খ্রিস্ট পূর্ববর্তী যুগে গ্রিক দেশের এথেন্সে এক মহান নাট্যকার ছিলেন যাঁর নাম ছিল ইস্কিলাস (Aeschylus)। তাঁর নামের উচ্চারণের ভিন্নতা দেখা যায়,যেমন – এস্কিলাস বা ইস্কাইলাস বা অ্যাস্কাইলাস। তিনি ছিলেন এথেন্সের প্রথম দিককার নাট্যকার, যিনি ট্র্যাজেডির উদীয়মান শিল্পকে কবিতা এবং নাট্যশক্তির মাধ্যমে উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইস্কিলাসকে বলা হয় ‘ট্র্যাজেডির জনক’।
৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসের তৎকালীন রাজধানী এথেন্স থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে একটি ছোট শহর এলিউসিসে ইস্কিলাসের জন্ম হয়। এই শহর গ্রিসের পশ্চিম অ্যাটিকার উপত্যকায় অবস্থিত। তবে তাঁর জন্মের সময় নিয়ে মতান্তর আছে। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন তাঁর জন্ম সম্ভবত গ্রেট ডায়োনিসিয়ায় তাঁর প্রথম বিজয়ের ৪০ বছর আগে গণনার ভিত্তিতে তৈরি। ইস্কিলাসের পরিবার ছিল ধনী এবং সমাজে তাদের মান্যগণ্য পরিবার হিসেবে সম্মান দেওয়া হত। তাঁর পিতা ইউফোরিয়ন ছিলেন অ্যাটিকার প্রাচীন অভিজাত ইউপাট্রিডের সদস্য। তবে এ নিয়েও দ্বিধায় ঐতিহাসিকরা। অনেকের মতে, তৎকালীন গ্রিসের মানুষ ইস্কিলাসের নাটকের পরিচিতি, জাঁকজমকপূর্ণতা ইত্যাদি বর্ণনা করার জন্য এমন এক কাল্পনিক কাহিনীর উদ্ভব করেছিলেন। তাঁর সিনেগেইরাস এবং আমেনিয়াস নামে দুই ভাই ছিল। ইস্কিলাসের দুই পুত্রের নাম ছিল ইউফোরিয়ন এবং ইউয়েওন যাঁরা পরবর্তীকালে কবি হিসেবে পরিচিতি পান। ইউফোরিয়ন ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নাট্য প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার জিতেছিলেন। তাঁর ভাগ্নে ফিলোক্লেসও একজন ট্র্যাজিক কবি।
তাঁর জীবনের সময়কাল ছিল অস্থির রাজনৈতিক যুগ। তখন এথেন্সের গণতন্ত্র স্বৈরাচারী শাসক, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ও পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল। ইস্কিলাস নিজেও সৈনিক ছিলেন। তিনি অংশ নেন ম্যারাথনের যুদ্ধ, আর্টেমিসিয়াম ও সালামিসের যুদ্ধ এবং প্লাটেয়ার যুদ্ধে ।
ইস্কিলাস ট্র্যাজিক নাটকের জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি প্রথমবার ২৬ বছর বয়সে ৪৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সের প্রধান নাট্য প্রতিযোগিতা গ্রেট ডায়োনিসিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ৪৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নাট্য প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম জয়লাভ করেন। একদিকে যখন নাট্যচর্চা চলছে, অন্যদিকে তিনি ম্যারাথনের যুদ্ধে (Battle of Marathon) অংশ নেন ও আহত হন। গ্রিক ইতিহাসবিদদের কথা অনুযায়ী, সেটি ছিল ৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর। তাঁর ভাই সিনেগেইরাস (Cynegeirus) এই যুদ্ধে শহিদ হন। ইস্কিলাস বহু বছর পরে নিজের জন্য লেখা পদ্যে এই সমস্ত ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ৪৮০ সালে পারস্যরা আবার গ্রিস আক্রমণ করে এবং ইস্কিলাস তাঁর ভাই আমেনিয়াসের সঙ্গে আর্টেমিসিয়াম এবং সালামিসের (Artemisium and Salamis) যুদ্ধক্ষেত্রে যান। এছাড়া ৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্লাটিয়ার যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধের কথা তাঁর নাটক ‘পারসিয়ানস’-এ (Persians) প্রকাশিত হয়েছিল। এই নাটকটি ৪৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মঞ্চস্থ হয়েছিল এবং প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেছিল। এই সময়েই তিনি সিসিলিতে এসেছিলেন এবং সিরাকিউসে (Syracuse) অত্যাচারী শাসক হিয়েরন প্রথমের (Hieron I) দরবারে এটি উপস্থাপন করেছিলেন। এছাড়া তিনি ‘দ্য উইমেন অফ এটনা’ প্রযোজনা করেছিলেন। তিনি পেরিক্লিসের (Pericles) সঙ্গেও কাজ করেছিলেন।
নাটকের জগতে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য ইস্কিলাসকে জনপ্রিয় করেছিল। তবে শোনা যায় ৪৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ডায়োনিসিয়ান উৎসবে সোফোক্লিসের (Sophocles) কাছে ইস্কিলাস একবার পরাজিত হয়েছিলেন কিন্তু নিজেকে ফের প্রমাণ করেন তিনি। ওরেস্তিয়া ট্রিলজি (Oresteia trilogy) তৈরি করার পর তিনি আবার সিসিলিতে যান।
জীবদ্দশায় ইস্কিলাস ৭০ থেকে ৯০টি নাটক লিখেছিলেন যার মধ্যে রয়েছে স্যাটায়ার এবং ট্র্যাজেডি। তাঁর রচিত মাত্র সাতটি ট্র্যাজেডি সম্পূর্ণরূপে টিকে আছে। দ্য পারসিয়ানস (The Persians), সেভেন অ্যাগেইনস্ট থিবস (Seven Against Thebes), দ্য সাপ্লিয়েন্টস (The Suppliants), দ্য ওরেস্তিয়া নামে পরিচিত ত্রয়ী- অ্যাগামেমনন, দ্য লিবেশন বিয়ারার্স এবং দ্য ইউমেনাইডস (the trilogy known as The Oresteia- the three tragedies Agamemnon, The Libation Bearers and The Eumenides), এবং প্রমিথিউস বাউন্ড (Prometheus Bound)। শেষের নাটকটির লেখক ইস্কিলাস কিনা তা নিয়ে অবশ্য এখনও বিতর্ক চলছে। এই নাটকটি ছাড়া তাঁর সমস্ত ট্র্যাজেডি সিটি ডায়োনিসিয়ায় প্রথম পুরস্কার জিতেছিল। সরকারি তথ্য অনুসারে তিনি ১৩টি নাটক মঞ্চস্থ করে জয়ী হয়েছিলেন যার অর্থ তাঁর অর্ধেকেরও বেশি নাটক দর্শক পছন্দ করে এবং সেগুলিই জয়লাভ করে। দার্শনিক ফ্ল্যাভিয়াস ফিলোস্ট্রাটাস ইস্কিলাসকে ‘ট্র্যাজেডির জনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তাঁর মধ্যে সংযুক্ত ত্রয়ী লেখার প্রবণতা ছিল যেখানে প্রতিটি নাটক একটি ধারাবাহিক নাটকীয় আখ্যানের একটি অধ্যায় হিসেবে রচিত হয়। এর অন্যতম উদাহরণ হল ‘ওরেস্তিয়া’। ট্র্যাজিক ত্রয়ী ছাড়াও তিনি স্যাটায়ার নাটক তৈরি করেছিলেন যেগুলি পৌরাণিক কাহিনী থেকে লেখা। ‘ওরেস্তিয়া’ অনুসরণকারী স্যাটায়ার নাটক ‘প্রোটিয়াস’ ট্রোজান যুদ্ধ থেকে বাড়ি ফেরার পথে মেনেলাউসের মিশরে ভ্রমণের গল্পটি তুলে ধরেছিল। ‘সেভেন অ্যাগেইনস্ট থিবস’ ছিল ‘ওডিপাস ত্রয়ী’র (Oedipus trilogy) শেষ নাটক, ‘দ্য সাপ্লিয়েন্টস’ ছিল ‘ড্যানাইড ত্রয়ী’র (Danaid trilogy) প্রথম নাটক এবং ‘প্রোমিথিউস বাউন্ড’ ছিল ‘প্রমিথিউস ত্রয়ী’র (Prometheus trilogy) প্রথম নাটক। ইস্কিলাস রচিত ত্রয়ীগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি ট্রোজান যুদ্ধ সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘দ্য অ্যাওয়ার্ড অফ দ্য আর্মস’ (The Award of the Arms), ‘দ্য ফ্রিজিয়ান উইমেন’ (The Phrygian Women) এবং ‘দ্য সালামিনিয়ান উইমেন’ (The Salaminian Women) গ্রিক বীর অ্যাজাক্সের (Ajax) উন্মাদনা এবং পরবর্তী আত্মহত্যার একটি ত্রয়ী রচনা।
যুদ্ধের পরে তিনি ওডিসিয়াসের (Odysseus) ইথাকাতে (Ithaca) ফিরে আসার ত্রয়ী রচনা করেছিলেন যার মধ্যে রয়েছে ‘দ্য সোল-রেজারস’ (The Soul-raisers), ‘পেনেলোপ’ (Penelope) এবং ‘দ্য বোন-গেদারার্স’ (The Bone-gatherers)। অন্যান্য প্রস্তাবিত ত্রয়ীতে জেসন এবং আর্গোনটদের পৌরাণিক কাহিনী (‘আর্গো’, ‘লেমনিয়ান ওম্যান’, ‘হাইপসিপিলে’), পার্সিয়াসের জীবন (‘দ্য নেট-ড্র্যাগারস’, ‘পলিডেকটেস’, ‘ফোরকাইডস’), ডায়োনিসাসের জন্ম ও শোষণ (‘সেমেল’, ‘বাচ্চে’, ‘পেন্টেউস’) ইত্যাদি চিত্রিত রয়েছে।
ট্র্যাজেডি রচনা এবং নাটক মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রে ইস্কিলাস ছিলেন অদ্বিতীয়। নাটকের সংলাপ, নাটকীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং প্লট নির্মাণে বৈচিত্র্য এনেছিলেন তিনি। অ্যারিস্টটল তাঁর পোয়েটিক্সে বলেছেন, ইস্কিলাস নাটকে কোরাসের ভূমিকা হ্রাস করেছিলেন এবং প্লটকে প্রধান অভিনেতার মর্যাদা দিয়েছিলেন। নাটকে এছাড়াও অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। তিনি মঞ্চ পরিবেশ এবং মঞ্চে যন্ত্রপাতির ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। নিজের নাটকের পোশাকের নকশাও বানাতেন তিনি। সংলাপ এবং কোরাল লিরিক উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি নাটকে রূপক ব্যবহার করতেন। সমগ্র নাটক জুড়ে একটিই মাত্র চিত্রকে ধরে রাখা তাঁর নাটকের বৈশিষ্ট্য যেমন- ‘সেভেন অ্যাগেইনস্ট থিবস’-এ (Seven Against Thebes) রাষ্ট্রের জাহাজ, ‘সাপ্লিমেন্টস’-এ (Suppliants) শিকারী পাখি, ‘অ্যাগামেমনন’-এ (Agamemnon) ফাঁদ। ইস্কিলাস তাঁর কোনও একটি নাটক বা ত্রয়ী নাটক (trilogy of plays) জুড়ে বেশ কয়েকটি প্রধান মোটিফ (motifs) ব্যবহার করেন যা মূলত কোনও নির্দিষ্ট শব্দ বা শব্দগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ওরেস্তিয়ায় (Oresteia) ক্রোধ, প্ররোচনা, আলো ও অন্ধকারের বৈপরীত্য, শোক এবং বিজয়ের গান সমগ্র ত্রয়ী বা ট্রিলজি জুড়ে চলে। যত্নশীল প্লট নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ধরণের নাটকীয় অর্কেস্ট্রেশন ইস্কিলাসকে গ্রিক নাট্যজগতে অন্যদের থেকে আলাদা করে। তাঁর নাটককে শৈল্পিক এবং বৌদ্ধিক রূপ দিতে একধাপ এগিয়ে দেয় এই সমস্ত চিন্তাভাবনা ও উপাদান। ইস্কিলিয়ান ট্র্যাজেডি ব্যক্তিদের দুর্দশা, সিদ্ধান্ত এবং ভাগ্য নিয়ে কথা বলে যেগুলি সঙ্গে কোনও সম্প্রদায় বা রাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
৪৫৬ বা ৪৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিসিলিতে গেলা শহর পরিদর্শনে এসে ৬৯ বছর বয়সে ইস্কিলাসের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু নিয়ে একটি হাস্যকর গল্প প্রচলিত রয়েছে। সেটি হল যে একটি ঈগল তাঁর মাথায় একটি কচ্ছপ ফেলে দিলে তিনি নিহত হন। মনে করা হয় পরবর্তীকালের একজন কমিক লেখক এই গল্পটি তৈরি করেছিলেন। গেলায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা হয়। ইস্কিলাসের কাজকে এথেনিয়ানরা এতটাই সম্মান করেতেন যে তাঁর মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রতিযোগিতাগুলিতে তাঁর ট্র্যাজেডিগুলি পুনর্নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সমাধিতেও নাটক পরিবেশিত হয়, যা পরবর্তীকালে লেখকদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান