সববাংলায়

শিখণ্ডী খাড়া করা

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “শিখণ্ডী খাড়া করা”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করা বা নিজের দোষ ঢাকতে কাওকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। শিখণ্ডী মহাভারতের চরিত্র তাই বলা বাহুল্য যে এই প্রবাদের উৎসের সঙ্গে মহাভারতের কাহিনি জড়িয়ে আছে। আমরা এখানে শিখণ্ডী খাড়া করা প্রবাদের পিছনে মহাভারতের কাহিনিটি জেনে নেব।

মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন পিতামহ ভীষ্ম। তিনি ছিলেন একজন অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা এবং ইচ্ছেমৃত্যুর বরপ্রাপ্ত। তাঁর অনুমতি ছাড়া মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না। এর ফলে পাণ্ডবদের পক্ষে ভীষ্মকে পরাজিত করা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। যুদ্ধও নবম দিন পেরিয়ে দশম দিনে প্রবেশ করেছে, এদিকে ভীষ্মকে পরাজিত না করতে পারলে পাণ্ডবদের জয়লাভ অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভীষ্মকে হারাতে হলে কোনও কৌশল নিতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ ও পাণ্ডবরা জানতেন যে ভীষ্ম কোনও নারী বা রূপান্তরকামীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেন না। শ্রীকৃষ্ণ পরামর্শ দিলেন যে ভীষ্মের এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাতে হবে এবং তিনি শিখণ্ডীকে অর্জুনের সামনে রেখে যুদ্ধ করার কথা বললেন। এই প্রসঙ্গেই উঠে এলো শিখণ্ডীর কাহিনি।

শিখণ্ডীর কাহিনির শুরু হয় অম্বা নামের এক রাজকন্যার জীবন থেকে। তিনি ছিলেন কাশীর রাজা কাশ্যের তিন কন্যার একজন, তাঁর বাকি দুই বোনের নাম অম্বিকা ও অম্বালিকা। হস্তিনাপুরের রাজপুত্রদের জন্য উপযুক্ত স্ত্রী খোঁজার উদ্দেশ্যে, ভীষ্ম কাশীর রাজসভায় উপস্থিত হয়ে তাঁদের তিন বোনকে তাঁদের স্বয়ম্বর সভা থেকে জোরপূর্বক হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন।

তবে অম্বা ইতিমধ্যেই শাল্ব রাজার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন। ভীষ্ম যখন তা জানলেন, তিনি অম্বাকে শাল্বরাজের কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু অপহৃত হওয়ার কারণে এবং ভীষ্মের হাতে অপমানিত হওয়ার ফলে শাল্ব অম্বাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। জীবনের এমন করুণ পরিণতি এবং সম্মানহানির জন্য অম্বা ভীষ্মের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি কঠোর তপস্যা করে শিবের বর লাভ করেন যে, পরবর্তী জন্মে তিনি পুরুষের রূপে জন্মগ্রহণ করবেন এবং ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন।

অম্বা পুনর্জন্ম নেন পাঞ্চাল রাজা দ্রুপদের ঘরে, এবং জন্ম নেন শিখণ্ডী রূপে। তবে শুরুতে তিনি কন্যা শরীরেই জন্ম নেন। দ্রুপদ জানতেন না তাঁর সন্তান নারীরূপে জন্মেছে। শিখণ্ডীর বিয়ে হয়, কিন্তু পরে বিষয়টি ধরা পড়ে এবং বধূ তাকে ত্যাগ করে। শিখণ্ডী গভীর সংকটে পড়েন। তখন তিনি এক রহস্যময় যক্ষ-এর সাহায্যে তিনি পুরুষদেহ লাভ করেন। এভাবেই তিনি পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং চেষ্টা করতে থাকেন নিজেকে দ্রুপদের পুত্র হিসেবে প্রমাণ করতে।

শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু জানতেন শিখণ্ডীই হলেন পূর্বজন্মের অম্বা এবং অম্বা শিবের বরপ্রাপ্ত তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, শিখণ্ডীকে তাঁর রথের সামনে রাখতে। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন শিখণ্ডীকে তাঁর রথের সামনে স্থাপন করলেন। যখন ভীষ্ম শিখণ্ডীকে দেখলেন, তিনি চিনতে পারলেন যে ইনি সেই পূর্বজন্মের অম্বা। নিজের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী, ভীষ্ম শিখণ্ডীর দিকে কোনও অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন না এবং নিজের ধনুকও নিচে নামিয়ে রাখলেন। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন অর্জুন। ভীষ্মকে নিরস্ত দেখে শিখণ্ডীর আড়াল থেকে অর্জুন তাঁর গায়ে শরবৃষ্টি শুরু করলেন। অসংখ্য বাণে বিদ্ধ হয়ে ভীষ্ম শরশয্যায় শায়িত হলেন।

‘শিখণ্ডী খাড়া করা’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। কিছু দল হেরে গেলেই খারাপ রেফারিং বলে ‘শিখণ্ডী খাড়া করা’ অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে।
২। পরমাণু বোমা তৈরি করছে এই শিখণ্ডী খাড়া করে পরমাণু শক্তিধর আমেরিকা, ইজরায়েল ইরানের উপর আক্রমণকে সঠিক প্রমাণ করতে চাইছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৫০ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading