অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভারতীয় রসায়নবিদ। অসীমা চট্টোপাধ্যায়ই প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি কোনও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রী (D.Sc.) লাভ করেছিলেন। জৈব রসায়ন (Organic chemistry) এবং উদ্ভিদ রসায়নে (Phytochemistry) তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ভেষজবিদ্যাকে তিনি বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার করে কাজে লাগিয়েছেন। ম্যালেরিয়া এবং মৃগীরোগের ঔষধ তৈরি করেছিলেন তিনি। ক্যান্সার ও ভিঙ্কা অ্যালকলয়েড (Vinca alkaloids) নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন তিনি। দেশীয় বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তাঁর অবদান অতুলনীয়।
অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয় ১৯১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায়। তাঁর পিতা ছিলেন নামকরা ডাক্তার ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায় এবং মাতা কমলা দেবী। কলকাতাবাসী হলেও আসলে তাঁরা ছিলেন হুগলীর হরিপালের বাসিন্দা। দুই সন্তানের মধ্যে অসীমা ছিলেন জ্যেষ্ঠা এবং তাঁর ভাই ছিলেন সরসীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীকালে ডাক্তার হয়েছিলেন। ইন্দ্রনারায়ণের উদ্ভিদবিদ্যা (Botany) নিয়ে যে তীব্র আকর্ষণ ছিল তা তিনি মেয়ে অসীমার মধ্যেও সঞ্চারিত করেছিলেন। শৈশবকাল থেকেই অসীমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল এবং তিনি আগাগোড়াই ছিলেন মেধাবী। অসীমা যাতে প্রাচীন সব সাহিত্য পড়ে জ্ঞানার্জন করতে পারে সেই কারণে তাঁর মা কমলা দেবী মেয়ের সংস্কৃত শিক্ষার ব্যাবস্থাও করেছিলেন। আজীবন বিজ্ঞানের গবেষক হয়েও তিনি মার্গ সঙ্গীতের চর্চা করেছেন। দীর্ঘ ১৪ বছর উচ্চাঙ্গসংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। জন্মসূত্রে পদবী মুখোপাধ্যায় হলেও শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (Bengal Engineering College) অধ্যাপক এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞানের খ্যাতনামা গবেষক বরদানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ১৯৪৫ সালে বিবাহ হওয়ার পর তিনি হলেন অসীমা চট্টোপাধ্যায় এবং এই নামেই তাঁর ভারতজোড়া পরিচিতি।
বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের পাঠ শেষ করে অসীমা চট্টোপাধ্যায় ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে। তখন একমাত্র এই কলেজেই মেযেদের রসায়নে স্নাতক পড়বার সুযোগ ছিল। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের মেয়ে তিনি, তাই ছেলেদের সাথে একসঙ্গে কলেজে পড়া নিয়ে বাড়ির বড়রা আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মা কমলা দেবী সেসব আপত্তিতে কর্ণপাত করেননি। ১৯৩৬ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রসায়নবিদ্যায় স্বর্ণপদকসহ স্নাতক হন অসীমা। তারপর ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে জৈব রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সেখান থেকেই পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে উদ্ভিদ রসায়ন এবং কৃত্রিম জৈব রসায়ন (Synthetic organic chemistry) নিয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট অব সায়েন্স (D. Sc) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল ভেষজ উদ্ভিদ থেকে পাওয়া জৈব যৌগের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা। তাঁর গবেষণায় বিভিন্ন সময় প্রভূত সাহায্য করেছিলেন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখরা। সেই প্রথম কোন মহিলা যিনি একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি লাভ করলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব লতিফ এবং ফাদার লাফোঁর নামে বৃত্তি এবং হেমপ্রভা বসু স্মারক পদক পেয়েছিলেন তিনি।
১৯৪৭ সালে বিবাহের দুবছর পরে অসীমা আমেরিকা যান প্রথমবার। সেবারে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর এগারো মাসের শিশু কন্যা জুলি এবং তার পরিচর্যাকারিণীকে। সেখানে থাকতেই তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্পর্শে আসেন। তারপর আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। অসীমা ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০, এই তিনবছর উইস্কনসিন- ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয় (University of Wisconsin-madison), ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয় (California Institute of Technology বা Caltech) এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখে থেকে গবেষণা করেছিলেন। গবেষণার মূল বিষয় ছিল সেই ভেষজ উদ্ভিদ সংক্রান্ত জৈব রসায়ন। আসলে তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের মতো গরীব দেশে ভেষজ পদ্ধতিতে চিকিৎসাই একমাত্র পথ।
১৯৪০ সালে অসীমা চট্টোপাধ্যায় লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে (Lady Brabourne College) রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করার বছরেই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতে শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি রাজাবাজারের ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্সে’ (University College of Science) রসায়ন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ঐতিহ্যশালী খয়রা অধ্যাপক পদ লাভ করেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই পদ তিনি অলংকৃত করেছেন। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ‘মাস্টার’.নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অধীনে ৩০ এর বেশি ছাত্রছাত্রী পিএচডি করেছেন ও ১৫০ এর বেশি গবেষক ট্রেনিং নিয়েছেন।
১৯৬০ সালে ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির (Indian National Science Academy) সদস্য হন তিনি। ১৯৭৫ সালে প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের (Indian Science Congress) সাধারণ সভাপতি হয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মৃত্যুর পর বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদেরও সভাপতি হয়েছিলেন অসীমা এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সেই পদে ছিলেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি দ্বারা রাজ্যসভার সদস্য পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার মৃগী এবং ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ। শুশনি শাক থেকে তিনি মৃগী রোগের ওষুধ আবিষ্কার করেছিলেন এবং ছাতিম, কুটকি, চিরতা থেকে আবিষ্কার করেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ। তাঁর ‘আয়ুষ-৫৬’ (AYUSH-56) মৃগীরোগের ওষুধ এবং ‘আয়ুষ-৬৪’ (AYUSH-64)ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এই গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতেই ভারত সরকার আয়ুর্বেদ হাসপাতালের মঞ্জুরি দিয়েছিল। পরবর্তীকালে কোভিড-১৯ এর সময় আয়ুষ-৬৪ এর পুনর্মূল্যায়ণ করা হয়েছিল।
ফাইটোমেডিসিন (Phytomedicine) এবং ইন্ডোল উপক্ষারঘটিত (indole alkaloids) যৌগের বিষয়ে গবেষণা করে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ভিঙ্কা অ্যালকলয়েড নিয়ে তাঁর গবেষণার ফল পাওয়া গেল ক্যান্সার বা কর্কটরোগের চিকিৎসায়। এই জৈব যৌগটি ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধি রোধ করে এবং এটি কেমোথেরাপিতেও (Chemotherapy) ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ক্যান্সার নিরাময় বিষয়ে তিনি দুবার নোবেলজয়ী বিখ্যাত বিজ্ঞানী লাইনাস পাওলিং-এর সঙ্গেও কাজ করেছিলেন। লাইনাস পাওলিংকে অসীমা চিঠিও লিখেছিলেন ১৯৫৩ সালের ৭ই জুলাই। চিঠিতে সর্পগন্ধার অ্যালকলয়েড বা উপক্ষারের এক্স-রে বিশ্লেষণের ফলাফল নিয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন অসীমা।
‘ভারতের বনৌষধি’ নামক একটি বই পরিমার্জনা ও সম্পাদনার কাজও করেছিলেন তিনি। সেই বই ছ’খন্ডে প্রকাশিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ নামক বিখ্যাত বইটি তাঁর সম্পাদনার গুনে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। নিজেরই ছাত্র সত্যেশচন্দ্র পাকড়াশির সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছিলেন ‘দি ট্রিটিজ অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন্যাল প্ল্যানটস্’ (The Treatise of Indian Medicinal Plants)। এই বইটিও মোট ছয়টি খন্ডে সম্পূর্ণ। তাঁর রচিত চারশোরও বেশি গবেষণাপত্র বিভিন্ন সময়ে দেশবিদেশে প্রকাশিত হয়েছিল।
অসীমা চট্টোপাধ্যায় সল্টলেকে একটি আয়ুর্বেদ গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন নিজের উদ্যোগে। ১৯৬১ সালে রসায়ন বিজ্ঞানে অবদানের জন্য পেয়েছিলেন বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর’ পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি।
২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে তাঁর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গুগল ডুডল প্রকাশ করে শ্রদ্ধা জানায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান