রামানুজনের পর ভারতীয় সংখ্যাতত্ত্বকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করেছিলেন সুব্বায়া শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই (Subbayya Sivasankaranarayana Pillai)। সংখ্যাতত্ত্বে তিনি অসামান্য পণ্ডিত ছিলেন এবং গণিতের নানান নতুন দিক উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর সবথেকে বড় অবদান হল শতাব্দীপ্রাচীন ওয়ারিংস প্রবলেমের আংশিক ও গুরুত্বপূর্ণ সমাধান দেওয়া।
১৯০১ সালের ৫ এপ্রিল তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার বিখ্যাত শহর কোর্টাল্লামের কাছে ভাল্লামে সুব্বায়া শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাইয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সুব্বায়া পিল্লাই এবং মা ছিলেন গোমতী আম্মাল। শিবশঙ্করনারায়ণের জন্মের এক বছর পর তাঁর মা মারা যান। পরিবারের এক বৃদ্ধ আত্মীয়া তাঁকে বড় করেন। তিনি যখন স্কুলে পড়তেন তখন তাঁর বাবাও মারা যান। ছোটবেলায় দুই অভিভাবককে হারানোর ফলে শিবশঙ্করনারায়ণের বড় হওয়ার পথে এসেছিল অনেক বাধা।
ছোট থেকে পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন শিবশঙ্করনারায়ণ। তাঁর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তাঁকে বাড়িতে একজন শিক্ষক পড়াতে আসতেন। মেধাবী শিবশঙ্করনারায়ণের পড়াশোনায় মন ছিল খুব। নয় বছর বয়সে তিনি শেনকোটার একটি মিডল স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ দেখে শিক্ষকরা স্তম্ভিত হয়ে যান। ভবিষ্যতে যে এই ছেলে যে বিখ্যাত কেউ হবেন সেই সম্ভাবনার কথা অনেকেরই মনে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। এই সময় তাঁর মেধা দেখে সাস্ত্রিয়ার নামে একজন শিক্ষক তাঁকে সাহায্য করেন। তাঁর উৎসাহেই পড়শোনায় নিজেকে ডুবিয়ে দেন শিবশঙ্করনারায়ণ। এরপর ম্যাট্রিকুলেশন কোর্সের জন্য তিনি স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই সময়ই তাঁর বাবার আকস্মিক মৃত্যু হয়। আর্থিক দিক থেকে তো তিনি দুর্বল ছিলেনই, এর পর তা আরও বাড়তে থাকে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অকল্পনীয় সংগ্রাম করতে হচ্ছিল তাঁকে।
এক নজরে সুব্বায়া শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই-এর জীবনী:
- জন্ম: ৫ এপ্রিল, ১৯০১
- মৃত্যু: ৩১ আগস্ট, ১৯৫০
- কেন বিখ্যাত: শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই একজন গণিতবিদ যিনি মূলত সংখ্যাতত্ত্বে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিখ্যাত। ওয়ারিংস প্রবলেমে তাঁর গবেষণা, মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান নিয়ে কাজ, এবং তাঁর প্রস্তাবিত পিল্লাই ক্রম’ ও ‘পিল্লাইয়ের অনুমান’ তাঁকে আন্তর্জাতিক গণিতজগতে স্বীকৃতি এনে দেয়। অল্প বয়সে মৃত্যু হলেও তিনি আধুনিক ভারতীয় গণিতের অন্যতম বিশিষ্ট গবেষক হিসেবে স্মরণীয়।
- স্বীকৃতি: মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম ভারতীয় হিসেবে D.Sc. ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।।
এই সময় তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক সাস্ত্রিয়ার কেবল তাঁর স্কুল শিক্ষাই নয় বরং তার বাইরেও পড়াশোনা দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তাঁর আর্থিক সহায়তায় শিবশঙ্করনারায়ণ উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর হন। বৃত্তি নিয়ে তিনি স্কট ক্রিশ্চিয়ান কলেজে ইন্টারমিডিয়েট কোর্স করার জন্য নাগেরকয়েলে যান। সেখান থেকে তিনি বি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি ত্রিবান্দ্রমে মহারাজার কলেজে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ডাবল ব্যাচেলর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, পিল্লাই তাঁর স্নাতক ডিগ্রিতে দ্বিতীয় বিভাগ (second class) পেয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন চিন্না থাম্বি নামে একজন কলেজের অধ্যক্ষ। পিল্লাইয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পথের বাধা সরিয়ে নেওয়ার আর্জি জানিয়ে তিনি একাধিক যুক্তি দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি এও বলেছিলেন, শ্রীনিবাস রামানুজন তাঁর স্কুলের পড়াশোনাও শেষ করেননি। অথচ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ হতে পেরেছিলেন তিনি। চিন্না থাম্বির এই যুক্তির পর পিল্লাইয়ের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রির দরজা খুলে যায়। এরপর তিনি সসম্মানে এম.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯২৭ সালে শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জন অধ্যাপক কে আনন্দ রাউ এবং রামাস্বামী এস বৈদ্যনাথস্বামীর সঙ্গে কাজ করার জন্য ফেলোশিপ পান। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে গণিতে তাঁর অবদান ও গবেষণার সাফল্যের জন্য ডি.এসসি. (Doctor of Science) প্রদান করে। তিনিই প্রথম ভারতীয় গণিতবিদ যিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এই সম্মান পেয়েছিলেন। ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত মোট ১২ বছর আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক (lecturer) হিসেবে কাজ করেন তিনি। সেখানে গণিতে তাঁর সাফল্য তুঙ্গে ওঠে বলে মনে করা হয়। আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ওয়ারিংস প্রবলেম (Waring’s problem) নিয়ে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজটি করেছিলেন।
১৭৭০ সালে ইংরেজ গণিতবিদ এডওয়ার্ড ওয়ারিং কর্তৃক প্রস্তাবিত সমস্যাটি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত গণিতবিদদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক পেশাদার গণিতবিদ একাধিক উপায়েও এই সমস্যার সমাধান করে উঠতে পারেননি। শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই এই সমস্যার আংশিক সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল দেন। বিশেষত, k≥6 এর জন্য তিনি প্রমাণ দেন, একই সময়ে মার্কিন গণিতবিদ লিওনার্ড ইউজিন ডিকসন (Leonard Eugene Dickson) k≥7 এর জন্য ফলাফল প্রমাণ করেন।
ওয়ারিংস প্রবলেম ছাড়াও সংখ্যাতত্ত্বে তাঁর একটি বড় অবদান হল পিল্লাই ক্রম (The Pillai sequence)। পিল্লাই ক্রম 1, 4, 27, 1354, …, একটি দ্রুত বর্ধনশীল পূর্ণসংখ্যা ক্রম যেখানে প্রতিটি পদ হল পূর্ববর্তী পদ এবং একটি মৌলিক সংখ্যা যার পরবর্তী মৌলিক ব্যবধান পূর্ববর্তী পদের চেয়ে বড় তাদের যোগফল। পিল্লাই সংখ্যাগুলিকে মৌলিক সংখ্যার যোগফল হিসাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে (connection with representing numbers as sums of prime numbers) এটি উদ্ভাবন করেছিলেন। অন্যদিকে পিল্লাইয়ের অনুমান (Pillai’s conjecture) মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান সম্পর্কিত, যা আজও উন্মুক্ত সমস্যা হিসেবে গণিতবিদদের সামনে রয়ে গেছে। এছাড়া মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান (prime gap) ও সংখ্যাকে মৌলিক সংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর কাজ তাঁকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এনে দেয়।
১৯৪১ সালে শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই ত্রিভাঙ্কুর বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং এর এক বছর পরে ফ্রিডরিখ উইলহেম লেভির আমন্ত্রণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। গণিতে একের পর এক নতুন পথ উন্মোচনে ততদিনে শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাইয়ের নাম বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পেয়েছে। সীমিত সম্পদ এবং সামান্য সরকারি সাহায্য নিয়েই তিনি বছরের পর বছর গণিতচর্চা করেছেন এবং একের পর এক নতুন দিক উন্মোচন করেছেন। রামানুজনের পর ভারতীয় গণিতচর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই। তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও গণিতে তাঁর অসামান্য জ্ঞানের জন্য ১৯৫০ সালের অগাস্ট মাসে তাঁকে এক বছরের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক গণিতবিদদের কংগ্রেসে অংশগ্রহণের জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই এমন একজন গণিতবিদ যাঁকে তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
কিন্তু ভাগ্য তাঁর পথ রোধ করে দেয়। ১৯৫০ সালের ৩১ আগস্ট তিনি আমেরিকা যাওয়ার পথে রোমগামী বিমানের এক যাত্রাবিরতিতে কায়রোর কাছে মিশরে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার শিকার হন। TWA Flight 903 দুর্ঘটনায় মোট ৫৫ জন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সুব্বায়া শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাইও ছিলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৯ বছর।
গণিতবিদ্যায় তাঁর অসাধারণ অবদান ছিল। গণিতের বিভিন্ন বিষয়ের উপর নিজের গবেষণা নিয়ে তিনি ৭৬টি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। সেগুলি আর বালাসুব্রহ্মণ্যম এবং আর থাঙ্গাদুরাইয়ের ‘শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাইয়ের সংগৃহীত কাজ’ (Collected Works of S. S. Pillai) বইতে সংকলিত হয়। ২০০৯ সালে এটি রামানুজন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়।
বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজন এবং শিবশঙ্করনারায়ণ পিল্লাই – দু’জনেই দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে উঠে এসেছিলেন। গণিতের প্রতি আগ্রহ, ভালবাসা ও অধ্যাবসায় তাঁদের একটার পর একটা গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সফল করে। বিশ্বের দরবারে এই দুই গণিতবিদ নিজেদের মেধা ও গবেষণার কারণে সমাদৃত হয়েছিলেন। কিন্তু রামানুজন যতটা পরিচিতি পেয়েছিলেন, পিল্লাই ততটা পাননি। রামানুজন সংখ্যাতাত্ত্বিক জি এইচ হার্ডির সমর্থন পেয়ে ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পিল্লাইয়ের অসামান্য কাজ আজ কেবল গণিত জগতেই স্বীকৃত ও সীমাবদ্ধ। হয়ত আইনস্টাইনের সঙ্গে কাজ করলে তাঁর নামও জানত বৃহত্তর সমাজ। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনা পিল্লাইয়ের থেকে সেই সুযোগ ছিনিয়ে নিল। বিশ্ব হারাল এক তুখোড় ও মেধাবী গণিতবিদকে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান