খেলা

আবেবে বিকিলা

অলিম্পিকে ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় খালি পায়ে দৌড়েই বিজয়ীর পদক পেয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন ইথিওপিয়ার আবেবে বিকিলা (Abebe Bikila)। ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসির অধীনে কর্মরত সৈনিক থেকে অলিম্পিকজয়ী ক্রীড়াবিদের সম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ। ১৯৬০-এর রোম অলিম্পিকে চার বছর পরে ১৯৬৪ সালে জাপানের টোকিও শহরে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে প্রথম জুতো পরে দৌড়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন বিকিলা। তিনিই ছিলেন প্রথম অলিম্পিকজয়ী আফ্রিকান।

১৯৩২ সালে ৭ আগস্ট ইথিওপিয়ার শেওয়া প্রদেশের অন্তর্গত জাটো শহরে আবেবে বিকিলার জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম শ্যাম্বেল আবেবে বিকিলা, যদিও শ্যাম্বেল ছিল তাঁর উপাধি। তাঁর বাবার নাম ডেমিসি এবং মায়ের নাম য়ুডিনেশ বেনেবেরু। ১৯৩৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয়বারের জন্য ইতালি ও ইথিওপিয়ার যুদ্ধ বাধলে তাঁর পরিবার গোরো শহরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সেই সময় তাঁর মা স্বামী ডেমিসির সঙ্গে বিচ্ছেদপূর্বক টেমটাইম কেফিলিউকে পুনর্বিবাহ করেন। পরবর্তীকালে পুনরায় জাটোতে ফিরে আসে তাঁর পরিবার। এই শহরে তাঁদের একটি খামারবাড়ি ছিল। কিশোর বয়স থেকেই বিকিলা ইথিওপিয়ার ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ-দূরত্বের হকি খেলা ‘গেনা’ খেলতে ভালোবাসতেন। এই খেলায় কখনো কখনো দেখা যেত প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোলপোস্ট রয়েছে। এই খেলার প্রতি আগ্রহই ভবিষ্যতে তাঁকে একজন দক্ষ অ্যাথলিটে পরিণত করেছিল। ১৯৫২ সাল নাগাদ, আডিস আবাবাতে স্থানান্তরিত হয়ে বিকিলা পঞ্চম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের একজন ঔপনিবেশিক প্রহরী (Imperial Guard) হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইথিওপিয়ার সুলুল্টা পাহাড় থেকে আডিস আবাবাতে প্রত্যহ কুড়ি কি.মি দূরত্ব দৌড়ে অতিক্রম করতেন তিনি। একদিন ঔপনিবেশিক প্রহরীদের প্রশিক্ষক ওন্নি নিসকানেন-এর নজরে পড়েন তিনি এবং সেই থেকে নিসকানেনের অধীনে বিকিলার ম্যারাথন প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে ইথিওপিয়ার সামরিক বাহিনীর চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বিতীয় হন।

প্রথাগত শিক্ষার বদলে ক্রীড়ার প্রশিক্ষণই তাঁর জীবন গড়ে তুলেছিল। ১৯৬০ সালের জুলাই মাসে আবেবে বিকিলা প্রথম ম্যারাথন দৌড়ে জয়লাভ করেন। এর ঠিক এক মাস পরেই মাত্র দুই ঘন্টা একুশ মিনিট তেইশ সেকেণ্ডে ম্যারাথন সম্পূর্ণ করে তখনো পর্যন্ত অলিম্পিকে এমিল জাটপেকের রেকর্ডকেও অতিক্রম করেন। এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে প্রশিক্ষক নিসকানেন তাঁকে এবং আবেবে ওয়াকগিরাকে একত্রে ১৯৬০ সালের রোমে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে নাথ নথিভুক্ত করান ম্যারাথনে অংশ নেবার জন্য। রোমের অলিম্পিকে জুতো কিনলেও তা পায়ের মাপ অনুযায়ী ঠিকঠাক না হওয়ায় আবেবে বিকিলা সিদ্ধান্ত নেন সম্পূর্ণ খালি পায়েই তিনি ম্যারাথনে দৌড়াবেন। ১৯৬০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রোমের কাপিটোলিন পর্বতের পাদদেশে উত্তপ্ত বিকেলে দৌড় শুরু হয় এবং কলোসিয়ামের কাছে আর্ক অফ কন্সট্যান্টাইনে তা শেষ হয় রাত্রে। সেই দৌড়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ব্রিটেনের আর্থার কেলি, মরক্কোর রাডি বেন আবডেসেল্লাম, আয়ার্ল্যাণ্ডের বার্টি মেসিট এবং বেলজিয়ামের অ্যাথলিট অরেলে ভ্যাণ্ডেন্ড্রিসে। দৌড়ের শেষ পাঁচশো মিটার পর্যন্ত আবডেসেল্লাম এবং বিকিলা সমানে সমানে দৌড়োলেও একেবারে গন্তব্যের প্রান্তে এসে গতি বাড়িয়ে খালি পায়েই ম্যারাথন সম্পূর্ণ করে জয়লাভ করেন আবেবে বিকিলা। মোট দুই ঘন্টা পনেরো মিনিট ষোলো দশমিক দুই সেকেণ্ডে সমগ্র দৌড় সম্পূর্ণ করে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন তিনি। দেশে ফিরে প্রভূত সম্মান এবং প্রশংসায় সমৃদ্ধ হন আবেবে বিকিলা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মেনজিস্টু নিউওয়ে একটি কুচকাওয়াজের মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে যান ইথিওপিয়ার তৎকালীন সম্রাট হাইলে সেলাসির কাছে। হাইলে সেলাসি তাঁকে স্টার অফ ইথিওপিয়া সম্মানে ভূষিত করেন এবং একটি ভোল্কসাগান গাড়ি আর প্রহরীদের কোয়ার্টারে একটি বাড়ি উপহার দেন। একইসঙ্গে সামান্য এক সৈনিক থেকে কর্পোরাল পদে উন্নীত হন বিকিলা।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৬১ সালে শেষবারের মতো এথেন্সের ক্লাসিক্যাল ম্যারাথনে তিনি খালি পায়ে দৌড়ে জয়ী হন। ঐ বছরই তিনি জাপানের ওসাকা এবং কোসিকিতে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ম্যারাথনে জয়ী হন। ১৯৬৩ সালে বস্টন ম্যারাথনে তিনি পঞ্চম স্থান অর্জন করেন যা তার সমগ্র ক্রীড়াজীবনে অবিশ্বাস্য ঘটনা। এরপর আরেকটি অলিম্পিকে যোগ দেন আবেবে বিকিলা। ১৯৬৪ সালের টোকিওর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে যোগ দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণপর্বে হঠাৎ অ্যাপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়লে তাঁর অ্যাপেণ্ডিক্স অপারেশন হয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে আবার মাঠে নামেন দৌড়োনোর জন্য। ২১ অক্টোবর ম্যারাথন দৌড় শুরু হয় আর ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে রন ক্লার্ক, বিলি মিলস, জিম হোগান, কোকিচি সুবুরয়াকে একের পর এক পিছনে ফেলে একাই গন্তব্যে পৌঁছান আবেবে বিকিলা। মাত্র দুই ঘন্টা বারো মিনিট এগারো দশমিক দুই সেকেণ্ডে দৌড় শেষ করায় অলিম্পিকের পঁচাত্তর হাজার দর্শক একত্রে উল্লাসে ফেটে পড়ে বিকিলার জয়ে। দ্বিতীয়বার স্বর্ণপদক জিতলেন আবেবে বিকিলা। ইথিওপিয়া থেকে একমাত্র স্বর্ণপদক জিতে আবেবে বিকিলা তখন এক ক্রীড়া-তারকায় পরিণত হয়েছেন। ১৯৬৫ সালের ২১ এপ্রিল বিকিলা নিউ ইয়র্ক বিশ্বমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটি অর্ধ-ম্যারাথনে অংশ নেন এবং সেন্ট্রাল পার্কের আর্সেনাল থেকে মেলা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত দৌড়ান তিনি। এর পরের মাসে তিনি পুনরায় জাপানে যান এবং সেখানে শিগা প্রিফেকচারে আয়োজিত মেইনিচি ম্যারাথনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন। এর পরের বছর ১৯৬৬ সালে জারাউৎজ এবং ইঙ্কন-সিউলে দুটি ম্যারাথনেই জিতে যান বিকিলা। বলা যায় এই দৌড়ই ছিল তাঁর শেষ দৌড় যেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। কারণ এর পরের বছরই দৌড়নোর সময় উরুর পেশিতে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে বিকিলার দৌড়োনোর ক্ষমতা কমে যায় এবং পায়ের জোর ক্রমশ কমে যেতে থাকে। যদিও কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি আবার ১৯৬৮ সালের ২০ অক্টোবর অলিম্পিক ম্যারাথনে অংশ নেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পায়ের কারণে অলিম্পিক ম্যারাথনে অংশ নিলেও জয়লাভ করতে পারেননি তিনি। এটাই তাঁর জীবনের শেষ ম্যারাথন। ইথিওপিয়ার ফেরার পর ‘শ্যাম্বেল’ অর্থাৎ প্রধানের পদে তাঁকে বহাল করা হয় এবং এই কারণেই তাঁর নামের আগে ‘শ্যাম্বেল’ উপাধিটি বসে।

তাঁকে নিয়ে একটি কিংবদন্তি কাহিনি প্রচলিত যদিও তা আদপেই একটি সত্য ঘটনা। টোকিও অলিম্পিকে জয়লাভের পরে আবেবে বিকিলা যে সোনার আংটি পেয়েছিলেন তা তিনি টোকিও অলিম্পিক স্টেডিয়ামের বাথরুমেই ফেলে চলে আসেন এবং সেখানে কর্মরত এক মহিলা তা পেয়ে গেলে নিজের কাছে রেখে দেন। সেই মহিলা মারা গেলে তাঁর পুত্র আবেবের পুত্রের হাতে সেই আংটি তুলে দেন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। সেই মহিলা মৃত্যুর আগে বহুবার আংটিটি ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেও না পারার কারণের যথেষ্ট অনুতপ্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর পুত্র। প্রায় পঞ্চান্ন বছর পরে আবেবের পরিবারে তাঁর বিজিত অলিম্পিকের স্মারক হিসেবে সোনার আংটিটি ফিরে আসে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় আরেকটি তথ্য উঠে আসে আবেবে বিকিলার সম্পর্কে। দেখা গেছে ১৯৬০ সালে খালি পায়ে ম্যারাথন দৌড়ানোর সময় তিনি যে সময়ের রেকর্ড করেছিলেন তার তুলনায় তিন মিনিট কম সময়ে জাপানের ওসাকায় ম্যারাথন দৌড় সম্পূর্ণ করেছিলেন আবেবে বিকিলা। কারণ সেসময় পুমা কোম্পানির জুতো পরেছিলেন তিনি আর এই ঘটনার বিজ্ঞাপনী প্রচারের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে পুমা কোম্পানির জুতোর বিক্রি বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানকালে অ্যাথলিটদের জুতো নিয়ে নানারকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় যাতে তারা দ্রুত দৌড়নোর সহায়তা পান, সেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বলা চলে আবেবে বিকিলাকে দিয়েই।

১৯৬৪ সালে টোকিও অলিম্পিকে তাঁর জয়লাভকে কেন্দ্র করে টোকিও অলিম্পিয়াড নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন কোন ইচিকাওয়া যা ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায়। এছাড়া ১৯৭২ সালে বাড গ্রিনস্প্যানের আরেকটি তথ্যচিত্র ‘দ্য ইথিওপিয়ান্স’এ বিকিলাকে দেখা যায়। জাপানি ভাষায় আবেবে বিকিলার জীবনী লেখা হয় প্রথম ১৯৯২ সালে। ইয়ামাডা কাজুহিরোর লেখা সেই জীবনী ‘ডু ইয়ু রিমেম্বার আবেবে?’-র পরে আরো তিনটি জীবনী প্রকাশ পায় আবেবে বিকিলাকে কেন্দ্র করে। ইংরাজি ভাষায় লেখা তিনটি জীবনীগ্রন্থ হল যথাক্রমে – বিকিলার কন্যা সিগে আবেবের লেখা ‘ট্রায়াম্ফ অ্যাণ্ড ট্র্যাজেডি’, পল রাম্বেলির লেখা ‘বেয়ারফুট রানার’ এবং টিম জুডাহ-র লেখা ‘বিকিলা : ইথিওপিয়াস বেয়ারফুট অলিম্পিয়ান’। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘অ্যাথলিটু’র বিষয় ছিল আবেবে বিকিলার জীবন।

১৯৭৩ সালের ২৫ অক্টোবর মাত্র ৪১ বছর বয়সে সেরিব্র্যাল হেমারেজের কারণে আবেবে বিকিলার মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য