সববাংলায়

নকশাল আন্দোলন | নকশালবাড়ি আন্দোলন

গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষ থেকে সাতের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত শহর কলকাতাসহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি বাংলার বাইরেও আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল চরম বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষদের হিংসাত্মক এক আন্দোলন, যা ইতিহাসে নকশাল আন্দোলন নামেই পরিচিতি লাভ করেছিল৷ উত্তরবঙ্গের একটি গ্রাম ছিল আন্দোলনের সূচনাভূমি। কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শগত বিভেদের কারণে তখন ভাঙন ঘটে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসা মানুষেরা মাও-সে-তুঙের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নকশাল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণের পরোয়া না করে। ছাত্র ও যুবসমাজ নকশালদের ভাবাদর্শ দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। শহুরে শিক্ষিত মানুষ থেকে শুরু করে নিরক্ষর আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিকেরাও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল আন্দোলনে। নকশালদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ রুখতে সরকারও নৃশংস দমননীতির প্রয়োগ করছিল। সত্তরের সেই দিনগুলির স্মৃতি আজও বর্ষীয়ান মানুষদের রোমাঞ্চিত করে তোলে।

পশ্চিমবাংলার উত্তরবঙ্গে অবস্থিত একটি গ্রাম নকশালবাড়ি। আন্দোলনের উৎসভূমি সেই গ্রাম, তাই তার নাম থেকেই আন্দোলনটি নকশাল আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করেছিল এবং আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত মানুষেরা নকশাল তকমা পেয়েছিলেন। নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকরা, যারা মূলত চা বাগান এবং বৃহৎ জমিতে কাজ করছে দীর্ঘদিন, বহুবছর ধরে তারা জমিদার ও মহাজন শ্রেণির দ্বারা অত্যাচারিত ও শোষিত হয়ে আসছিল। ১৯৬৭ সালের ২৫ মার্চ এক ভাগচাষীকে অন্যায়ভাবে তার জমি থেকে উৎখাত করবার পরেও জোরপূর্বক সে সেই জমিতে চাষ করতে গেলে জমিদার তাকে নৃশংসভাবে প্রহার করে এবং তার জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় সেখানকার কৃষকেরা একজোট হয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।

এই ঘটনার দুবছর আগে থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) দলের অনেকেই মনে করেছিলেন যে, শ্রমিক ও কৃষকেরা অর্থলোভী শ্রেণির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করলেই প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব। অথচ সেই দলের একাংশ সশস্ত্র বিপ্লবের পথকে সঠিক পথ বলে মনে করেননি এবং চলতি সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেই মানুষের উপকার করা সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। দলের মধ্যে এই মতভেদ থেকে একরকম শিথিলতা তৈরি হচ্ছিলই এবং এরই মধ্যে ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়িতে ঘটা কৃষকদের সমবেত বিক্ষোভ যেন তাতেই ঘৃতাহুতি দান করল। সি.পি.আই (এম) থেকে একদল লোক বেরিয়ে এসে চরমপন্থা অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিল এবং গঠন করল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), সংক্ষেপে সি.পি.আই(এম-এল)।

যদিও ১৯৬৯ সালের ১ মে কলকাতায় ময়দানের জনসভায় কানু সান্যাল আনুষ্ঠানিকভাবে সি.পি.আই(এম-এল) পার্টি প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন তবে ঐতিহাসিকভাবে নকশাল আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল ১৯৬৭ সালের ২৫ মে। উক্ত সিপিআই(এম-এল) দলকে সামনে রেখে উগ্র বামপন্থা অবলম্বন করে যাঁরা এই নকশাল আন্দোলনকে একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সুশীতল রায়চৌধুরী প্রমুখ।

সি.পি.আই(এম.এল) দল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই চিনের পার্টি তাকে সমর্থন দিয়েছিল এবং পিপলস ডেইলি পত্রিকায় পার্টির প্রস্তাবগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। চারু মজুমদার ছিলেন মাও-সে-তুং-এর দর্শনের একজন অনুসারী। মাও-এর দেখানো পথেই গরীব কৃষক ও শ্রমিকেরা শ্রেণিশত্রুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করুক, এই ছিল তাঁর চাওয়া। নকশাল আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সেই সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। নকশালপন্থীদের প্রাথমিক দাবিই ছিল ভূমি মালিকানা ও বন্টনের বৈষম্য দূর করবার জন্য ব্যাপক ভূমিসংস্কার। তবে তাঁদের লক্ষ্য বিস্তৃত হয় আরও। সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদও সামিল হয়ে গিয়েছিল তাঁদের আন্দোলনে। চারু মজুমদারের লেখনীর মাধ্যমে নকশাল আন্দোলন পৌঁছে গিয়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁর ঐতিহাসিক ‘আটটি দলিল’ যা ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল, তা বলা যায়, নকশাল আন্দোলনের মতাদর্শের ভিত গড়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী সরোজ দত্তের মতো লেখক ‘দেশব্রতী’ পত্রিকায় নকশালদের পক্ষ নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।

উত্তরবঙ্গের ওই একটি গ্রামেই আর আটকে থাকেনি আন্দোলন, ক্রমে তার আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাংলার গ্রামে গ্রামে এবং কলকাতা শহরেও অলিতে-গলিতে নকশালদের আনাগোনা, কার্যকলাপ শুরু হয়ে যায় পুরোদমে। বাংলার বাইরেও মূলত অরণ্যসঙ্কুল ও খনিজ এলাকাগুলিতে যেমন, বিহার, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা প্রভৃতি জায়গায় এই আন্দোলন ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল। ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে বাংলার কয়েকজন কৃষক, শ্রমিক জোতদারের কাছ থেকে জমি দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালের মে মাসে শিলিগুড়ি কিষান সভা যার সভাপতি ছিলেন জঙ্গল সাঁওতাল, কানু সান্যালদের আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন জানায় এবং ভূমিহীনদের মধ্যে জমি পুনর্বণ্টনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম গ্রহণের প্রস্তুতির ঘোষণা করে।

কেবলমাত্র প্রান্তিক অত্যাচারিত জনজাতি, কৃষক ও শ্রমিকেরাই এই আন্দোলনে সামিল হন তা চাননি চারু মজুমদার। শিক্ষিত ছাত্র সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ছাত্র সম্প্রদায়ের উদ্দেশে চারু মজুমদার জানিয়েছিলেন যে শ্রেণিশত্রুদের চিহ্নিত করার কথা বলা হচ্ছে তারা কেবল জমিদার বা জোতদার নয়, তাদের মধ্যে পড়ে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পুলিশ ইত্যাদি এমন আরও অনেকেই। চারু মজুমদারের আহ্বানে তরুণরা নির্দ্বিধায় এগিয়ে এসেছিল এই সহিংস বিপ্লবের পথে হাঁটতে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়ে উঠেছিল নকশালদের আখড়া। এছাড়াও দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজও নকশালদের কার্যকলাপের অন্যতম ঘাঁটি হয়ে ওঠে। এই বিপ্লবের নেশায় অনেক ছাত্রছাত্রী কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিল। গ্রামের প্রান্তে, শহরের গলিপথে, রাস্তায় নকশালদের হিংস্র কার্যকলাপ বাড়তে থাকে ক্রমে। শহরের দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লেখা হয় ‘চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান।’ কলকাতায় বহু মনীষীর মূর্তি ভেঙে দিয়েছিল নকশালরা, এই ঘটনা তো আজ প্রায় কিংবদন্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নকশাল আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

ক্রমশ হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে ওঠা সশস্ত্র নকশাল আন্দোলন সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নকশালদের দমন করবার পরিকল্পনা করতে শুরু করে সরকার। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েই এই সহিংস আন্দোলনকে প্রতিহত করবার কাজে অগ্রসর হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে ভারতীয় সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তায় নকশালদের দমন করবার জন্য শুরু করা হয়েছিল অপারেশন স্টিপলচেজ। পুলিশের ক্ষমতাকে আরও অনেক উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দেখামাত্র গ্রেফতার করা এবং নকশালদেরকে বেলাগাম হত্যার মারণযজ্ঞ শুরু করে দেয় পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী। কেবল গুলি করে হত্যাই নয়, কারাগারে নৃশংসভাবে তাদের অত্যাচার করা হয়। কোনও একজন নকশালকে ধরতে পারলে তাকে ভয়ানক শারীরিক নির্যাতন করে দলের অন্য সদস্যদের কথা বের করে আনার চেষ্টা করত পুলিশ। এমনকি মহিলা নকশালদেরও সেই অত্যাচার থেকে রেহাই দেওয়া হয়নি। প্রচুর তরুণ ছাত্র, যুবকের লাশ তখন কলকাতার অলিতে-গলিতে পড়ে থাকতে দেখা যেত। সন্ধের পরে রাস্তাঘাটে মানুষ দেখা যেত না। পুলিশের কালো ভ্যান টহল দিয়ে বেড়াত গোটা শহরে। নকশালরাও যথাসাধ্য সংঘর্ষ চালিয়ে গিয়েছিল পুলিশের সঙ্গে। আন্দোলনের অনেক সিনিয়ার নেতাকে হত্যা করে পুলিশ, কেউ কেউ কারাবন্দী হন। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে চারু মজুমদারকে গ্রেফতার করা হয় এবং পুলিশি হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অনেকেই বলেন, আসলে ষড়যন্ত্র করে চারু মজুমদারকে খুন করা হয়েছিল। তাঁকে প্রয়োজনীয়, ওষুধ, খাদ্য ইত্যাদি দেওয়া হয়নি। চারু মজুমদারের মৃত্যু নিয়ে এই বিতর্ক রয়ে গেছে।

চারু মজুমদারের মৃত্যু হলে আন্দোলন একটা বড়সড় আঘাত পায়। তাছাড়াও অনেক দিন ধরে নকশালদের মধ্যেও মতপার্থক্য হতে শুরু করেছিল। চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর নকশালদের মধ্যেও কয়েকটি গোষ্ঠী তৈরি হয়ে গেল যেমন, মহাদেব মুখার্জি গোষ্ঠী, সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন গোষ্ঠী ইত্যাদি। ১৯৭৩ সালের মধ্যে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা গ্রেফতার হলে এবং আভ্যন্ত্যরীণ মতভেদ বাড়তে থাকলে মূল দলটি ছোট ছোট ৪০টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে।

সাতের দশকের শেষদিক থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নকশালী কার্যকলাপ মাথাচাড়া দিয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে নকশালরা খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৫ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে এক পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেছিল তারা। আবার ১৯৯০-এর দশকে বিহারে মাওবাদী নকশালরা বেশ কয়েকজন জমিদারকে হত্যা করেছিল। একবিংশ শতকেও মাওবাদী কার্যকলাপ সমানভাবে সক্রিয় থেকেছে। ২০০০ সালে মাওবাদীদের পিপলস লিবারেশ গেরিলা আর্মি প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এমনকি ২০০৪ সালে পিপসল ওয়ার গ্রুপ এবং কমিউনিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়ার একীভূতকরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে সিপিআই (মাওবাদী)। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মাওবাদীরা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা সরকারও তাদের দমন করবার জন্য কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সাতের দশকের নকশাল আন্দোলন প্রস্তাবিত উদ্দেশ্যগুলি পূরণে অসফল হয়েছিল ঠিকই এবং তাদের বিপ্লবের পথটিও নিশ্চয়ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, তবুও তরুণ তাজা অসংখ্য প্রাণ কেবলমাত্র দিনবদলের স্বপ্ন বুকে নিয়ে পরিবার-পরিজনের পিছুটানকে তোয়াক্কা না করে যে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েছিল নির্দ্বিধায়, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘নকশাল আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং বাংলা ছোটগল্পে প্ৰতিভাত জনজীবনে তার প্রত্যক্ষ অভিঘাত ও সীমাবদ্ধতা’, সুবীরকুমার সেন, এথেনা জার্নাল (ভলিউম ৮), জুলাই ২০২৪, পৃষ্ঠা : ১৯২-১৯৯।
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://www.efsas.org//
  4. https://legalserviceindia.com/
  5. https://sspconline.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading