সববাংলায়

সাক্ষী গোপাল

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “সাক্ষী গোপাল”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: নিষ্ক্রিয় দর্শক, কোন ঘটনার প্রতি উদাসীন ইত্যাদি। এই প্রবাদের উৎপত্তির সঙ্গে পুরীর কাছে অবস্থিত সাক্ষীগোপাল মন্দিরের সম্পর্ক রয়েছে।

ওড়িশার সাক্ষী গোপাল মন্দির একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। এই মন্দিরের বিগ্রহ “গোপাল”-এর সঙ্গেই এই প্রবাদের যোগসূত্র রয়েছে। কিংবদন্তী অনুসারে, এই মন্দিরের বিগ্রহটি আগে বৃন্দবনের এক মন্দিরে ছিল। সেখান থেকে নিজেই ওড়িশার এই স্থানে এসেছিল ওই মূর্তি। আর এই মূর্তির নিজে পায়ে আসার ঘটনাটি ঘিরেই প্রচলিত রয়েছে এক কাহিনি।

এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে বৃন্দাবন গেছিলেন তীর্থ করতে। পথে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। সঙ্গীদের মধ্যে তাঁর এক গ্রামবাসী যুবক অনেক সেবাযত্ন করে তাঁকে সুস্থ করে তোলে। বৃদ্ধ যুবকটিকে কথা দিলেন যে, তীর্থ থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি যুবকটির সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিবেন। তবে যুবকটি ব্রাহ্মণের উপর বিশেষ ভরসা করতে পারল না, কারণ ব্রাহ্মণের পরিবার ও যুবকের পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির প্রবল বৈষম্য ছিল – যে বৈষম্য দূর করে নিজ কন্যা দান খুব একটা সহজ নয়। তাই যুবক ব্রাহ্মণকে নিয়ে গেল নিকটবর্তী শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে শপথ করাতে। সেখানে গোপাল (শ্ৰীকৃষ্ণ) বিগ্রহের সামনে গিয়ে বিগ্রহকে সাক্ষী রেখে মেয়ের সঙ্গে ঐ যুবকের বিয়ে দেবেন এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিলেন বৃদ্ধ।

তীর্থভ্রমণ শেষে গ্রামে ফিরলেন ব্রাহ্মণ। যুবক মাঝে মাঝে তাঁকে তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেয় কিন্তু ব্রাহ্মণ আর তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখেন না। যুবকের চাপাচাপিতে একদিন ব্রাহ্মণ তাঁর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করলেন ।

নিরুপায় নাছোড়বান্দা যুবক সেই শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে গেল যার সামনে ব্রাহ্মণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকে সে অনুনয় করে বলল – ‘হে গোপাল, তুমি তো জানো যে, ঐ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তোমার সামনেই আমাকে তাঁর কন্যা সম্প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন তিনি তা অস্বীকার করছেন। অতএব সবার সামনে গিয়ে তোমাকে সাক্ষ্য দিতে হবে।’

অনেক অনুনয়ের পর গোপালমূর্তি যুবকের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে বলল – ‘ঠিক আছে। তুমি সামনে এগোতে থাকো। আমি তোমার পিছনে পিছনে যাচ্ছি, কিন্তু তুমি যদি পিছন ফিরে দেখো তাহলে আমি আর যাবো না’।

যুবক বলল, ‘আমি তাতে রাজি, কিন্তু আমি কী করে বুঝব যে তুমি আমার পিছনে আসছো?’

গোপাল বিগ্রহ বলল, ‘আমার চরণের নুপুরধ্বনি শুনলেই তুমি বুঝতে পারবে যে, আমি ঠিক ঠিক যাচ্ছি তোমার পিছনে।’

গোপালের শর্তে সম্মত হয়ে যুবক চলতে লাগল। পিছনে নুপুরধ্বনি করে গোপালও যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর নুপুরধ্বনি শুনতে না পেয়ে পিছন ফিরল যুবক । গোপালমূর্তি থেমে গেল । যুবক বলল — ‘আমি তোমার নুপুরের শব্দ না পেয়ে পিছন ফিরেছি।’ গোপাল বলল, ‘বালুর মধ্যে চলতে চলতে নুপুরের মধ্যে বালু ঢুকে শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। যাহোক, শর্ত অনুযায়ী আমি আর অগ্রসর হতে পারব না।তবে তোমার ভাবনার কারণ নেই। তুমি গ্রামে ফিরে গিয়ে ব্রাহ্মণকে এই ঘটনার কথা বলবে।’

গোপালমূর্তি ঐ স্থানেই স্থির হয়ে গেল। যুবক গ্রামে ফিরে সবাইকে এই ঘটনার কথা বলল। বৃন্দাবনের প্রস্তররূপী গোপাল এতদূর হেঁটে এসেছেন শুনে গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ ওড়িশার ওই গ্রামে জমায়েত হতে থাকে। খবর পৌঁছায় সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বাড়িতেও। তিনিও সদলবলে সেই গ্রামে উপস্থিত হন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ও জনমতের চাপে ব্রাহ্মণ নিজের মেয়ের সঙ্গে সেই যুবকের বিয়ে দেন। এই ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়তেই গোপালের নামে ওই স্থানে একটি মন্দির বানিয়ে দেওয়া হয়। এই গোপালের বিগ্রহ পরিচিত হয় ‘সাক্ষী গোপাল’ নামে।

পুরী কাছে সাক্ষীগোপালের এই মন্দির অবস্থিত। সর্বদর্শী হয়েও এই গোপাল নিজে কারো পাপ বা পুণ্যের ফল দান করে না। যে ব্যক্তি নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্যের কার্যকলাপ দর্শন করে অর্থাৎ প্রত্যক্ষকারী অথচ পুতুলের মতো জড় পদার্থ হয়ে থাকে তাকে প্রবাদে বলা হয় সাক্ষী গোপাল। অনেকের বিশ্বাস যে, সাক্ষীগোপালের মন্দির দর্শন ছাড়া পুরীর তীর্থযাত্রা পরিপূর্ণ হয় না ।

‘সাক্ষী গোপাল’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। মা-বৌয়ের মধ্যে বিবাদে ছেলের ‘সাক্ষী গোপাল’ হয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।
২। বর্তমান সময়ে নেতাদের দুর্নীতি দেখেও জনগণ সাক্ষী গোপাল হয়ে আছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৬৩ পৃঃ
  2. https://archive.roar.media/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading