সিন্ধু জল চুক্তি (Indus Waters Treaty) ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক জলবণ্টন চুক্তি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে দুই দেশের মধ্যে সিন্ধু-অববাহিকার জল বণ্টন নিয়ে যে জটিলতা ও উত্তেজনা তৈরি হয়, তা নিরসনের জন্য বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তিটি ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং তা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক জলচুক্তি হিসেবে স্বীকৃত। তবে ২০২৫ সালে পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে ভারত চুক্তিটি স্থগিত করেছে। ভারত-পাকিস্তানের তিক্ত সম্পর্কের মধ্যে সিন্ধু জল চুক্তি একটি উল্লেখযোগ্য সমঝোতা যা নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
সিন্ধু জল চুক্তি সম্পর্কে আলোচনা করার আগে এই চুক্তির পিছনে ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ ভারতের সময় থেকেই সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চল উত্তর ভারতের কৃষিকেন্দ্রিক জীবনের মূল অংশ ছিল। এই অংশে সিন্ধু নদ ও তার পাঁচটি উপনদী অবস্থিত। এই উপনদীগুলি হল বিতস্তা (Jhelum), চন্দ্রভাগা (Chenab), ইরাবতী (Ravi), বিপাশা (Beas), শতদ্রু (Sutlej)। দেশভাগের সময় এই নদীগুলিও ভাগ হয়ে যায়, নদীগুলির উৎস বা উচ্চপ্রবাহ ভারতে হলেও বেশিরভাগ অংশ পাকিস্তান দিয়ে প্রবাহিত হয়।
১৯৪৮ সালে ভারত পাঞ্জাব অঞ্চলের কিছু ক্যানালের জল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করলে পাকিস্তান একে “জল যুদ্ধ” বলে দাবি করে। এই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য একটি সাময়িক চুক্তি করা হয়, সেই চুক্তি অনুযায়ী ভারত পাকিস্তানকে জল দেবে এবং বিনিময়ে পাকিস্তান ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দেবে। এই অন্তর্বর্তী চুক্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি এবং ১৯৫১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে যায়। এরপর বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ ৯ বছরের আলোচনার পর ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর করাচিতে সিন্ধু জলবন্টন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের পক্ষে রাষ্ট্রপতি আয়ুব খান চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। তবে চুক্তিটি কার্যকরী হয় ১৯৬০ সালের ১ এপ্রিল থেকে অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে থেকেই চুক্তিটি কার্যকর করা হয়।
এই চুক্তি অনুযায়ী উপরোক্ত ৬টি নদীকে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয় যার মধ্যে পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয় পশ্চিমের নদীগুলি অর্থাৎ সিন্ধু, বিতস্তা ও চন্দ্রভাগা। এই নদীগুলির প্রায় সম্পূর্ণ জল পাকিস্তান ব্যবহার করবে। তবে ভারত এই নদীগুলিতে সীমিত হারে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ ও অন্যান্য প্রকল্পের জন্য জল ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না।
ভারতের জন্য সম্পূর্ণভাবে বরাদ্দ করা হয় পূর্ব দিকের নদীগুলি অর্থাৎ ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রু।
এই চুক্তি অনুযায়ী একটি দ্বিপাক্ষিক সংস্থা গঠন করা হয় যার নাম স্থায়ী সিন্ধু কমিশন (Permanent Indus Commission বা PIC)। এই সংস্থার মূল দায়িত্ব হল চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা। PIC-র মূল দায়িত্বগুলি হল:
- প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য: নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ, বা জল সংরক্ষণ কাঠামোর ডিজাইন ও নির্মাণ পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্য বিনিময়।
- জলপ্রবাহের তথ্য: নদীগুলির প্রবাহের পরিমাণ, মৌসুমি পরিবর্তন, বন্যা বা খরার পূর্বাভাস দেওয়া।
- পরিদর্শন রিপোর্ট: উভয় দেশের প্রতিনিধিরা পরস্পরের নদী অববাহিকা পরিদর্শন করে রিপোর্ট তৈরি করেন।
- বার্ষিক সভা: চুক্তির বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য বিরোধ সমাধানের জন্য বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত করা।
চুক্তি অনুযায়ী, কোন প্রকল্প বা কার্যক্রম যদি চুক্তির শর্তাবলী বিরোধী হয়, তবে প্রথমে PIC-এর মাধ্যমে আলোচনা হয়। সমাধান না হলে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ বা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
১৯৬০ সালে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া সিন্ধু জল চুক্তি দুই দেশের মধ্যে হওয়া দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি। এমনকি ১৯৬৫ সাল ও ১৯৭১ সাল ও ১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ও এই চুক্তি অটুট ছিল। আবার চুক্তি কার্যকরী থাকলেও সময়ের সাথে বিভিন্ন বিতর্ক ও বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। সিন্ধু জল চুক্তিটি পুনরায় পর্যালোচনা করা নিয়ে ভারতের অবস্থান ২০০৩ সাল থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে, যখন জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভা সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে চুক্তির শর্তাবলী পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে। এই প্রস্তাবে চুক্তির কারণে রাজ্যের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও কৃষি উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে চুক্তি সংশোধনের জন্য নোটিশ প্রদান করে, যা চুক্তির ৬৩ বছরের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নিচে এই চুক্তিটি নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো:
২০০৫: বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Baglihar Hydroelectric Power Project) –
ভারত জম্মু ও কাশ্মীরে বাঘলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরু করলে পাকিস্তান অভিযোগ তোলে যে, এটি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে। বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ প্রকল্পটিকে চুক্তি-সঙ্গত ঘোষণা করেন, তবে কিছু নকশা পরিবর্তনের সুপারিশ করেন।
২০১৩: কিশানগঙ্গা প্রকল্প (Kishanganga Hydroelectric Project) –
ভারতের কিশানগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তান ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা করে। ২০১৩ সালে আদালত রায় দেয় যে, ভারত প্রকল্পটি করতে পারবে, তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৬: উরি হামলা (Uri attack) –
ভারতের উরি সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মন্তব্য করেন, “রক্ত ও জল একসাথে প্রবাহিত হতে পারে না।” এরপর ভারত চুক্তির কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।
২০২৫: পহেলগাঁও হামলা (Pahelgam Attack) –
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত পাকিস্তানকে হামলার জন্য দায়ী করে এবং পরদিন ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করার কথা ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত নদীগুলির জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। যেমন, ভারত চন্দ্রভাগা নদীর জলপ্রবাহ সীমিত করে এবং বাগলিহার ও সালাল বাঁধ থেকে জল ছাড়ার সময়সূচি পরিবর্তন করে। বিভিন্ন বাঁধের আগাম খবর ছাড়াই ফ্লাশিং পদ্ধতিতে জমে থাকা পাথর, নুড়ি ইত্যাদি পরিষ্কার করা শুরু করেছে। এছাড়াও নদীর প্রবাহ, বন্যা বা খরার পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য পাকিস্তানের সঙ্গে আর বিনিময় করা হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান ভারতের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে এবং হুঁশিয়ারি দেয় যে, জলপ্রবাহ বন্ধ করা হলে তা যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য হবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সিন্ধু জল চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি স্থিতিশীল ভিত্তি ছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বিশেষ করে ২০২৫ সালের পহেলগাঁও হামলার পর চুক্তি স্থগিতকরণ, এই স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান