রবার্ট ওপেনহাইমার

রবার্ট ওপেনহাইমার

রবার্ট ওপেনহাইমার (Robert Oppenheimer) একজন বিখ্যাত আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ছিলেন যিনি আমেরিকার বিখ্যাত ম্যানহাটন প্রকল্পের পরমাণু বোমা সংক্রান্ত গবেষণার নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁকে অনেকে সেই কারণে ‘পারমাণবিক বোমার জনক’ বলেও চেনেন। ১৯৪২ সালের শুরুতে ম্যানহাটন প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে থেকেই ওপেনহাইমার একজন ব্যতিক্রমী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক পদেও আসীন ছিলেন তিনি। তাঁর নকশাকৃত এই পরমাণু বোমাই ১৯৪৫ সালে হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরের উপর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে নবনির্মিত ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন-এর প্রভাবশালী চেয়ারম্যান পদে আসীন হন রবার্ট ওপেনহাইমার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি পরবর্তীকালে তাঁকে ‘এনরিকো ফার্মি’ পুরস্কারে ভূষিত করেন।

১৯০৪ সালের ২২ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটিতে রবার্ট ওপেনহাইমারের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম জে রবার্ট ওপেনহাইমার। তাঁর বাবা জুলিয়াস সেলিগম্যান ওপেনহাইমার পেশায় একজন ধনী বস্ত্র আমদানিকারক ছিলেন এবং তাঁর মা এলা ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। তাঁদের পরিবারের সকলেই ছিলেন জার্মান ইহুদি। ১৯১২ সালে তাঁর পরিবার ম্যানহাটনে রিভারসাইড ড্রাইভের একটি বাড়িতে চলে আসে। তাঁর বাবা-মায়ের চিত্রশিল্প সংগ্রহের শখ ছিল এবং তাঁদের সংগ্রহে পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ প্রমুখ বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা ছবি ছিল বেশ কয়েকটি। ওপেনহাইমারের এক ভাই ছিল ফ্র্যাঙ্ক নামে যিনি পরে পদার্থবিদ হন। ১৯৩৭ সালে ওপেনহাইমারের বাবার মৃত্যুর তিন বছর পরে জনৈক জীববিজ্ঞানী ক্যাথারিন পুয়েনিং হ্যারিসনকে বিবাহ করেন ওপেনহাইমার। তাঁদের দুই সন্তান যথাক্রমে পিটার এবং ক্যাথরিন।

শিক্ষা জীবনের প্রাথমিক পর্বে অ্যালকুইন প্রিপারেটরি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার। ১৯১১ সালে এথিকাল কালচার সোসাইটি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। একইসঙ্গে ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্য এবং খনিজবিদ্যা নিয়ে তাঁর সমান আগ্রহ ছিল। তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ তিনি একই বছরে সম্পন্ন করেছিলেন অথচ অষ্টম বর্ষের অর্ধেকটা তিনি সম্পূর্ণ করেননি। চূড়ান্ত বর্ষে এসে রসায়ন শাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন ওপেনহাইমার। স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার এক বছর পরে তিনি হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হন। এথিক্যাল কালচার স্কুল থেকেই তিনি স্নাতক উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হার্ভার্ডের হিগিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক পার্সি ব্রিজম্যানের শেখানো তাপগতিবিদ্যার একটি কোর্স চলাকালীন রবার্ট ওপেনহাইমার পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত হন। ১৯২৫ সালে ‘সুমা কাম লড’ ( summa cum laude) স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি এবং তারপরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিশ গবেষণাগারে বিজ্ঞানী জে জে থম্পসনের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তবে নিয়মিত গবেষণাগারের কাজ ভাল না লাগায় তিনি জার্মানির গটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে পড়াশোনা করার জন্য। সেই সময় ম্যাক্স বর্ন এবং নিলস বোরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয় ওপেনহাইমারের। ১৯২৭ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন রবার্ট ওপেনহাইমার এবং ঐ একই বছর অণুর গঠন বিষয়ে বর্নের সঙ্গে গবেষণা করে তিনি যে সূত্রে উপনীত হন তার নাম ‘বর্ন-ওপেনহাইমার অ্যাপ্রক্সিমেশন’। এরপর একের পর এক পদার্থবিদ্যার গবেষণাকেন্দ্রে তিনি যোগ দিতে থাকেন। হার্ভার্ড, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, লেডেন ও জুরিখে এরপর একে একে তিনি নানা সময় গবেষণা করেছেন। বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালটেকে পড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার।

১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট প্রথম পরমাণু বোমা তৈরির ব্যাপারে অনুমোদন দেন। ১৯৪২ সালে আমেরিকার ম্যানহাটন প্রকল্পে নিযুক্ত হন রবার্ট ওপেনহাইমার যা আসলে পারমাণবিক বোমা তৈরির একটি গোপন প্রকল্প ছিল। সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে এই প্রকল্পের অধীনে বহু গুপ্ত গবেষণাগার ছিল যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ওকে রিজ টেনেস, লস আলমোস এবং নিউ মেক্সিকো। রবার্ট ওপেনহাইমার নিজে লস আলামোস গবেষণাগার নির্মাণে তদারকি করতেন, এমনকি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদদের তিনি এখানে একত্রিত করেছিলেন পরমাণু বোমা তৈরির জন্য। এই প্রকল্পে তাঁর নেতৃত্বদানের জন্য তাঁকে অনেকেই ‘পরমাণু বোমার জনক’ হিসেবে অভিহিত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ম্যানহাটন প্রকল্পটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে পরমাণু শক্তি কমিশন গঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত প্রকার পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়ন তদারকি করার জন্য এই কমিশনটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এই কমিশনের সাধারণ উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে হাইড্রোজেন বোমা তৈরির পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন রবার্ট ওপেনহাইমার। ‘সুপার বম্ব’ নামে পরিচিত সেই হাইড্রোজেন বোমাটি আদতে পরমাণু বোমার থেকেও কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল।

তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিদ্যাতেও ওপেনহাইমার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, বর্ণালী বিজ্ঞান, আপেক্ষিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বিষয়েও ওপেনহাইমারের যথেষ্ট দখল ছিল। নিউট্রন ও মেসন কণা এবং নিউট্রন তারার অস্তিত্ব তিনিই সম্ভবত প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। অবিচ্ছিন্ন বর্ণালী তত্ত্ব তাঁর সর্বার্গ্রে আকর্ষণের জায়গা ছিল। ১৯২৬ সালে তিনি আণবিক ব্যান্ড স্পেক্ট্রাম তত্ত্বের উপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সূর্যের এক্স-রে শোষণের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রবার্ট ওপেনহাইমারই প্রথম বলেছিলেন যে সূর্য আসলে হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। ১৯৩১ সালে তাঁর ছাত্র হার্ভে হলের সঙ্গে ফটো-ইলেকট্রিক প্রভাবের আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর একটি গবেষণা-পত্র লেখেন রবার্ট ওপেনহাইমার যেখানে পল ডিরাক বর্ণিত হাইড্রোজেনের দুটি শক্তিস্তরের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালে ওপেনহাইমার এবং ফিলিপস একটি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন যা আসলে ‘ওপেনহাইমার-ফিলিপ্স প্রসেস’ নামে পরিচিত। তবে ১৯৩০ সালেরও আগে তিনি পজিট্রনের উপস্থিতি বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেন যা পরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার উপরেও পরবর্তীকালে আগ্রহ অনুভব করেছেন ওপেনহাইমার। ১৯৩৮ সালে রবার্ট সার্বারের সঙ্গে তিনি একত্রে একটি গবেষণাপত্র লেখেন যার শিরোনাম ছিল ‘অন দ্য স্টেবিলিটি অফ স্টেলার নিউট্রন কোর্স’। এমনকি তিনি শ্বেত বামন তারার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অনেক গবেষণা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রবার্ট ওপেনহাইমার আরও পাঁচটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণার পাশাপাশি ১৯৩৩ সালে তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং বার্কলেতে ভারততত্ত্ববিদ আর্থার ডব্লিউ রাইডারের সঙ্গে দেখা করেন রবার্ট ওপেনহাইমার। এমনকি তিনি মূল সংস্কৃত ভাষাতে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পড়েছিলেন এবং এই বইটিকেই তাঁর জীবন দর্শনের উপর সবথেকে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী বই হিসেবে ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। ১৯৫১ সালে প্রজেক্ট চার্লস-এ অংশ নেন তিনি যার অনুসরণে ১৯৫২ সালে শুরু হয় প্রজেক্ট ইস্ট রিভার। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকান শহরগুলির উপর পরমাণু বোমা আক্রমণের অন্তত এক ঘন্টা আগে থেকে পূর্বাভাস জারি করা।  

১৯৪৬, ১৯৫১ এবং ১৯৬৭ সালে তিনবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও শেষমেশ একবারও পুরস্কার পাননি রবার্ট ওপেনহাইমার। তবে ১৯৬৩ সালে তিনি এনরিকো ফার্মি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, বার্ট্রান্ড রাসেল এবং জোসেফ রটব্লাটের সঙ্গে ১৯৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ আর্ট অ্যান্ড সায়েন্স’। ১৯৪৭ সালে লুই স্ট্রসের অনুরোধে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’ সংস্থার ডিরেক্টর পদে আসীন হন রবার্ট ওপেনহাইমার।

১৯৬৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ৬২ বছর বয়সে গলার ক্যান্সারে রবার্ট ওপেনহাইমারের মৃত্যু হয়।          

আপনার মতামত জানান