। মৃত্যু ছিল ইচ্ছাধীন। সেই সত্য যুগের রাজা ছিলেন মান্ধাতা। সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সময় ছিল যথাক্রমে ১৭,২৮,০০০ বছর, ১২,৯৬,০০০ বছর এবং ৮,৬৪,০০০ বছর। আমরা কলি যুগে বাস করছি যার দৈর্ঘ্য ৪,৩২,০০০ বছর। সব মিলিয়ে রাজা মান্ধাতা কম করে হলেও এখন থেকে প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগে রাজকার্য পরিচালনা করেছেন। সুতরাং ‘মান্ধাতার আমল’ মানে যে, অনেক বছরের পুরনো কিছু হবে তা বলাবাহুল্য। এই কারণেই আমরা অনেক পুরনো কিছু বলতে গিয়ে মান্ধাতার আমল কথাটি উল্লেখ করি।

‘মান্ধাতার আমল’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। মানুষটার পোশাক পরিচ্ছদ যতই মান্ধাতা আমলের হোক না কেন শিক্ষা সংস্কৃতিতে আধুনিক।
২। আজকের সমাজের মানুষের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন থাকলেও কুসংস্কারের ব্যাপারে সেই মান্ধাতা আমলেই আটকে আছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১২৭ পৃঃ
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.prothomalo.com/
  4. https://www.risingbd.com/
  5. https://en.m.wikipedia.org/
 
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading