ইতিহাস

মতিলাল শীল

বাংলায় নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়  যুক্তির আঘাতে ছিঁড়তে চেয়েছিলেন সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি। কঠিন ছিল তাঁর পথচলা। তারপর বিদ্যাসাগর রামমোহনের শুরু করা কাজ অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মধ্যবর্তী সময়ে আরেক মহামানব ছিলেন যাঁকে আমরা মনে রাখিনি, তিনি মতিলাল শীল যাঁর কাজের সঙ্গে রামমোহন-বিদ্যাসাগরদের কাজের মিল আছে।

মতিলাল শীল নিম্নবিত্ত পরিবারে ১৭৯২ সালে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা চৈতন্যচরণ শীলের কাপড়ের ব্যবসা ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতাকে হারানোয় উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনি পাঠশালার পাঠ শেষ করে মার্টিন বোল(Martin Bowl)-এর ইংরেজি স্কুলে পড়েন এবং সবশেষে বাবু নিত্যানন্দ সেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাশ করেন। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে না পারলেও তাঁর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা ছিল প্রখর। ইংরেজ কোম্পানির অধীনে সামান্য বেতনে কিছুকাল চাকরি করেন। তারপর অল্প পুঁজি নিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করে উন্নতির শিখরে উঠেছিলেন।

তখন সফল হওয়ার পূর্বশর্ত ছিল ইংরেজ ঘনিষ্ঠতা ও আনুগত্য। তিনি ইংরেজ কোম্পানিতে চাকরি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন কিন্তু পদলেহন করেননি। সবসময় চলেছেন আত্মমর্যাদা রক্ষা করে। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া রায়বাহাদুর, স্যার ইত্যাদি খেতাব গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন না। তৎকালীন সময়ে যা এক বিরল ব্যতিক্রম।

মতিলাল ছিলেন সুবর্ণ বণিক সম্প্রদায়ের মানুষ। সে যুগে সুবর্ণ বণিকদের হাঁড়ি, ডোম, মেথর ইত্যাদি অন্তজ শ্রেণীর মধ্যে ধরা হত। আজ থেকে দুশো বছর আগে আজকের তুলনায় অন্তজদের জীবন অনেক বেশি দুর্বিসহ ছিল। দুঃসহ লজ্জা-ঘৃণার মধ্যেও ‘বঙ্গের সওদাগর’ মতিলাল এক দরিদ্র যুবক থেকে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনীতে পরিণত হন।

মাত্র সতেরো বছর বয়সে ১৮০৯ সালে সুরতী বাগানের মোহনচাঁদ দে-র কন্যা নাগরী দাসীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের পর মোহনচাঁদ কন্যা, জামাতাসহ পরিবারের অন্যদের নিয়ে পানসি নৌকায় ভ্রমণে কাশী, গয়া, বৃন্দাবন, মথুরা, জয়পুর দর্শনে যান। মতিলাল অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফেরেন। এরপর শুরু হয় সংসারজীবন। অনেক আগেই বন্ধ হয়েছে চীনা বাজারে তাঁদের কাপড়ের দোকান। তিনি ১৮১৫ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে কর্মচারী হয়ে যোগ দেন। পরে ‘গুদাম-সরকার’ হন। এখানে তিনি দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করেও কিছু বাড়তি রোজগার করতেন। ফোর্ট উইলিয়ামের কাজে ইস্তফা দিয়ে তিনি কিছুদিনের জন্য বালিখালের কাস্টমস দারোগার চাকরি করেন। তবে ব্যবসায় ছিল তাঁর তীব্র অনুরাগ।

১৮১৯ সালে এক জায়গায় অত্যন্ত কম দামে প্রচুর খালি বোতল বিক্রি হচ্ছে দেখে বুদ্ধি করে তিনি সব কিনে নেন। কিছুদিনের মধ্যেই একটি মদ তৈরির কোম্পানি তাঁর বোতল বেশি দামে কিনে নেয় ফলে তাঁর যা লাভ হয় তা দিয়ে ঋণ শোধ করেও ব্যবসার একটা পুঁজি তৈরি হয়। এই যে ঠিক সময়ে কম দামে কিনে সঠিক সময়ে চড়া দামে বেচে দেওয়া এটাই মুনাফা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। তার জন্য বুদ্ধি লাগে এবং তা ছিলও তাঁর; আর ছিল সাহস করে নেমে পড়ার মানসিকতা।

১৮২০ সালে ইংল্যান্ডে ‘ফ্রি ট্রেড’ আইন চালু হয়। স্ট্যান্ড ফ্লাওয়ার মিলের বেনিয়ান হয়ে মতিলাল প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেন। তিনি মেসার্স লিচ কেটেল অয়েল, লিভিংস্টোন সাইরেসেস অ্যান্ড কোং, ম্যাকলিয়ড ফ্যাগান অ্যান্ড কোং, চ্যাপম্যান কোং, টুলো অ্যান্ড কোং, র‍্যালি ম্যাভ্রোজানি, ওসওয়াল্ড শীল অ্যান্ড কোং প্রভৃতি কোম্পানির বেনিয়ান হিসেবে কাজ করেন। এভাবে প্রায় ১৪-১৫ বছর তিনি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বেনিয়ান হিসেবে কাজ করেন। বিদেশি জাহাজের বণিকরা আমদানি করা সামগ্রী বিক্রি করার জন্য তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। প্রতিভার গুণেই তিনি এ-সুযোগ পান। তাছাড়া এদেশীয় বাজার থেকে সস্তায় দেশীয় দ্রব্যসামগ্রী ইউরোপীয় বণিকদের জন্য ক্রয় করে দেওয়া সেকালে তাঁর মতো আর কেউ পারতেন না। এইভাবে মতিলাল এদেশীয় ও বিদেশীয় বাণিজ্যিক লেনদেনে একটা যোগসূত্রের কাজ করেছেন আর অর্থ রোজগার করেছেন প্রচুর।

মাঝে একটা সমস্যার উদয় হল। এতদিন এই দেশের বণিকদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশিরা ব্যবসা করতেন। দেশীয় বণিকরা খেয়াল করলেন যে, তাঁদেরই টাকা খাটিয়ে বিদেশিরা মুনাফা করছেন তাঁদের থেকে অনেকগুণ বেশি। দেশীয় বণিকরাও আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করলেন। বাজার দখল নিয়ে দেশীয় ও বিদেশি বণিকদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা দেখা দিল। পুঁজির অভাবে অনেক বিদেশি বণিকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। অনেকে বিশাল সম্পদের মালিক হলেন এই সুযোগে। তাঁদের মধ্যে মতিলাল শীল, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামদুলাল দে, নিমাইচরণ দত্ত, প্রাণকৃষ্ণ লাহা, অক্রূর দত্ত, সাগরলাল দত্ত প্রমুখের নাম বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন।

মতিলাল এদেশ থেকে রেশম, নীল, চিনি, সোরা, চাল ইত্যাদি ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করতেন এবং ইউরোপ থেকে আমদানি করতেন বস্ত্র ও লৌহজাত সামগ্রী। বাংলার বাণিজ্যক্ষেত্রে জোয়ার এসেছে তখন। পুরাকালের গৌরব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল আবার।

এই সময় বাংলার বহির্বাণিজ্যে নেতৃত্ব দিলেন মতিলাল শীল। তিনি জাহাজের কারবারে মন দিলেন। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় বারো-তেরোটি জাহাজের মালিক হলেন তিনি। একটি জাহাজের নাম বড় মেয়ে রাধারাণীর নামেও রাখেন। দেশি পণ্য নিয়ে তাঁর জাহাজ ভিড়েছে পৃথিবীর নানান বন্দরে এবং ফিরেছে সেসব দেশের সামগ্রী নিয়ে।

প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও তখন জাহাজ তৈরি করছেন গার্ডেনরিচে। মতিলালও থেমে থাকলেন না। অন্যদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন এবং তৈরি করলেন বাষ্পীয় জাহাজ, যা এদেশে প্রথম এবং পথিকৃৎ মতিলাল শীল।

তবে ব্যবসায় বাঙালির সুদিন থাকল না বেশিকাল। দেশি ও বিদেশি পুঁজিপতিদের মধ্যেকার বিরোধে বিদেশি বণিকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ইংরেজ শক্তির আনুকূল্য পেল। দেশীয় উদ্যোগপতিরা পড়ল তাঁদের রোষানলে। বেনিয়ানের কাজ বা বহির্বাণিজ্য ছেড়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেন। অনেকেই জমিদারি কিনলেন। মতিলালও ব্যবসা গুটিয়ে জমিদারি কিনলেন মঙ্গলঘাট, বাগনান ও মহিষাদলে। কলকাতায় বহু বাড়ি কিনে ও বানিয়ে রোজগারের চেষ্টা করলেন। জ্যাকসন সাহেবের কাছ থেকে ধর্মতলা বাজারও ক্রয় করেন। তা নিয়ে বেশ গন্ডগোল হয় সেসময়। তবে বাণিজ্যে বাংলার সুবর্ণসময় আর ফিরে এল না।

মতিলালের যৌবনকালে বাংলা সমাজে আলোড়ন তৈরি হয় রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে। রামমোহন ‘আত্মীয় সভা’ স্থাপন করেন যা পরে ব্রাহ্মসমাজের রূপ নেয়। বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তখন হিন্দুসমাজের কুপ্রথাকে নাড়া দিতে শুরু করেছেন আর শুরু করেছেন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও প্রসার। হিন্দু সমাজের প্রাচীনপন্থীরা ১৮৩০ সালে কলুটোলায় মতিলালের বাড়ির কাছে সতীদাহ প্রথা রদ আইনের বিপক্ষে ‘ধর্মসভা’ নামে এক সভার আয়োজন করে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়; কিন্তু তাঁর মানসিকতায় ওই সামাজিক হিংস্র কুসংস্কারের প্রতি ছিল তীব্র ঘৃণা। বৈষ্ণব মতিলাল জানতেন, চৈতন্যদেব মানুষকে ভালোবেসে সত্যের জয়গান গেয়েছেন। মতিলাল ওই ধর্মসভাকে ‘অধর্মসভা’ বলে ভৎর্সনা করেন। পরে এই ‘ধর্মসভা’ আর কখনও হয়নি। ওই সভার আহবায়কদের তিনি অনাথ ও বিধবাদের দুঃখমোচনের জন্য ‘সাহায্যভাণ্ডার’ গড়ার ডাক দেন। তাতে তিনি নিজে ত্রিশ হাজার টাকা দান করলেও অন্যরা সাড়া দেয়নি। রামমোহনের সতীদাহবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে মতিলাল প্রকৃত বন্ধুর কাজ করলেন।

সহমরণ থেকে বাঁচলেও কিন্তু সমাজে বিধবাদের লাঞ্ছনার শেষ হল না। সহমরণ রদ হওয়ার পর বিধবা বিবাহের সমর্থনে চিন্তা পুঞ্জীভূত হলেও রামমোহনের হঠাৎ মৃত্যুতে তা ধাক্কা খেল। মতিলাল শীলই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজের সর্বস্তরে বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য প্রথম বিধবা বিবাহকারীকে বিশ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি তাঁর নিজের মতো করেই বিধবা বিবাহ আন্দোলন করার চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দেখে বোঝা যায় মতিলাল বিদ্যাসাগরের পূর্বেই বিধবা বিবাহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভারতবর্ষ পত্রিকার ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল, “মতিলাল শীল বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের বহুকাল পূর্বে হিন্দু বিধবার পুনর্বার বিবাহের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ঘোষণা করিয়াছিলেন যে যিনি সাহসপূর্বক সর্বপ্রথম বিধবা বিবাহ করিবেন তাঁহাকে তিনি কুড়ি হাজার টাকা দিবেন। এক ব্যক্তি এই পুরস্কার পাইয়া ছিলেন বলিয়া প্রকাশ।”

মতিলাল শীলের অন্যতম অক্ষয় কীর্তি কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অর্থ ও জমি দান। তিনি মেডিক্যাল কলেজের ভূখন্ড এবং এককালীন ১২০০০ টাকা দিয়েছিলেন। ওই উদ্যোগে জমি দানে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ির দক্ষিণ-পূর্বদিকের বাগানের পুরোটাই চলে যায়। মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর এই দানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রেখেছে – মতিলাল শীল ওয়ার্ড(Mutty Lal Seal ward) প্রতিষ্ঠা করে। অবশ্য তারও আগে মতিলাল অনেক টাকা দান করেন ‘ফিভার হসপিটাল’ প্রতিষ্ঠায়। তখনকার কলকাতায় ডেঙ্গুজ্বর, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড লেগেই থাকত। এইসব রোগীর চিকিৎসার জন্য ফিভার হসপিটাল তৈরি হয়েছিল।

মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পূর্বে সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে একটি অস্থায়ী মেডিক্যাল কলেজ ছিল। সেখানে ত্রিশজন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করাতে পারতেন। সেখানকার ব্যয়ভারও বহন করতেন মতিলাল শীল।

সেকালের সেই অন্ধ সংস্কারের যুগে তাঁর এই উদ্যোগ বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন এদেশে গুণসম্পন্ন ডাক্তার তৈরি হোক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রদের পড়াশোনায় উৎসাহী করতে মতিলাল ছাত্রদের মধ্যে পারিতোষিক বিতরণের জন্য দান করেছিলেন এক লাখ টাকা।

মতিলাল বুঝেছিলেন, দেশের মানুষকে শিক্ষার মধ্য দিয়েই আত্মশক্তিতে জাগরিত করতে হবে। একটি ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের সংকল্প করলেন এবং তা জেনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এক জেসুইট পাদ্রি তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিবিধ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। মতিলালও পাদ্রিদের শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দক্ষতার কথা স্বীকার করতেন। কলুটোলায় মতিলালের বাড়িতে ১৮৪৩ সালের ১ মার্চ একটা সভা হয় এই উপলক্ষে। বিদ্যালয়টির নাম রাখা হল ‘শীলস্ কলেজ’ এবং ছাত্রদের বই, খাতা, কলম ইত্যাদি সাহায্য দেওয়া হলেও বাৎসরিক এক টাকা বেতন নেওয়া হত। প্রথমে জেসুইট পাদ্রিরা শিক্ষা ও পরিচালন ব্যবস্থা দেখলেও পরে দেশীয় শিক্ষকদের ওপর সব দায়িত্ব অর্পিত হয়। মতিলাল এই বিদ্যালয়কে একসময় সম্পূর্ণ অবৈতনিক করে নাম দেন ‘শীলস্ ফ্রি কলেজ’। এটি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের ওপর আজও বর্তমান। শীলস্ ফ্রি কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান সুরেন্দ্রনাথ দাস, প্রখ্যাত ডাক্তার মনি কুন্ডু, ইসকন প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণ দে প্রমুখ। এভাবে জাতীয় জাগরণে মতিলাল অবদান রেখে গেছেন নীরব সেবায়।

তখনকার দিনে খাদ্যের অভাব ছিল প্রকট। তাছাড়া দুর্ভিক্ষ বা অন্য সময়েও বাইরে থেকে লোক আসত এক মুঠো খাবারের জন্য। মতিলাল শীলের উদ্যোগে ধনী ও সমাজ হিতৈষণায় আগ্রহী ব্যক্তিদের একটি সভা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় কলকাতার চতুর্দিকে ১৬ মাইলের মধ্যে যেন কেউ অভুক্ত না থাকে তার ব্যবস্থা করা হবে। চোরাবাগানের মার্বেল প্যালেসের প্রতিষ্ঠাতা রাজেন্দ্র মল্লিক চাইলেন কলকাতার অন্নসত্রের ভার। মতিলাল শীল বন্ধুর আবেদনে সাড়া দিয়ে নিজে দায়িত্ব নিলেন কলকাতার উত্তর ও দক্ষিণে অতিথিশালা স্থাপনের। বেহালা ও বেলঘরিয়া অঞ্চলে দুটি বিশাল অতিথিশালায় প্রত্যহ তিন-চার হাজার মানুষ অন্ন গ্রহণ করতেন।

তিনি পূজা, বিবাহ, শ্রাদ্ধ উপলক্ষে বাড়াবাড়ি একদম পছন্দ করতেন না। অকারণ অপব্যয় না করে মানুষের দুর্দশা মোচনের জন্য অর্থদান করতেন। দুর্গাপূজার সময় কারাবন্দী দরিদ্র লোকদের টাকা দান করে কারামুক্ত করতেন। ওইসব পরিবারের মুখে হাসি ফুটত উৎসবের মরশুমে।

হীরাবুলবুল নামে এক পতিতাকে কেন্দ্র করে সমাজে বেশ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। পতিতার সন্তান এই অজুহাতে হিন্দু কলেজ তাঁর পুত্রকে পড়ার সুযোগ দেবে না। কয়েকজন সৎ ও সাহসী ব্যক্তি প্রশ্ন তুললেন, কেন সে বিদ্যা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। তাঁদের চেষ্টায় ছাত্রটি হিন্দু কলেজে ভর্তি হলেও গোঁড়া হিন্দুরা ক্ষুব্ধ হয়ে ছেলেটিকে শিক্ষালয় থেকে তাড়াতে সচেষ্ট হয়। মতিলাল বউবাজারের রাজা রাজেন্দ্র দত্তের সঙ্গে পরামর্শ করে দুজনে গড়েন হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ। এক পতিতার সন্তান বিদ্যাশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেখে মতিলালের সুস্থ বিবেক আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে ব্যথিত হয়েছিল ভেবে আশ্চর্য হতে হয়। কতটা ব্যতিক্রমী ও সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলে একজন মানুষ এসব কাজে নামেন।

সমাচার দর্পণ থেকে জানা যায়, চিৎপুর থেকে কলুটোলা পর্যন্ত পাকা পয়ঃপ্রণালি করে দিয়েছিলেন নিজের খরচে। সেসময় কলকাতায় গঙ্গার ধারে ভাল ঘাট ছিল না। পুরনো নিমাই মল্লিকের ঘাটের খুব খারাপ দশা। হাওড়া ব্রিজের দক্ষিণে আরমানি ঘাটের কাছে তিনি স্থাপন করলেন একটি সুন্দর স্নানের ঘাট। এই ঘাটেই ১৮৫৪ সালের ২০ মে তাঁর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. https://www.kaliokalam.com/
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী, নিউএজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
  4. বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, বিনয় ঘোষ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, ১৯৯৩, কলকাতা।
  5. দ্বারকানাথ ঠাকুর: বিস্মৃত পথিক, কৃষ্ণ কৃপালনী, অনুবাদ: ক্ষিতীশ রায়, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, দিল্লি।
  6. বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ, প্রকাশ ভবন, ২০০৭, কলকাতা।
  7. বিদ্রোহী ডিরোজিও, বিনয় ঘোষ, প্রকাশ ভবন, কলকাতা।
  8. একাদশ অশ্বারোহী, শংকর, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা।
  9. আপনার টাকা, সম্পাদনা: অমিতাভ গুহ সরকার, এবিপি প্রা. লিমিটেড, কলকাতা।
  10. দানবীর মতিলাল শীল: দ্বিশত জন্মবার্ষিকী সংকলন, শ্যামল দাস, মতিলাল শীল ট্রাস্ট, কলকাতা।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন