ইতিহাস

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রম্য লেখক হিসেবে পরিচিত সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (Sanjib Chattopadhyay)। তাঁর রচনার প্রসাদগুণের পাশাপাশি তীক্ষ্ণ জীবনদৃষ্টি ও হিউমার পাঠককে আকৃষ্ট করে। মূলত হাসি-মজার গল্প-উপন্যাস এবং শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাহিত্য রচনার জন্য তিনি বিখ্যাত। কিন্তু একাধারে সিরিয়াস সাহিত্য রচনাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। অতি সম্প্রতি তাঁর লেখা ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও শ্রীরামকৃষ্ণবিবেকানন্দের জীবনের অসংখ্য কাহিনী, তাঁদের জীবনদর্শন এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিকতার মোড়কে বারবার উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। ‘শ্বেতপাথরের টেবিল’ তাঁর লেখা অন্যতম জনপ্রিয় একটি উপন্যাস। গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে নাট্য আন্দোলনে জড়িত থাকার সময় বেশ কিছু নাটকও লিখেছিলেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। ‘দেশ’ পত্রিকায় সঞ্জয় ছদ্মনামে প্রকাশিত ‘জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গ’ নামের ধারাবাহিক লেখার জন্য তিনি সমাদৃত হয়েছিলেন।

১৯৩৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবা একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্য থেকে শুরু করে ইংরেজদের আদব-কায়দায় কেতাদুরস্ত করে সঞ্জীবকে গড়ে তোলাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। শৈশবে বাবার সঙ্গেই ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বহু সময় কাটিয়েছেন সঞ্জীব। কলকাতার বাড়িতে তাঁর বাবার নিজস্ব গবেষণাগার ছিল, সেখানে ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো মানের ফাউন্টেন পেনের কালি, সাবান ইত্যাদি তৈরি করে তিনি বিলি করতেন। এই গবেষণাগারে বাবাকে সাহায্যও করেছেন তিনি। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ঠাকুরদা দর্শনে স্নাতকোত্তর পাশ করে বরানগরের ভিক্টোরিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন ছিলেন। হুগলীতে সঞ্জীবের প্রপিতামহের জমিদারি ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর পরে সেখানে জমি-জায়গা নিয়ে অশান্তি শুরু হলে সঞ্জীবের ঠাকুরদা মুণ্ডিত মস্তকে সদ্য উপবীত ধারণ করে নৌকা করে বরানগরে চলে আসেন। বরানগরের এক নামী ডাক্তারের সৌজন্যে ও সহৃদয়তায় তাঁর বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন সঞ্জীবের ঠাকুরদা এবং সেখান থেকেই ডাক্তারবাবুর প্রচেষ্টায় কলকাতার জেনারেল এসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি। সঞ্জীবের ঠাকুমা ছিলেন ঢাকা বিক্রমপুরের মহিলা এবং দিদিমা ছিলেন যশোরের জমিদার। সঞ্জীবের বাবা বিজ্ঞান চিন্তার পাশাপাশি খুব ভালো এস্রাজ বাজাতে পারতেন, প্রাথমিক পর্বে সঞ্জীবের সঙ্গীতগুরু ছিলেন তাঁর বাবা-ই। অন্যদিকে তাঁর মামাও ছিলেন খুব গুণী সঙ্গীতশিল্পী। পরিবারে ছোটবেলা থেকেই মা, জ্যাঠাইমাকে স্বাধীনভাবে কাজ-কর্ম করতে দেখেছেন সঞ্জীব। খেলাধুলো, ছবি আঁকা এমনকি নিজের প্রসাধনের ব্যাপারেও সঞ্জীবকে উৎসাহ ও সচেতনতা জুগিয়েছিলেন তাঁর জ্যাঠাইমা। সঞ্জীবের যখন ৫ বছর বয়স তাঁর মা মারা যান। একদিকে শাক্ত ঠাকুরদা, গৃহী সন্ন্যাসীর মত বাবার জীবনাচরণ আর অন্যদিকে মায়ের মৃত্যুর পরে ঈশ্বরচিন্তার প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই একটা আধ্যাত্মিক মনন গড়ে উঠেছিল তাঁর মধ্যে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

১৯৪৭ সালে বরানগরের কুঠিঘাট সংলগ্ন ভিক্টোরিয়া স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় । তৎকালীন সময়ে বাড়িতেই ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা শিখিয়ে একটু বেশি বয়সেই তাঁদের স্কুলে ভর্তি করা হত। ঐ স্কুলেই শিক্ষক হিসেবে ফরিদপুরের দীনেশবাবুর শিক্ষণ-নৈপুণ্যে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ গড়ে ওঠে তাঁর। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ভিক্টোরিয়া স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা ‘ভবিষ্যতে আমরা’-র জন্য গান্ধীজির জীবনী লেখার ভার চেপেছিল বালক সঞ্জীবের উপর। গান্ধীজির আত্মজীবনী, জীবনী ইত্যাদি পড়ে সেই লেখার পাশাপাশি সাধু-সন্তদের জীবনের প্রতি আকর্ষণ জন্মায় তাঁর। মনে মনে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ক্রমেই বাড়তে থাকে সঞ্জীবের। তারপর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য স্নাতক স্তরে ভর্তি হন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় । স্কুলে পড়াকালীনই তিনি লক্ষ্য করেন গঙ্গার ওপারে হোর্ডমিলারের পাট গুদাম দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল উদ্বাস্তু শিবির। সদ্য দেশভাগ হয়েছে তখন। এমনকি একদিন শরৎচন্দ্র বসুকে সঙ্গে নিয়ে ঐ শিবির পরিদর্শনের জন্য জওহরলাল নেহরুকেও বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছিলেন কিশোর সঞ্জীব। কলেজে পড়ার সময় নাট্যকার গিরিশ ঘোষের ‘ম্যাকবেথ’ নাটক অনুবাদের কাহিনী বইতে পড়ে অতি উৎসাহী হয়ে নিজেই শেক্সপীয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটক অনুবাদের কাজে উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। স্কটিশ চার্চ কলেজের একটি পত্রিকায় প্রথম গল্প লিখে পাঠিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সে গল্প সম্পাদকের নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

দেওঘর রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় । এই প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সময়ই সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। দেওঘর থেকে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়। এরপরে ক্যালকাটা কেমিক্যালস কোম্পানিতে কেমিস্ট হিসেবে যোগ দেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় । সেই সময় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেন সঞ্জীব। ক্রমে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কটেজ অ্যান্ড স্মল স্কেল ইন্ড্রাস্ট্রিজ ডিপার্টমেন্টে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হন তিনি। এই চাকরির সূত্রেই পাবলিক রিলেশনশিপ ম্যানেজার পদাধিকারে পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি, বহু অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। তাঁর সেই সময়কার কাজটিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জার্নালিজম বলা চলে। ইতিমধ্যে ১৯৭২ থেকে বরানগর সহ সমগ্র বাংলা জুড়ে শুরু হয়েছে নকশাল আন্দোলন। গ্রেট বরানগর কিলিং-এর মত বীভৎস ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। এরপরে একই প্রেক্ষাপটে ঐ পত্রিকাতেই দ্বিতীয় আরেকটি গল্প লেখেন সঞ্জীব। সেই সময় অমৃত পত্রিকার সম্পাদক ভবানী মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখা তৃতীয় গল্পটি পড়ে তা ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক বিমল করের কাছে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। তাঁরই পরামর্শে বিমল করের সঙ্গে আলাপ হয় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের এবং কিছুদিনের মধ্যেই ‘চকমকি’ নামে তাঁর গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটাই ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা প্রথম গল্প। এই গল্পের মূল কাহিনী গড়ে উঠেছিল তাঁরই এক মহিলা সহকর্মীকে কেন্দ্র করে। ‘দেশ’ পত্রিকায় গল্প প্রকাশের পরপরই অগ্রজ সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্র, শ্রদ্ধেয়া গৌরী আইয়ুব এবং আবু সয়ীদ আইয়ুব, বিমল মিত্র প্রমুখরা পত্রিকা দপ্তরে চিঠি লিখে তাঁর সুখ্যাতি করেছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যে এক নতুন লেখকের আবির্ভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তবে এই গল্প প্রকাশের আগে বিমল করের পরামর্শে তাঁর গ্রামে গ্রামে ঘোরার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধারাবাহিকভাবে সঞ্জয় ছদ্মনামে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গ’। এই লেখাটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য ‘স্টেটসম্যান’ হাউজের পক্ষ থেকে কান্ট, হিউম, হেগেল প্রমুখের দর্শনের উপর প্রকাশিত সুদৃশ্য বইগুলি পড়ে মানুষ নামে একটি দার্শনিক প্রবন্ধ লেখেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় যা ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় ছাপা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য এই বইগুলি তিনি পেয়েছিলেন তাঁরই পরিচিত ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকার কর্মী কেদার ঘোষ মহাশয়ের সৌজন্যে।

‘দেশ’ পত্রিকার শারদ সংখ্যায় এরপরে তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘পায়রা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং এই উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গৌরী আইয়ুব নিজের উদ্যোগে উপন্যাসটি থেকে চলচ্চিত্র তৈরি করা যায় কিনা সে পরামর্শ চাইতে ছুটে গিয়েছিলেন বরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কাছে। তারপরে তাঁর লেখা আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় – ‘শ্বেত পাথরের টেবিল’। তাঁর লেখায় বারবার উঠে আসে যৌথ পরিবার, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাঙালি মধ্যবিত্তের নস্ট্যালজিয়া ইত্যাদি। এমনকি মানুষের পাশপাশি পশু-পাখিরাও তাঁর উপন্যাসে, গল্পে জায়গা করে নেয়। ‘রুকু-সুকু’, ‘পায়রা’ এই জাতীয় রচনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। জীবনের একেবারে প্রাত্যহিক তুচ্ছ মুহূর্তগুলিও তাঁর লেখায় সুনিপুণ সুষমা পায়। এছাড়া তাঁর লেখার, হিউমার, পীড়িতের প্রতি করুণা, শোক, হাসি, উচ্ছ্বলতা সব কেমন মিলেমিশে এক অন্যতর আবহ সৃষ্টি করে। গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে নাট্য আন্দোলনে জড়িত থাকার সময় বেশ কিছু নাটকও লিখেছিলেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা অন্যান্য বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য রচনা হল – ‘ক্যানসার’, ‘দুটি চেয়ার’, ‘রশে বশে’, ‘তুমি আর আমি’, ‘একা একা’, ‘কলকাতা আছে কলকাতাতেই’, ‘শিউলি’, ‘মাপা হাসি চাপা কান্না’, ‘উজান বেয়ে যাই’, ‘হালকা হাসির চোখের জল’ ইত্যাদি। মেজমামা ও বড়মামা এই দুই চরিত্রকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর সব গল্পগুলি ‘মামা সমগ্র’ নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর লেখা সবথেকে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় রচনা দুই খণ্ডের ‘লোটাকম্বল’ একটি উৎকৃষ্ট আত্মজৈবনিক উপন্যাস।

১৯৮১ সালে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করে। সম্প্রতি ২০১৮ সালে ৮২ বছর বয়সে তাঁর লেখা ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।  

বর্তমানে বহু পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত রামকৃষ্ণদেবস্বামী বিবেকানন্দের জীবন অবলম্বনে বহু লেখা লিখে চলেছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘পরমপদকমলে’ নামের রচনাটি যা পরে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছে।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন