লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (Lal Bahadur Shastri) স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম আদর্শবাদী ও দূরদর্শী জননেতা। স্বাধীন ভারতের খাদ্য ও দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংভরতা আনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশের কৃষি ও প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর আমলেই ভারতে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ‘সবুজ বিপ্লব’ এবং দুগ্ধ উৎপাদনে জোয়ার আনতে ‘শ্বেত বিপ্লব’ বা হোয়াইট রেভোলিউশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় দেশের আপামর জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর দেওয়া স্লোগান “জয় জওয়ান, জয় কিষান” ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। আজীবন মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও সরলতার নীতিতে বিশ্বাসী এই রাজীতিবিদের দূরদর্শিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯০৪ সালের ২ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসনাধীন ইউনাইটেড প্রভিন্স তথা বর্তমান উত্তরপ্রদেশের পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় নগরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা সারদা প্রসাদ শ্রীবাস্তব পেশায় একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে এলাহাবাদে সরকারের রাজস্ব দপ্তরে ক্লার্ক হিসেবেও কাজ করেন। তাঁর মায়ের নাম রামদুলারী দেবী। লাল বাহাদুরের পূর্বপুরুষেরা বেনারসের কাছে রামনগরের জমিদারিতে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করতেন, যার সুবাদে শৈশবের কিছু সময় তিনি বেনারসে অতিবাহিত করেন। শাস্ত্রীর বয়স যখন মাত্র দেড় বছর তখন বিউবনিক প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর বাবা মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর সময় রামদুলারী দেবী গর্ভবতী ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি এক কন্যার জন্ম দেন। চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে রামদুলারী দেবী তাঁর সন্তানদের নিয় মুঘলসরাইয়ে নিজের বাপের বাড়িতে চলে আসেন। লাল বাহাদুর তাঁর মামার বাড়িতেই বড় হতে থাকেন।
১৯২৮ সালের ১৬ মে মিরজাপুর নিবাসী ললিতা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। যৌতুক প্রথার ঘোর বিরোধী শাস্ত্রীজি বিবাহের উপহার হিসেবে শ্বশুরের কাছ থেকে কেবল মাত্র একটি চরকা এবং কয়েক গজ খদ্দরের কাপড় গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের চার পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তান। হরি কৃষ্ণ, সুনীল, অশোক, অনিল হলেন চার পুত্র এবং কন্যাদের নাম কুসুম ও সুমন।
এক নজরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জীবনী:
- জন্ম: ২ অক্টোবর, ১৯০৪
- মৃত্যু: ১১ জানুয়ারি, ১৯৬৬
- কেন বিখ্যাত: স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং শ্বেত ও সবুজ বিপ্লবের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
- পুরস্কার: দেশের প্রতি অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মুঘলসরাইয়ের স্থানীয় রেলওয়ে স্কুলে। এরপর তিনি বেনারসের হরিশ চন্দ্র হাই স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন। বেনারসের একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়ার সময় তিনি মহাত্মা গান্ধী এবং লালা লাজপত রায়ের আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। ১৯২০ সালে গান্ধীজী যখন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন, তখন তরুণ লাল বাহাদুর পড়াশোনা মাঝপথেই ছেড়ে দিয়ে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আন্দোলনের কারণে তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তারও করা হয়, কিন্তু নাবালক হওয়ায় পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়। এরপর তিনি পুনরায় পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯২৫ সালে কাশীর ‘কাশী বিদ্যাপীঠ’ থেকে দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এই বিদ্যাপীঠ থেকেই তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শাস্ত্রী’ অর্থাৎ ‘শাস্ত্রে পণ্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ‘শ্রীবাস্তব’ পদবিটি জাতিভেদ প্রথার পরিচায়ক হওয়ায়, তিনি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজের পৈতৃক পদবি ত্যাগ করেন এবং আজীবনের জন্য ‘শাস্ত্রী’ নামটি নিজের পরিচয়ে যুক্ত করেন।
স্নাতক শেষ করার পর ১৯২৬ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী লালা লাজপত রায় প্রতিষ্ঠিত ‘লোক সেবক মণ্ডল’ (Servants of the Peoples Society)-এর সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। মুজফফরপুর এবং এলাহাবাদ অঞ্চলে হরিজন ও অনগ্রসর সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি এই সংগঠনের মাধ্যমে নিরলস কাজ করে যান। আজীবন তিনি এই জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে গান্ধীজীর আহ্বানে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং দ্রুতই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ এবং ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বহুবার কারারুদ্ধ করে। সব মিলিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে প্রায় সাত বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর প্রদেশ পার্লামেন্টারি বোর্ডের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করেছিল।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী উত্তর প্রদেশের পুলিশ ও পরিবহন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম রাজ্য পরিবহনে নারী কন্ডাক্টর নিয়োগের প্রথা চালু করেন। এরপর ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তামিলনাড়ুর আরিয়ালুরে একটি বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটে, যার নৈতিক দায় স্বীকার করে তিনি স্বেচ্ছায় রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যা ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব সামলান। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে জওহরলাল নেহরুর আকস্মিক প্রয়াণের পর, কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ সর্বসম্মতিক্রমে ১৯৬৪ সালের ৯ জুন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতকে খাদ্যশস্য ও দুগ্ধ উৎপাদনে স্বাবলম্বী করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দেশের দুগ্ধ উৎপাদনে গতি আনতে তিনি গুজরাটের ‘আমূল’ (Anand Milk Union Limited)-এর সমবায় মডেলকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁরই নির্দেশনায় ১৯৬৫ সালে ‘ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ (NDDB) গঠিত হয়, যা ভারতে ‘হোয়াইট রেভোলিউশন’ বা শ্বেত বিপ্লবের সূচনা করে। এর পাশাপাশি দেশে তীব্র খাদ্য সংকট মোকাবিলা করতে তিনি কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল বীজ এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে তাঁর মেয়াদে গৃহীত এই কৃষি নীতিই পরবর্তীতে ভারতের ‘সবুজ বিপ্লব’ বা গ্রিন রেভোলিউশন নামে পরিচিতি পায়, যার ফলে পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান যখন ভারতের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, তখন শাস্ত্রীজি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সামরিক বাহিনীকে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের সেনা জওয়ান এবং কৃষক সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর দেওয়া ঐতিহাসিক স্লোগান — ‘জয় জওয়ান জয় কিষান’ বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যস্থতায় ভারত-পাক যুদ্ধের অবসান ঘটলে, স্থায়ী শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত উজবেকিস্তানের তাশখন্দ শহরে একটি দ্বিপাক্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঐতিহাসিক ‘তাশখন্দ চুক্তি’-তে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি মধ্যরাতে তাশখন্দ শহরেই তিনি তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং ৬১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর এই আকস্মিক ও রহস্যময় মৃত্যু তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর শোক ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। মৃত্যুর পর ১৯৬৬ সালেই ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত করে। ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সততা, নিয়মানুবর্তিতা এবং দেশপ্রেম আজও এক উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান